গুরুত্ব পাক খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের স্বার্থ

ন্যানোপ্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রেখে সম্প্রতি নতুন জাতীয় কৃষিনীতি অনুমোদন করেছে সরকার। ন্যানোপ্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করে ২০১৩ সালের কৃষিনীতিকেই এক্ষেত্রে হালনাগাদ করা হয়েছে বলে খবর রয়েছে। অনেক আগে থেকেই আমাদের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে প্রবৃদ্ধিতে এর অবদান কমে আসছে। তবে ন্যানোপ্রযুক্তি যুক্ত করে প্রণীত কৃষিনীতি বাস্তবায়িত হলে এদেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন হবে এবং এতে অর্থনীতিতে এ খাতের ভূমিকা বাড়বে বলে আমাদের বিশ্বাস। আমাদের কৃষক কিন্তু অনেক আগে থেকে নিত্যনতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছেন। তাতে কৃষিরও বিকাশ ঘটছে। গৃহীত সিদ্ধান্তের বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, কৃষিকে কৃষকের কাছে লাভজনক ও নিরাপদ করা, পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো প্রভৃতি নতুন এ কৃষিনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশই নিজ জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশও রয়েছে এ কাতারে। অনুমোদন পাওয়া কৃষিনীতিতে সে বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। কিছু বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ন্যানোপ্রযুক্তির সাফল্য নিয়ে আশাবাদী বিজ্ঞানীরা। সেক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষিতে সফলভাবে প্রয়োগ করা গেলে তা ভালো ফল বয়ে আনবে বলেই বিশ্বাস। ইতোমধ্যে চাল থেকে শুরু করে মাছ, মুরগি, সবজি ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ কিংবা তার কাছাকাছি। তবে গম ও পেঁয়াজের মতো কিছু ক্ষেত্রে এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে না ওঠায় আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এটা মাঝে মাঝে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠারও কারণ। বর্ষাকালে কাঁচামরিচের মতো ফসল নষ্ট হওয়ায় এ নিয়েও সংকটে পড়তে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ন্যানোপ্রযুক্তির মতো পদ্ধতি ব্যবহার করে এসব ফসল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণভাবে ক্ষতিকর বলে বিবেচিত কীটনাশকের প্রয়োগ কমিয়ে আনতেও এমন প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলে অনেকের মত।
সাম্প্রতিক সময়ে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এদেশের কৃষি। আবাসনসহ বিভিন্ন খাতের বিকাশের ফলে কৃষিজমি আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। শিল্প বিকাশের চাপও রয়েছে। খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, স্বল্প মুনাফা প্রভৃতি কারণে কৃষিতে আগ্রহ কমছে কৃষকের। বলা হয়ে থাকে, বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে অনেকে হয়তো স্থায়ীভাবে ছেড়ে দেবেন কৃষিকাজ। এটা শঙ্কার খবর। এ অবস্থায় মানসম্পন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষির উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প নেই। কৃষিজমি অব্যাহতভাবে হ্রাস পাওয়ায় সমন্বিত পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও বছরব্যাপী উৎপাদনের গুরুত্ব বাড়ছে। কৃষকদের এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করে তোলা প্রয়োজন। এছাড়া পরিবর্তনশীল আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপযোগী ও অধিক ফলনশীল জাত উদ্ভাবনে আরও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। লবণ ও খরাসহিষ্ণু জাতসহ উচ্চ ফলনশীল ফসল উদ্ভাবনে দেশীয় বিজ্ঞানীরা সাফল্য দেখিয়েছেন ইতোমধ্যে। নতুন কৃষিনীতিতেও ন্যানোপ্রযুক্তিকে গবেষণার বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের কৃষির জন্য এটি সুফল বয়ে নিয়ে আসবে বলেই বিশ্বাস।
মানুষের আয় প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী হওয়া, ক্রমবর্ধমান স্থূলতা, ডায়াবেটিস রোগী বৃদ্ধিসহ নানা কারণে আটা-ময়দা তথা গমের চাহিদা বাড়ছে; কিন্তু এ ধরনের শস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ না হওয়ায় আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে আমাদের। বিষয়টি গুরুত্বসহ নিয়ে গম, এমনকি ছোলার মতো ডালজাতীয় পণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার ওপর জোর দিতে হবে। এছাড়া তামাকের মতো ক্ষতিকর ফসল চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করার কথা প্রায়ই বলা হয়। খোদ সরকারের সে প্রচেষ্টা রয়েছে। তবে এর চাষ লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা বিকল্প ফসলে সহজে যেতে চান না। সেক্ষেত্রে বিকল্প ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা ও সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রেও প্রযুক্তির বড় ভূমিকা থাকতে পারে; তবে সেটা অবশ্যই লাগসই হতে হবে।