গ্যাসলাইন বিস্ফোরণে বাড়ছে প্রাণহানি

মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ: রাজধানী ও এর আশেপাশের এলাকায় ঘন ঘন ঘটছে গ্যাসের পাইপলাইনে বিস্ফোরণের ঘটনা। বাসাবাড়িতে এসব দুর্ঘটনায় ঘটছে প্রাণহানিও। দীর্ঘদিনের পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ লাইন আর অসতর্কতার কারণেই ঘটছে এসব দুর্ঘটনা। ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাসলাইন তদারকি প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস কোম্পানি অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন এ নিয়ে খুব একটা মাথাও ঘামাচ্ছে না। গ্যাস সংযোগ ঠিক আছে কি-না, কোনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ লাইন এসব দেখাশোনাও করা হচ্ছে না। অনেকের বাড়ির রান্নাঘর যেন মৃত্যুকূপ। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি তো চলছেই। এর ফলেও ঘটছে দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা এড়াতে তিতাস গ্যাস গ্রাহকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিতাসের গাফিলতির ফলেই এসব দুর্ঘটনা ঘটছে।
বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত দুই মাসে শুধু তিতাসের গ্যাসলাইনে লিকেজের ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ২০টি। আর এসব ঘটনার বেশিরভাই ঘটেছে রাজধানীতে। এর বাইরে সাভার ও গাজীপুরে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। সে সঙ্গে আহত ও সম্পদের ক্ষতি তো রয়েছেই।
গ্যাস দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত তিতাসের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বরে তিতাসের গ্যাসলাইনে মোট ১০টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। তিতাসের অনুসন্ধান বলছে, সবগুলো দুর্ঘটনাই ঘটেছে গ্যাস লিকেজের কারণে। এর মধ্যে গত ২৯ সেপ্টেম্বরই রাজধানীর তিনটি এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটেছে তিনটি। এছাড়া গত মাসে ও চলতি মাসেও কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এ বিষয়ে রাজধানী ও আশেপাশের এলাকার তিতাস গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানির পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান খান শেয়ার বিজকে বলেন, গ্যাসলাইনে যেসব দুর্ঘটনা হয়েছে, এর সবগুলোই হয়েছে লিকেজের কারণে। লিকেজের বিষয়টি গ্রাহককেই খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, গ্রাহক যদি সচেতন থাকে, তাহলে এমন দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। পরামর্শ হিসেবে তিনি বলেন, রান্না শেষে গ্যাসের চুলা বন্ধ হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে হবে; চুলার নব ও পিতলের চাবিতে কোনো লিক আছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে হবে; চুলা জ্বালানোর কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ মিনিট আগে দরজা-জানালা খুলে রাখতে হবে। এ সময় তিনি বাড়ির গ্যাস রাইজারটি সব সময় উš§ুক্ত রাখা ও গ্যাসলাইনের আশেপাশে কোনো ধরনের দাহ্য পদার্থ না রাখার পরামর্শ দেন।
তবে তিতাসের দাবির সঙ্গে একমত নন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম। তিনি বলেন, গ্যাসলাইনের বিস্ফোরণ নিয়ন্ত্রণে তিতাসসহ গ্যাস কোম্পানিগুলোকেই কাজ করতে হবে। এ বিশেষজ্ঞের অভিযোগ, তিতাস নিয়মিত গ্যাসলাইন পরিদর্শন করে না। তারা ঠিকমতো লাইন দেখভাল করছে না। তিনি বলেন, কারিগরি দিকগুলো কোম্পানিকেই দেখতে হবে, গ্রাহক তো আর কারিগরি বিষয়গুলো বুঝবেন না। ড. শামসুল আলম বলেন, তিতাস এ বিষয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে টাকা নষ্ট না করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে লাইন পরিদর্শন করুক, গ্রাহকদের সচেতন করুক, প্রয়োজনে যেসব গ্রাহক লাইন দুর্বল বা অসুবিধা থাকার পরও কোনো অভিযোগ করেন না, তাদের জরিমানা করুক। তার অভিযোগ, তিতাস গ্রাহকদের বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক নয়। তাদের কাছে গ্রাহকের জীবনের কোনো দামই নেই।
সর্বশেষ গত ৩ নভেম্বর সাভারের আশুলিয়ার নরসিংহপুরে তিতাস গ্যাসের পাইপলাইনে বিস্ফোরণে ঘটা অগ্নিকাণ্ডে পাঁচজন আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজনের মৃত্যু হয়। এ গ্যাস সংযোগটি অবৈধ ছিল বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এর আগে ১ নভেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারীর একটি ভবনে গ্যাসলাইনের বিস্ফোরণ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হন পাঁচজন। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয় দুই শিশুর। বাকিরা এখনও চিকিৎসাধীন। তাদের সবারই শরীরের বেশিরভাগ অংশ পুড়ে গেছে।
এছাড়াও গত ১৬ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুরে প্রিন্স বাজারের পেছনে একটি গ্যাসলাইনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তবে রাস্তায় থাকা গ্যাসলাইনে আগুন লাগায় কোনো হতাহত বা বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি। ৫ অক্টোবর রাজধানীর উত্তরা হাউজ বিল্ডিংয়ে গ্যাসলাইনে বিস্ফোরণ হয়। তবে এ ঘটনায়ও কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
ফায়ার কন্ট্রোলরুমের তথ্যমতে, রাস্তার পাশে গ্যাসলাইনে বিস্ফোরণ হয়েছে। তবে আগুন ধরা বা অন্য ক্ষতি হয়নি। ১৩ অক্টোবর রাজধানীর উত্তরখানে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হওয়া আটজনের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছয় স্বজনের সবাই মারা গেছেন। অগ্নিকাণ্ডের দিনই এক কিশোরের মৃত্যু হয়। তার শরীরের ৬৬ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। এরপর পূর্ণিমা নামে এক নারী মারা যান। আগুনে দগ্ধ হয়ে পূর্ণিমার মা সুফিয়ারও মৃত্যু হয়েছিল। গ্যাসের লিকেজ থেকে অথবা গ্যাসলাইন ছিদ্র হয়ে আগুনের সূত্রপাত বলে জানিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস সূত্র।