ঘুষ ছাড়া সেবা মেলে না মোংলা ও বুড়িমারীতে

টিআইবির প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক: মোংলা বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানিতে ঘুষ দিতে হয় ব্যবসায়ীদের। সঠিক কাগজপত্র থাকলেও গাড়িপ্রতি শুল্কায়নে মোংলা কাস্টম হাউজের ছয়টি বিভাগে চার হাজার টাকা এবং একই গাড়ি ছাড় করতে বন্দরের ১০টি স্থানে এক হাজার ৭১৫ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া মোংলা ও বুড়িমারী বন্দরে সেবা দিতে বছরে প্রায় ৩১ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয় এমন তথ্য দিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, এ দুই বন্দরে সেবা নিতে সর্বক্ষেত্রে শতভাগ দুর্নীতি হয়।
গতকাল টিআইবি কার্যালয়ে মোংলা বন্দর ও কাস্টম হাউজ এবং বুড়িমারী স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন: আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মোংলা ও বুড়িমারী বন্দরের সেবার ক্ষেত্রে শতভাগ দুর্নীতি হওয়াসংক্রান্ত সুস্পষ্ট তথ্য টিআইবির কাছে আছে জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ, শ্রমিক নেতাদের একাংশ, দালালদের একটি অংশের প্রভাব ও যাদের ওপর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ বা সুশাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব, তাদের একাংশের যোগসাজশে এসব দুর্নীতি হয়। তিনি বলেন, যোগসাজশের মাধ্যমে বন্দরে যে দুর্নীতি হয়, তা কর্তৃপক্ষের অজানা নয়। কর্তৃপক্ষ যদি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাহলে তা সম্ভব। শুধু যেটা দরকারÑতা হলো সদিচ্ছার। যারা এ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে, দুর্নীতি করলে শাস্তি পেতে হয়।
মোংলায় বছরে অবৈধ লেনদেন ২০ কোটি ৩০ লাখ: প্রতিবেদনে বলা হয়, মোংলা বন্দরে শতভাগ পণ্য কায়িক পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১৬টি এবং রফতানি পণ্যের ক্ষেত্রে ১২টি ধাপে নথি যাচাই-বাছাই ও অনুমোদন করতে হয়। বন্দর থেকে মোংলা কাস্টম হাউজের অবস্থান ৫৩ কিলোমিটার দূরে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, যা দুর্নীতিকে উৎসাহিত করছে। পাশাপাশি অবকাঠামো ও জনবলের অভাবও রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আমদানি পণ্য খালাস করতে আট ধাপে বিল অব এন্ট্রিÑপিয়ন থেকে শুরু করে সহকারী কমিশনার পর্যন্ত ৩৫ হাজার ৭০০ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে লেনদেন হয়। এর মধ্যে ১০০ টাকা পান পিয়ন এবং সহকারী কমিশনার নেন পাঁচ হাজার টাকা। অন্যদিকে শুল্কায়নের পর বন্দর থেকে পণ্য খালাস নিতে গেলে বন্দরের ২০ ধাপে ছয় হাজার টাকা ঘুষ দিতে হবে। আর বিকাল ৫টার পর পণ্য খালাস নিতে গেলে সাত হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়। শুধু তা-ই নয়, জাহাজ জেটিতে ভেড়াতে ও বের করতে কাস্টম-বন্দর কর্তৃপক্ষকে ঘুষ দিতে হয়। কাস্টম হাউজ সাত ধাপে আট হাজার ৩৫০ টাকা ঘুষ নেয়। আর বন্দর ৯ ধাপে ২১ হাজার টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আদায় করে।
রিকন্ডিশনড গাড়ি আমদানি মোংলা বন্দরের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস। সেখানেও ঘুষ দিতে হয়। আমদানি করা গাড়ি শুল্কায়নের ক্ষেত্রে কাস্টম হাউজে নিয়মবহির্ভূতভাবে চার হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। এর মধ্যে নোটিং করতে ২৫০ টাকা, কায়িক পরীক্ষায় ৮০০ টাকা, অ্যাসেসমেন্টে এক হাজার ৬০০ টাকা, আউটপাস শাখায় ৪৫০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এই গাড়ি বন্দর দিয়ে বের করার সময় বন্দরের ১০ ধাপে এক হাজার ৭১৫ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এভাবে সব মিলিয়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোংলা কাস্টম হাউজ ও বন্দরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ২০ কোটি টাকা ঘুষ আদায় করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বুড়িমারীতে ৯ কোটি টাকা
