ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ওয়েস্টার্ন মেরিন

নিয়াজ মাহমুদ: সংকট কাটিয়ে উঠছে অন্যতম শীর্ষ ঋণখেলাপির তকমা আঁটা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেড। খেলাপি ঋণ পরিশোধে মেয়াদ বৃদ্ধি ও ঋণের সুদহার সহনীয় করার বিষয়ে কোম্পানির প্রস্তাব ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ’১৭) প্রকৌশল খাতের এ কোম্পানিটির মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৬১ শতাংশ।

জানা গেছে, গত অক্টোবরে বিভিন্ন ব্যাংকে সুদ-আসলে ওয়েস্টার্ন মেরিনের দেনার পরিমাণ দাঁড়ায় এক হাজার ৮৪ কোটি টাকা। এ ঋণের সুদহার সহনীয় ও মেয়াদ বৃদ্ধিতে অর্থমন্ত্রীর আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে আবেদন করেন ওয়েস্টার্ন মেরিনের এমডি মো. সাখাওয়াত হোসেন। কোম্পানিটির এ আবেদনে সুপারিশপূর্বক বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির মতামত চেয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বিএসইসি এ বিষয়ে কোম্পানির পক্ষে মতামত দিয়েছে বলে জানা গেছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান জাহাজশিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনাসহ ওয়েস্টার্ন মেরিনের ঋণ ইস্যু নিয়ে গত ২২ আগস্ট অর্থমন্ত্রী বরাবর একটি চিঠি পাঠায় কোম্পানিটি। অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া ওই চিঠিতে ওয়েস্টার্ন মেরিনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আট বছরে ৬৪৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এ শিল্পে মূলধনি বিনিয়োগ করেছি। যার মধ্যে ৭২০ কোটি টাকা ইতোমধ্যে আমরা পরিশোধ করেছি। তথাপি আমাদের বর্তমান ঋণের স্থিতি রয়েছে (সুদ ও আসলসহ) এক হাজার ৮৪ কোটি টাকা। এ টাকা পর্যাপ্ত সহ-জামানতের বিপরীতে সহনীয় পর্যায়ে সুদহার নির্ধারণপূর্বক ২০ বছর মেয়াদে যে কোনো সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধের সুবিধা প্রদানের আবেদন করছি।

কোম্পানির আবেদনের প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী গত ২৩ অক্টোবর চিঠিটিতে সুপারিশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যানকে পাঠান। চিঠিতে অর্থমন্ত্রী লেখেন, ‘ওয়েস্টার্ন মেরিন আন্তর্জাতিক শিপ বিল্ডার্স; সুতরাং এদের সুযোগ দিতে হবে। আমরা সারা পৃথিবীর জাহাজ নির্মাণ করছি। এ প্রতিবেদনে ওয়েস্টার্ন মেরিন বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনার বিষয় তুলে ধরেছে। এসব পরীক্ষা করে পেশ করুন।’

জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ওয়েস্টার্ন মেরিনের পক্ষে সুপারিশ করা হয়। এতে বলা হয়, আন্তমন্ত্রণালয়ের সভায় সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হলে ওয়েস্টার্ন মেরিনের সামগ্রিক উন্নতি তথা জাহাজ নির্মাণ শিল্পের দীর্ঘস্থায়ী উন্নতি সাধন হবে। মন্ত্রণালয়ের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা যেতে পারে বলে বিএসইসি মতামত দেয়।

এদিকে কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, দুবছর ধরে সক্ষমতার চেয়ে বিশ্বে জাহাজ তৈরির অর্ডার পাচ্ছে দেশের শীর্ষস্থানীয় এ শিপইয়ার্ডটি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ৬১ শতাংশ বেড়েছে। জানা গেছে, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ (জুলাই-ডিসেম্বর) পর্যন্ত সময়ে অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে এক দশমিক ৩২ টাকা। যা আগের বছর একই সময় হয়েছিল দশমিক ৮২ টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসে কোম্পানিটির ইপিএস বেড়েছে দশমিক ৫০ টাকা বা ৬০ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০১৭ পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সম্পদ (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৬৩ টাকা।

ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ রাইট শেয়ার ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোম্পানির ১৬০তম পর্ষদ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোম্পানিটি ১:১.২৫ বা চারটি শেয়ারের বিপরীতে পাঁচটি রাইট শেয়ার দেবে। ১০ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২০ টাকা মূল্যে এ শেয়ার ছাড়তে চায় কোম্পানিটি।

সূত্রমতে, কোম্পানিটি তার ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিএমআরই ও ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে চায়। তবে সবকিছু নির্ভর করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ওপর। বিএসইসি অনুমোদন দিলেই কোম্পানিটি রাইট শেয়ার ছেড়ে টাকা তুলতে পারবে। এ লক্ষ্যে কোম্পানিটি এনআরবি ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তির মাধ্যমে এনআরবি ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড ওয়েস্টার্ন মেরিনের রাইট শেয়ার ইস্যু ম্যানেজমেন্টের ইস্যু ম্যনেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।

জানা গেছে, প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা দেখিয়ে একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেড। উচ্চ সুদে বেশি ঋণ নিয়ে বেকায়দায় পড়ে কোম্পানিটির পর্ষদ। জাহাজের প্রধান ক্রেতা ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব কাটিয়ে ওঠার পর গত দুবছর ধরে সক্ষমতার চেয়ে বিশ্বে জাহাজ তৈরির অর্ডারও পাচ্ছে দেশের শীর্ষ স্থানীয় এ শিপইয়ার্ডটি।

জানা গেছে, ২০১৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এ কোম্পানিটি আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দেড় শতাধিক আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ নির্মাণ করেছে ওয়েস্টার্ন মেরিন। এর মধ্যে ১২০টি জাহাজ দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যবহƒত হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি ১৫টি জাহাজ রফতানি করেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রায় আট কোটি ডলার বা ৬৪০ কোটি টাকা আয় করেছে।

কার ফেরি, যাত্রীবাহী জাহাজ, মাছ ধরার নৌকা, ট্রলার, বার্জ, টাগবোট তৈরিতে দক্ষতা ও সুনাম রয়েছে তাদের। ফরাসি ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি ব্যুরো ভারিটাস বা বিভি থেকে আইএসও এবং ওএইচএসএএস সনদ অর্জন করেছে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। দেশের জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ওয়েস্টার্ন মেরিনই সর্বপ্রথম এ ধরনের সার্টিফিকেট অর্জন করেছে। এতে ইয়ার্ডে ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা আইএমএস নিশ্চিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় রফতানি ট্রফি পেয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল মেরিটাইম অ্যাওয়ার্ডসহ দেশি-বিদেশি নানা পুরস্কার ও সনদে পূর্ণ তাদের ঝুলি।

কথা হয় ওয়েস্টার্ন মেরিনের টেকনিক্যাল পরিচালক আরিফুর রহমান খানের সঙ্গে। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমাদের তৈরি করা জাহাজের গুণগত মান ভালো হওয়ায় এখন দেশি-বিদেশি শিল্পগ্রুপ আমাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জাহাজও নির্মাণ করছে ওয়েস্টার্ন মেরিন। জাহাজ নির্মাণের প্রচুর অর্ডার আসছে আমাদের।’