গ্রামীণ অর্থনীতিতে পয়লা বৈশাখের গুরুত্ব

নিতাই চন্দ্র রায়: দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৬০ ভাগের বেশি লোক গ্রামে বাস করে। গ্রামের উন্নতির ওপর নির্ভর করে দেশের উন্নতি। এ কারণে গ্রামের মানুষের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে ব্যাংকের শাখা স্থাপন, এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের কোনো বিকল্প নেই। গ্রামীণ অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে শহরের সমান অনুপাতে গ্রামে শাখা খোলা এবং দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় এজেন্ট ব্যাংকের সেবা দিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত দুই বছরে গ্রামীণ এলাকায় শহরের তুলনায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়েছে। শুধু তা-ই নয়, একই সময়ে আনুপাতিক হারে শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আগের চেয়ে এক শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আজ থেকে দু’বছর আগেও ১০০ টাকার মধ্যে শহরের ব্যবসায়ীরা নিতেন ৯০ টাকা ১৫ পয়সা এবং বাকি ৯ টাকা ৮৫ পয়সা পেত গ্রামের মানুষ। এখন ১০০ টাকার মধ্যে গ্রামের মানুষ পাচ্ছে গড়ে ১০ টাকা ১৭ পয়সা আর শহরের ব্যবসায়ীরা পাচ্ছে গড়ে ৮৯ টাকা ৮৩ পয়সা। বর্তমান সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ সুবিধা সম্প্রসারণের ফলে গ্রামে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কুটিরশিল্পের প্রসার ঘটেছে ব্যাপক। কৃষির পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে হাঁস-মুরগি পালন, মংস্য চাষ, গবাদি পশু পালন ও নার্সারি স্থাপনে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে গ্রামের মানুষ। চাষের জমি ও ঘরের গহনা বিক্রি করে প্রত্যন্ত গ্রামে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির খামার, শাকসবজি ও ফলের বাগান গড়ে তুলেছে সাহসী ও উদ্যমী যুবক-যুবতীরা।

বাংলা নববর্ষ ও বৈশাখী মেলা গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে সহায়তা করে। বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব, প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ। এই উৎসবে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষ অংশগ্রহণ করে। সারা দেশে এক অনাবিল আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ফুটপাত থেকে বিপণিবিতান সবখানেই পণ্য বেচাকেনার ধুম। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে বেচাকেনা বেড়েছে অনলাইনেও। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশাখী উৎসব দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সর্বজনীন এই উৎসবে বাড়ছে মানুষের অংশগ্রহণ। সেইসঙ্গে বাড়ছে বৈশাখকেন্দ্রিক কেনাকাটাও। এতে উৎসবের পাশাপাশি পয়লা বৈশাখ পাচ্ছে বাণিজ্যিক গুরুত্ব। বেচাকেনা বাড়ায় বিক্রেতারাও খুশি। তারা বলছেন, ঈদের মতো পণ্য বিক্রি হচ্ছে। বৈশাখী উৎসব ঘিরে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি এসেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেন, এই উৎসব সর্বজনীন ও দেশব্যাপী হওয়ায় গতি এসেছে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও।