প্রতিবেদনে বলা হয়, আমদানি করা প্রায় শতভাগ পণ্যে নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ দিতে হয়। সব নথিপত্র সঠিক হলেও ন্যূনতম ঘুষ না দিয়ে পণ্যের শুল্কায়ন বা পণ্যছাড় সম্ভব হয় না। নথিপত্রে ভুল থাকলে ঘুষের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শুল্ক স্টেশনে ননকমার্শিয়াল পণ্যের ক্ষেত্রে এক হাজার ৭৫০ টাকা এবং ফল বা কমার্শিয়াল পণ্যে আড়াই হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। আর বন্দরের বিলিং সেকশনে ননকমার্শিয়াল পণ্যে ৩০০ টাকা এবং কমার্শিয়াল পণ্যে ৫০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ কেন্দ্রে ফলের ট্রাকে ২০০ টাকা ও বীজের ট্রাকে ৫০০ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এ শুল্ক স্টেশনে ওজনে কারচুপির মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়। ফল ও মসলা আমদানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি শুল্ক ফাঁকি হয়। অন্যদিকে পণ্য আনলোডে শ্রমিকদের ট্রাকপ্রতি ২০০-৫০০ টাকা অতিরিক্ত বকশিশ দিতে হয়। ভুটান ও ভারতীয় ট্রাক ড্রাইভারদের কাছ থেকে পণ্য আনলোডে টনপ্রতি ৪০ টাকা বকশিশ নেওয়া হয়। এর বাইরে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নকে ন্যূনতম ট্রাকপ্রতি ৯০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। আর ট্রাক ভাড়া করে দেওয়া বাবদ দালালদের ৪০০ টাকা দিতে হয়। দালালদের টাকা না দিলে ট্রাক পাওয়া যায় না। এভাবে সব মিলিয়ে বন্দর, কাস্টমস, কোয়ারেন্টাইন, শ্রমিকরা ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে বছরে প্রায় ৯ কোটি টাকা ঘুষ আদায় করে থাকেন।
টিআইবির আট সুপারিশ
এ দুই কাস্টমস-বন্দরে ঘুষ-দুর্নীতি রোধে টিআইবি আটটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্রতি বছর কাস্টমস-বন্দরের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করা। বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের অসামঞ্জস্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থের লেনদেন বন্ধে বন্দর ও কাস্টমস এলাকা সার্বক্ষণিকভাবে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা। এছাড়া দৃশ্যমান স্থানে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি সব ধরনের মাশুল ও শুল্ক অনলাইনে এবং ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া পণ্যের শুল্কায়ন, পণ্য ছাড় ও জাহাজের আগমন-বহির্গমন কার্যকরে ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রদান নিশ্চিতে সব পর্যায়ে অটোমেশন চালু করতে হবে। শুল্কায়ন দ্রুত ও সহজতর করতে মোংলা বন্দর এলাকায় কাস্টম হাউজের পূর্ণাঙ্গ কার্যালয় স্থাপন করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহারকে প্রাধান্য দিয়ে পণ্যের শতভাগ কায়িক পরীক্ষণের পরিবর্তে দৈবচয়নের ভিত্তিতে আংশিক ১০ থেকে ২০ শতাংশ পণ্যের কায়িক পরীক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনাসাপেক্ষে বিভিন্ন স্তরে শূন্যপদের বিপরীতে নতুন জনবল নিয়োগ করতে হবে। এছাড়া বন্দর এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।