গয়না গ্রাম

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজার পেরিয়ে তুরাগ নদের ওপর ছোট একটি লোহার সেতু ধরে পাঁচ কিলোমিটার এগোলে ভাকুর্তা গ্রাম। সাভার উপজেলার ইউনিয়ন এটি। ‘গয়না
গ্রাম’-খ্যাত গ্রামীণ জনপদের নাম ভাকুর্তা। একসময় ভাকুর্তা ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ গয়না তৈরি পেশার সঙ্গে জড়িত ছিল। ইউনিয়নের হিন্দু ভাকুর্তা, মোগরাকান্দা, মুশরিখোলা, ডোমরাকান্দা, বাহেরচর, ঝাউচর, লুটেরচর, চুনারচর ও চাইরাসহ প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষের আদিম পেশা গয়না তৈরি। তাদের তৈরি গয়না শোভা পায় রাজধানীসহ দেশের বড় বিপণিবিতানগুলোয়। তবে পুঁজির অভাবে এখন এই পেশা ছেড়ে অনেকেই যুক্ত হচ্ছেন অন্য পেশায়।
ভাকুর্তা এলাকার তিলক চন্দ্র সরকারের ছেলে আশা নন্দন সরকার জানান, তার চৌদ্দ পুরুষ গয়না বানানোর কাজ করতেন। বংশীয় সূত্রে তিনিও ২০ বছর ধরে এই কাজ করছেন। প্রথম দিকে রুপার প্রচলন বেশি ছিল বলে এর তৈরি গয়নার চাহিদা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু বর্তমানে রুপার বাজারমূল্য চড়া হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী তামা, পিতল আর কাঁসা ব্যবহার করে গয়না তৈরি করেন তারা, কারণ এতে রুপার তৈরি গয়নার চেয়ে খরচ তুলনামূলক কম। এছাড়া পুঁজির অভাবে রুপার গয়নার কাঁচামাল কেনা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি। একই গ্রামের যুগলচন্দ্র দাস রাজবংশীর ছেলে নিত্যরঞ্জন চন্দ্র দাস রাজবংশী বলেন, তাদের হাতের তৈরি গয়না রাজধানীর বড় বিপণিবিতানে বিক্রি হয়। রাজধানী থেকে জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা তাদের পছন্দমতো নকশা দিয়ে যান। সেই নকশা মোতাবেক নিজেদের খরচে কাঁচামাল কিনে টিকলি, টায়রা, বিছা, কানের দুল, হাতের বালা, নূপুর ও নোলকসহ নানা ধরনের গয়না তৈরি করে থাকেন তারা। পরে এতে স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়ার পর বিক্রির উপযোগী করা হয়। গলার হারপ্রতি তারা এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। আর এসব গয়না রাজধানীর বিপণিবিতানে বিক্রি হয় আরও বেশি দামে।
ভাকুর্তা বাজারের তন্বী জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী দুলাল রাজবংশী জানান, আগে ঘরে ঘরে চলত হাজারো নকশার গয়না তৈরির কাজ। তবে এখন এর চাহিদা অনেক কমে এসেছে। আগে পহেলা বৈশাখ ও অন্য উৎসবে খুচরা ক্রেতারা গয়না কিনতে তাদের দোকানে ভিড় জমাত। এখন তা হয় না। কেবল রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার জুয়েলারি ব্যবসায়ীরাই তাদের গ্রাহক। এছাড়া বাজারে মাটির তৈরি গয়না তরুণীদের এখন বেশি পছন্দনীয় হয়ে উঠেছে। কারণ চৈত্র ও বৈশাখে গরমের তীব্রতা থাকে বেশি। এ সময়ে রোদের প্রখরতায় তামা ও পিতলের তৈরি গয়নার রং নষ্ট হয়ে যায়।
হিন্দু ভাকুর্তা এলাকার জুয়েলার্স ব্যবসায়ী খলিল মিয়া, ব্যবসায়ী ননী গোপাল রাজবংশী  ও মোগড়াকান্দা এলাকার খেদমত আলী বলেন, তাদের ব্যবসার বড় সমস্যা পুঁজি। এখানকার ব্যবসায়ীদের অনেকের পুঁজি নেই বললেই চলে। তাই বেশিরভাগ সময় চড়া সুদে তাদের ঋণ নিতে হয়। সঠিক সময় ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে পোহাতে নানা ঝক্কি-ঝামেলা। তাছাড়া অন্য অনেক খাতে ঋণ পাওয়া গেলেও গয়না তৈরির জন্য কোনো ব্যাংক বা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ঋণ দেয় না। ফলে গয়না তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের ব্যবসার আকার বাড়াতে পারছে না। তাই এই ঐতিহ্যবাহী পেশাকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের সহযোগিতা চান সংশ্লিষ্টরা।
ইমতিয়াজ উল ইসলাম