গ্রিন কারখানাকে উৎসাহ দিন

প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকার মাঝেই শেয়ার বিজে ‘গ্রিন পোশাক কারখানা করনীতিতে নিরুৎসাহিত’ শিরোনামে যে খবর ছাপা হয়েছে গতকাল, তা সচেতন পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পারে না। সংবাদটি বাজেট এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক সংক্রান্ত। ফলে সঙ্গত কারণেই শিরোনাম দেখে ভাবনা জাগে বৈকি। আর বিস্তারিত খবরে আমাদের প্রতিবেদক এসব জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) করনীতি বিভাগ থেকে প্রকাশিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে প্রস্তাবিত ‘আয়কর খাতের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার’ শীর্ষক নথির ‘তৈরি পোশাক খাতের আয়কর’ অংশ থেকে। সেখানে ‘প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসায় সহায়তা এবং ব্যবসা পরিচালনা সহজীকরণ’ সংক্রান্ত অংশে নিটওয়ার ও ওভেন গার্মেন্ট রফতানি থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ করারোপের প্রস্তাব করা হয়; যদিও আলোচ্য প্রতিষ্ঠানগুলো পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানি হলে সেক্ষেত্রে করহার ১২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুপারিশও বিদ্যমান।
প্রথম কথা হলো, চলতি অর্থবছরে ১২ শতাংশ আয়কর দিয়ে এসেছে আমাদের রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাত। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে বাদ দিলে মোটের ওপর আয়কর বৃদ্ধি পাচ্ছে ৩ শতাংশ। আবার তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বেলায়ও দেখা যাচ্ছে, প্রস্তাবিত বাজেট পাস হলে আগামী অর্থবছর থেকে কমপক্ষে অর্ধশতাংশ বর্ধিত আয়কর দিতে হবে তাদেরও। আমাদের জানা নেই, এমন কর বৃদ্ধিতে রাজস্ব আহরণ বাদ দিলে পুঁজিবাজার অথবা কারখানার মালিক কারও কোনো উপকার হবে কি না। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে দেশে গ্রিন বিল্ডিং সনদ (জিবিসি) অর্জনকারী গার্মেন্ট কারখানার সংখ্যা ৬৭টি; সনদটি পাওয়ার অপেক্ষায় আরও প্রায় ২০০ কারখানা। চলতি (২০১৭-১৮) অর্থবছরে এরা আয়কর দিয়ে আসছে ১০ শতাংশ হারে; কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে তাদের আয়কর নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ শতাংশ হারে। এ অবস্থায় কারও কারও শঙ্কা, বাজেটটি বাস্তবায়ন হলে মনোবল হারিয়ে ফেলতে পারে জিবিসি অর্জনে আগ্রহী বহু গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান।
খেয়াল করা দরকার, আগামী অর্থবছরে গ্রিন কারখানার জন্য আয়কর বৃদ্ধির যে প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তা সাধারণ কারখানার চেয়ে কমই নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কারও কারও অভিযোগ, মার্জিনটি জিবিসি’র ব্যাপারে কারখানাগুলোকে আগ্রহী করে তোলার ব্যাপারে যথেষ্ট নয়। সেক্ষেত্রে কোন বিবেচনায় মার্জিনটি এরূপে নির্ধারণ হলো, আমাদের জানা নেই। বাজেট-পরবর্তী এক অনুষ্ঠানের প্রশ্নোত্তর পর্বে অনলাইন কেনাকাটায় ভ্যাট আদায় প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান আমাদের জানিয়েছেন, সেটি প্রিন্টিং মিসটেক ছিল। গ্রিন কারখানার আয়কর নির্ধারণের বেলায়ও তেমন কিছু ঘটল কি না, কে জানে! আমরা অবশ্য আশাবাদী। উক্ত অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী যে জবাব দিয়েছেন, তার অন্তত একটার অন্তর্নিহিত বার্তা হচ্ছে, যেসব বাজেটীয় ইস্যু নিয়ে বিতর্ক রয়েছে; সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য। সবাই চাইবেন, অন্যান্য ইস্যুর সঙ্গে গ্রিন কারখানার আয়কর বিষয়েও তেমন উদ্যোগ নেবেন সংশ্লিষ্টরা। করনীতি সংস্কার প্রস্তাবের ‘পরিবেশ সংক্রান্ত প্রস্তাব’ অংশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, বিগত বছরের মতো এবারকার বাজেটেও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর। সরকারি নানা কর্মকাণ্ডেও এটা স্পষ্ট যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষাও সরকারের অন্যতম বিবেচ্য। সে বিবেচনাবোধটি তৈরি পোশাক শিল্পের করনীতিতে এসে হারিয়ে যাবে, তেমনটা কাম্য নয়। বরং মার্জিনটা এমন হওয়া উচিত, যাতে ব্যবসায়ীরা নিজে থেকে উৎসাহবোধ করেন ‘গ্রিন’ স্ট্যাটাস পেতে। এক্ষেত্রে করহারের সুবিধাজনক মার্জিন পুঁজিবাজারেও গ্রিন কারখানার সংখ্যা বাড়াবে বলে ধারণা।