যত দিন যাচ্ছে জাতীয় অর্থনীতিতে পয়লা বৈশাখ ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থপ্রবাহের দিক দিয়ে ধর্মীয় বড় উৎসব রমজানের ঈদের পরেই বাংলা নববর্ষের অবস্থান। নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটিকে পালনের ঐতিহ্য বাংলাদেশে বহুকাল থেকে চলে আসছে। বাঙালি জাতিসত্তার বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামে দিনটির অবদান অনস্বীকার্য। আর গ্রামবাংলার অর্থনীতিতে এর শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। যেদিন থেকে পয়লা বৈশাখে হালখাতার প্রচলন শুরু হয়েছে, সেদিন থেকে বাঙালির অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আর বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতির এক বিরাট অংশজুড়ে আছে পয়লা বৈশাখ। পয়লা বৈশাখের অর্থপ্রবাহ নিয়ে দেশে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের গবেষণা হয়নি। ফলে এ দিনটিকে ঘিরে কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয় তার সঠিক পরিসংখ্যান দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এর পরিমাণ যে বিশাল তা মানতেই হবে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে বস্ত্রÑএটা এক বাক্যে সবাইকে স্বীকার করতেই হবে। নতুন বছরের প্রথম দিনে নতুন পোশাক পরা রীতিমতো একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। তাই পয়লা বৈশাখের ১৫-২০ দিন আগে থেকে পছন্দমতো পোশাক তৈরি ও কেনাকাটার ধুম পড়ে যায় সারা দেশে। নগরের বড় শপিংমল থেকে শুরু করে ফুটপাত, ছোট-বড় শহর এবং গ্রামীণ হাটবাজারের কাপড়ের দোকানগুলোতে উপচেপড়া ভিড়। ফ্যাশন হাউজগুলো বৈশাখকেন্দ্রিক নানা ধরনের পোশাক বাজারে আনে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে অনলাইনে বেচাকেনার প্রচার ও প্রসার দুই বেড়েছে। এর মাধ্যমে প্রচুর পোশাক বেচাকেনা হয়। ধারণা করা হয়, বাংলা নববর্ষভিত্তিক পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি পোশাক বেচাকেনা হয়। আর এর সিংহভাগ অর্থ গ্রামীণ অর্থনীতিতে চলে যায়, কারণ নববর্ষে পোশাকের বেশিরভাগ তাঁতের বস্ত্র প্রাধান্য পায়। তাঁতিরাও নববর্ষে নানা ডিজাইনের পোশাক বিশেষ করে শাড়ি বাজারে নিয়ে আসে। তাঁতিদের হাত ধরে চাঙা হয় গ্রামীণ অর্থনীতি। পোশাক ছাড়াও জুতা, গহনা ও প্রসাধনী সামগ্রীও কম বিক্রি হয় না পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে।

অন্যান্য দেশের মতো বর্তমান সরকার বাংলা নববর্ষে সরকারি ছুটি ও সরকারি কর্মচারিদের বৈশাখী ভাতা চালু করেছে। এতে সরকারি কর্মচারীদের ৭০০ কোটি টাকারও বেশি বৈশাখী ভাতা দেওয়া হয়। এ অর্থের প্রায় পুরোটাই বৈশাখকেন্দ্রিক বিভিন্ন উৎসব আনন্দে ব্যয় করা হয়। ফলে ভিন্ন মাত্রা পায় দেশের অর্থনীতি।

পয়লা বৈশাখে মাছ ও মিষ্টিজাত সামগ্রী খাতেও ব্যাপক অর্থের লেনদেন হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পয়লা বৈশাখে ইলিশ খাওয়াকে নিরুৎসাহিত করেছেন। ইলিশের প্রজনন রক্ষায় তিনি এ মহৎ উদ্যোগ নিয়েছেন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে পান্তা ইলিশের পরিবর্তে ভর্তা ও পান্তার প্রচলন শুরু হয়েছে। বৈশাখে ইলিশ ছাড়াও রুই-কাতলাজাতীয় মাছের প্রচুর বেচাকেনা হয়। মাংসও বেচাকেনা হয় প্রচুর। ঢাকাসহ সারা দেশের মিষ্টির দোকানগুলোতে শত শত মণ মিষ্টিসামগ্রীর বেচাকেনা হয় পয়লা বৈশাখে। নতুন বছরের প্রথম দিনে অতিথি আপ্যায়নসহ একে অপরকে মিষ্টিমুখ করানোর রেওয়াজ পুরোনো হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা বেশ গতি পেয়েছে। এমনকি এদিন নিকট আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে হাঁড়িভর্তি মিষ্টি পাঠানোর রেওয়াজ রয়েছে। নতুন বছর মানে লালসালুতে বাঁধানো সাদা কাগজের খাতা, যা হালখাতা নামে ব্যবসায়ীদের কাছে সমধিক পরিচিত। বছরের প্রথম দিনে খদ্দের-পাইকাররা মহাজনের দোকানে গিয়ে বকেয়া পরিশোধ করে নতুন হিসাব খোলে। এ প্রক্রিয়ার অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে মিষ্টি। এভাবে এদিন বিভিন্ন দোকানে প্রচুর মিষ্টির ব্যবহার হয়। আর মিষ্টির ব্যবহারে শুধু দোকানদাররাই নয়, এর সঙ্গে জড়িত গ্রামীণ গোয়ালা, দুধওয়ালা, মিষ্টির কারিগর থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবাই লাভবান হয়। দেশের কোথাও কোথাও নববর্ষের মিষ্টি সরবরাহে এক-দুই সপ্তাহ আগে থেকে প্রস্তুতি শুরু হয়।

