মত-বিশ্লেষণ

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি: গ্রাহকস্বার্থ বিবেচনায় নিন

ইমরান হোসেন: মুরাদ সাহেব বেসরকারি চাকরিজীবী। ঢাকার মুগদাপাড়ায় একটি ফ্ল্যাট বাসায় তার স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে বসবাস করেন। ছেলে একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। তার মাসিক আয় প্রায় ২২ হাজার টাকার কাছাকাছি। প্রতিবছর তার আয় বৃদ্ধি পায় ৫০০ বা ৭০০ টাকার মতো।
এতক্ষণ মুরাদ সাহেবের আয় সম্পর্কে জানলাম, এবার তার ব্যয়ের খাতগুলো একটু বিশ্লেষণ করি। বাসাভাড়া সাত হাজার টাকা ও কারেন্ট বিল এক হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। গ্যাস বিল ৮০০ টাকা, যাতায়াত খরচ ৮০০ বা এক হাজার টাকা, বাজারখরচ সাত হাজার টাকা আর ছেলের জন্য যাবতীয় ব্যয় তিন হাজার টাকার কাছাকাছি। তাছাড়া মোবাইল বিল, চিকিৎসা খরচ, আপ্যায়ন খরচসহ পরিবারের আরও আনুষঙ্গিক খরচের কথা নাই বললাম। এসব পরিবারে ‘সঞ্চয়’ নামক ছোট শব্দটা কল্পনাই করা যায় না। প্রতিবছর দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া যে অনুপাতে বাড়ে, বেতন তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে না। ফলে দেখা যায় তাদের চাহিদা ঠিকমতো পূরণ হয় না। পরিবারে ঘাটতি লেগেই থাকে। তাদের জীবন যেন এক গোলকধাঁধায় আটকে থাকে। অভাব যেন পিছু ছাড়ে না। তারা চাইলেও মুক্তভাবে বাঁচতে পারে না। ঢাকা শহরে এমন পরিবারের সংখ্যা অগণিত।
এমন নিন্মমধ্যবিত্তের অভাবের পরিমাণ বাড়াতে এবার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে গ্যাস কোম্পানিগুলো। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, আবাসিক গ্রাহকদের একমুখো চুলায় মাসিক বিল হবে এক হাজার ৩৫০ টাকা, বর্তমানে যা ৭৫০ টাকা। আর দুইমুখো চুলায় মাসিক বিল প্রস্তাব করা হয়েছে এক হাজার ৪৪০ টাকা, বর্তমানে যা ছিল ৮০০ টাকা। এছাড়া মিটারযুক্ত চুলায় প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ১৬ টাকা ৪১ পয়সা, বর্তমানে যা ৯ টাকা ১০ পয়সা।
এদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা গ্যাসের দাম প্রতি ইউনিট তিন টাকা ১৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৭৪ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আর সার কারখানায় ব্যবহার করা গ্যাসের ইউনিটপ্রতি দাম দুই টাকা ৭১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে আট টাকা ৪৪ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে শিল্প-কলকারখানায় সরবরাহ করা প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম সাত টাকা ৭৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৪ টাকা পাঁচ পয়সা, গাড়িতে ব্যবহার করা সিএনজির দাম ৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৬ টাকা ১০ পয়সা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯ টাকা ৬২ পয়সা থেকে ১৮ টাকা চার পয়সা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ১৭ টাকা চার পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৪ টাকা পাঁচ পয়সা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
তাহলে এবার ভেবে দেখুন গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম গড়ে প্রায় ১০৩ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব কতটুকু যুক্তিসংগত। আর যদি সরকার তাদের প্রস্তাব মেনে নেয়, তবে হুমকির মুখে পড়বে নিন্ম বিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। শুধু গ্যাসের দাম নয়, প্রতিটি সেক্টরেই দাম বাড়বে। যানবাহন, খাদ্য-বস্ত্র ও চিকিৎসা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পাবে। প্রতিটি পরিবারে প্রায় দুই হাজার বা তার অধিক টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। ঢাকা শহরে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব হবে না এ ধরনের পরিবারগুলোর। জীবনযাত্রার মান সংকুচিত হয়ে পড়বে। তাদের কথা নাহয় বাদ দিলাম, এবার দেখা যাক বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কী পরিণতি হবে।
শিল্পকারখানায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে ব্যবসায়ীদেরও। গ্যাস বিতরণকারী সংস্থাগুলোর এমন প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেলে মুখ থুবড়ে পড়বে দেশের উৎপাদন খাত। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের বস্ত্র খাত ও পোশাক রফতানিও। সেইসঙ্গে বেড়ে যাবে অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য উৎপাদিত পণ্যের দামও। বাড়বে আমদানি প্রবণতাও। লোকসান এড়ানোর যুক্তিতে বিতরণ কোম্পানির গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবকে ভয়ানক বলে মনে করছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম প্রতিটি মহলই দাম বৃদ্ধি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করছে।
গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সিনিয়র সহসভাপতি ফারুক হাসান একটি জাতীয় দৈনিক বলেলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, এটা বস্তাবায়িত হলে গার্মেন্ট সেক্টর বিশেষ করে টেক্সটাইল কারখানাগুলো টিকে থাকতে পারবে না। বর্তমানে সুতা উৎপাদনের যে খরচ, সেটাই উঠছে না। বিদেশি সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাচ্ছে না। আমাদের তো সুতা আমদানি করতে হয়। সেখানে ভারত, চীন ও পাকিস্তান নিজেরা সুতা উৎপাদন করে। ফলে আমাদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে। বিদেশে রফতানি আয়ের ৮৩ শতাংশই আসে গার্মেন্ট থেকে। এই অবস্থায় গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তার কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেলে কতটা হুমকির মুখে পড়বে গার্মেন্ট শিল্প।
এবার দেখি উৎপাদন খাতসংশ্লিষ্টরা কী বলছেন। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন সম্প্রতি এক জাতীয় দৈনিকে বলেছেন, এক মাসে যদি এক কোটি টাকার গ্যাসের বিল বেড়ে দেড় কোটি টাকা হয়, তাহলে আমাদের আগের চেয়ে অনেক বেশি বিল দেওয়া লাগবে। গ্যাসের দাম বাড়লেই লাভের পরিমাণ কিন্তু বাড়ে না। আমাদের পণ্য তৈরির খরচ যদি বেড়ে যায়, তাহলে কীভাবে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করব। তার কণ্ঠেও হতাশার সুর। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ছিটকে পড়ার ভয় তার মধ্যে কাজ করছে।
আজ শুরু হবে সংসদের বাজেট অধিবেশন। গ্যাস কোম্পানিগুলো প্রস্তাব করবে দাম বৃদ্ধি নিয়ে। গ্রাহকদের চোখ থাকবে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর। প্রতিবছরই বাজেটে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। সাধারণ মানুষকে গুনতে হয় বাড়তি টাকা। সরকার যদি গ্যাস কোম্পানিদের চাহিদা অনুযায়ী দাম বৃদ্ধি করে, তাহলে ঢাকা ছাড়তে হবে মুরাদের মতো লাখো পরিবারকে। ব্যবসার পরিধি সংকুচিত হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে যাবে। তাই গ্যাসের দাম যদি সরকার বৃদ্ধি করে, তাহলে সাধারণ গ্রাহকের ব্যয় ও বাজার বিশ্লেষণ করে বৃদ্ধি করা হোক।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

সর্বশেষ..