নববর্ষের নবজাগরণে জেগে ওঠে কামার, কুমার ও সুতার পাড়ার কুটিরশিল্পীরা। পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস আগে থেকে মৃৎশিল্পীদের শুরু হয় ব্যস্ততা। মাটির তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, শানকি, সরা, ফুলের টব থেকে শুরু করে নানা পণ্যসম্ভারের লেনদেনের বেশিরভাগ অর্থে পেশাজীবী গোষ্ঠীর এ মানুষেরা যেন প্রাণ ফিরে পায়। একইভাবে জাগরণ ঘটে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পীদের। বাঁশের বাঁশি থেকে

শুরু করে কাঠ, বাঁশ ও প্লাস্টিকের খেলনাসামগ্রীর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার হয়।

শাঁখা-সিঁদুরের মতো ধর্মীয় সামগ্রীর মাধ্যমেও প্রচুর অর্থের লেনদেন হয়।

শহর-বন্দর-গ্রামে বৈশাখী মেলার মাধ্যমে আরও বিভিন্ন পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকজন লাভবান হয়ে থাকে। কোথাও কোথাও বৈশাখী মেলা চলে মাসব্যাপী। বৈশাখী মেলায় বোরো ধান, ধনে, তুলা, মসুর, রসুন ও কালোজিরার মতো চৈতালি ফসলেরও বেচাকেনা হয় প্রচুর। অনেকে মেলা থেকে সারা বছরের জন্য প্রয়োজনীয় মসলা ও তৈজসপত্র ক্রয় করেন। সার্কাস, পুতুলনাচ, যাত্রা, পালাগান, মোটরসাইকেল খেলা, লাঠিখেলা, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, নাগরদোলাসহ নানা রকম বিনোদনের ব্যবস্থা মেলার বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করে। বৈশাখী মেলা গ্রামীণ জীবনে আনে নতুন উদ্যম। সারা বছরের ক্লান্তি, সমস্যা ও অভাব-অশান্তি ভুলে নতুন করে একটি বছর শুরু করার প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে গ্রামের মানুষ। বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে লোকজ শিল্পের প্রচার ও প্রসার ঘটে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শৌখিন সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসে ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসায়ীরা। কাচের চুড়ি, রঙিন ফিতা, নানারকম পুতুল, খেলনা, মাটি ও কাঠের তৈজসপত্র, মেয়েদের পাটের শৌখিন ব্যাগ, নকশি করা পাটের শিকা ও ঘরসংসারের নিত্যব্যবহার্য জিনিস বৈশাখী মেলাকে করে তোলে লোকসমাগমে মুখর। বিনোদনের পাশাপাশি রসনাতৃপ্তির জন্য মেলায় বিভিন্ন মিষ্টি জিলাপি, কদমা, খাজা, গজা, বাতাসা ও হরেক রকমের টক-ঝাল-মিষ্টি খাবারের দোকানগুলোতে উচপেপড়া ভিড় থাকে শিশু, কিশোরসহ সব বয়সিদের। ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ কবিগুরুর এই কামনা ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় গ্রামবাংলার মানুষের জীবনে।

নববর্ষকে কেন্দ্র করে লাভবান হয় পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লাখো মানুষ। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ঠাঁই পাওয়া অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, রাঙামাটি ও সুন্দরবনের মতো বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যেমন মানুষের ঢল নামে, তেমনি সোনাচর ও সোনাদ্বীপের মতো অখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ভিড়ের কমতি থাকে না। বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেও প্রচুর অর্থের লেনদেন হয়। সারা বছর তেমন একটা কদর না থাকলেও গ্রামীণ শিল্পী বিশেষ করে বাউল ও বয়াতিরা পয়লা বৈশাখে বেশ চাঙা হয়ে ওঠে। তাদের ডাক পড়ে নানা অনুষ্ঠানে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ অবহেলিত এই শিল্পীগোষ্ঠী ও জড়িত মানুষেরা কর্মসংস্থান করে নেয়।

এভাবে পয়লা বৈশাখ গ্রামীণ অর্থনীতিতে এখন বেশ শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে। আগের তুলনায় মানুষের আয় বেড়েছে, বেড়েছে ক্রয়ক্ষমতা ও রুচি। ফলে জাতীয় উৎসবের এ দিনটি দিচ্ছে দেশের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুবর্ণ সুযোগ। গতি পাচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং চাঙা হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি।

 

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড

গোপালপুর, নাটোর

 

[email protected]