মত-বিশ্লেষণ

ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাসে প্রযুক্তির ব্যবহার ক্ষয়ক্ষতি কমাবে

শেখ আনোয়ার: পৃথিবীতে যত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে, তার মধ্যে প্রচণ্ডতার দিক থেকে ঘূর্ণিঝড় অন্যতম। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র কথাই ধরা যাক। ভারতের ওড়িশ্যায় আঘাত করে দুর্বল হয়ে বাংলাদেশের খুলনা অঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে। ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র ভয়াবহ বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সাম্প্রতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে। পূর্বাভাস জেনে যাওয়ায় মানুষ আগেভাগে সচেতন হতে পারে। আগে থেকে বাংলাদেশ আবহাওয়া দফতরের নিখুঁত পূর্বাভাসের কারণে প্রস্তুতি গ্রহণের প্রচুর সময় পাওয়া যায়। এখন মে মাসের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে: দেশের উত্তর থেকে মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত দু-তিন দিন মাঝারি/তীব্র বজ সহ (কালবৈশাখী) ও অন্যত্র তিন-চার দিন হালকা/মাঝারি বজ্রঝড় (কালবৈশাখী) হতে পারে। সে সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি হতে পারে। মে মাসে দেশের নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ থাকবে বলে জানিয়েছিল আবহাওয়া অধিদফতর। তবে এ মাসেই ছোবল দিতে পারে আরেকটি ঘূর্ণিঝড়। নাম ‘বায়ু’। এছাড়া চলতি মে বঙ্গোপসাগরে আরও দুটি নিন্মচাপ তৈরি হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।
এভাবেই ঘূর্ণিঝড় তথা সব ধরনের আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের পূর্বাভাস দিতে সদা তৎপর বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে পরিবেশ ও আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা। পূর্বাভাসের মাধ্যমে জনসাধারণকে অগ্রিম সতর্ক করায় জীবন ও সম্পদহানির পরিমাণ বহুলাংশে কম হয়ে থাকে। জনসাধারণকে সচেতন করার কাজে পরিবেশ ও আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা অত্যাধুনিক নতুন নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে সঠিক ও সময়োচিত পূর্বাভাসদানে সচেষ্ট রয়েছেন।
ঘূর্ণিঝড় কী এবং কীভাবে বিজ্ঞানীরা ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দেন? ঘূর্ণিঝড় বা ঘূর্ণিবার্তা হলো ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি, বজ্র ও প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাস সংবলিত আবহাওয়ার একটি নিন্মচাপ প্রক্রিয়া, যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে। এ ধরনের ঝড়-বাতাস প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে ছুটে চলে বলে এর নামকরণ হয়েছে ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড়ের ঘূর্ণণ উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে। ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানলে দুর্যোগের সৃষ্টি হয় বটে; কিন্তু এটি আবহাওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা পৃথিবীতে তাপের ভারসাম্য রক্ষা করে। গড়ে পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৮০টি ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়। এর অধিকাংশই সমুদ্রে মিলিয়ে যায়; কিন্তু যে অল্পসংখ্যক উপকূলে আঘাত হানে তা অনেক সময় ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, ঘূর্ণিঝড় সাধারণত দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগর ও ১৪০ ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমাংসের পূর্বে অবস্থিত দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর ব্যতীত সব উষ্ণমণ্ডলীয় সাগরবক্ষে সৃষ্টি হয়। এ সাগরবক্ষগুলো হলো: ১. উত্তর ভারত মহাসাগর ২. দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত মহাসাগর, ৩. উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর, ৪. উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চল, ৫. উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাঞ্চল, ৬. দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও অস্ট্রেলিয়ার এলাকা। বিভিন্ন সাগরবক্ষে ঘূর্ণিঝড়ের বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও উৎস, গঠন, আকৃতি ও আচরণের দিক থেকে সব উষ্ণমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় প্রকৃতপক্ষে একই। আমাদের বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরের খুব নিকটবর্তী এবং পাশাপাশি একটি অংশ। অন্যান্য সাগরবক্ষে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা কিছুটা কম হলেও এর চারপাশের দেশগুলোতে জীবন ও সম্পদহানির পরিমাণ অনেক বেশি হয়ে থাকে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের বঙ্গোপসাগরের উপকূল ফানেল আকৃতির, সমুদ্রের সোপান অগভীর, উচ্চ জ্যোতির্জোয়ার ও উপকূলের চারপাশে রয়েছে সমতল নিন্মাঞ্চল। বাংলাদেশ ও আশেপাশের এলাকায় উষ্ণমণ্ডলীয় সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় প্রধানত সৃষ্টি হয় প্রাক-বর্ষা, মধ্য বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী মৌসুমে। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু শুরুর সময় সাধারণত নিন্ম ও গভীর নিন্মচাপ সৃষ্টি হয় এবং এ মৌসুমে প্রায়ই ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। এর কারণ, মৌসুমি বায়ুর সময় বায়ুমণ্ডলের বায়ুর উল্লম্ব প্রবাহ বেশি থাকে। এছাড়া বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতার পরিমাণও কম থাকে। উষ্ণমণ্ডলীয় সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় একটি উষ্ণ অন্তস্তলবিশিষ্ট লঘুচাপতন্ত্র, যার চারদিকে উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু উত্তর কাঁটার দিকে প্রচণ্ডভাবে আবর্তিত হয়। এর ব্যাস সাধারণত ৩০০ কিলোমিটার থেকে ১৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং এর কেন্দ্র বা চোখ হালকা বাতাস ও হালকা মেঘ দ্বারা গঠিত, যার ব্যাস কয়েক কিলোমিটার থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। কেন্দ্রের চারদিকে ঘূর্ণায়মান বাতাসের গতি ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার থেকে ৩৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি সৃষ্টি হয় সমুদ্রের বিশালতায়। সমুদ্রের বিশাল জলরাশিই ঘূর্ণিঝড়ের শক্তির সিংহভাগ সরবরাহ করে। আর সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না হলে ঘূর্ণিঝড় পর্যাপ্ত শক্তি পায় না। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য আরও অনেকগুলো অনুকূল শর্তের প্রয়োজন হয়। এগুলোর মধ্যে ‘কোরিওলিস বল’ বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতা, বাতাসের উল্লম্ব কুন্তন, বায়ুমণ্ডলের গড় আপেক্ষিক আর্দ্রতা, বায়ুমণ্ডলের নিন্মস্তরে কেন্দ্রমুখী প্রবাহ ও উচ্চস্তরে কেন্দ্রবিমুখী প্রবাহ প্রভৃতি অন্যতম। ‘কোরিওলিস বল’ হচ্ছে পৃথিবীর ঘূর্ণনজনিত বল বা অক্ষাংশের ফাংশন। বিষুব রেখায় এর মান শূন্য এবং পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে এর মান সবচেয়ে বেশি। উত্তর গোলার্ধে এ বল চলন্ত বস্তুর গতিপথের ডানদিকে বিক্ষেপ ঘটায়। এ বলের মান যত বেশি হবে, ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে বায়ুর ঘূর্ণন ক্ষমতা তত বেশি হবে। ঘূর্ণিঝড়ের জন্য এর সংকট মান হচ্ছে অক্ষাংশের পরিমাণে পাঁচ ডিগ্রি উত্তর বা দক্ষিণ। অর্থাৎ বিষুব রেখার পাঁচ ডিগ্রির মধ্যে কোনো ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে না। উল্লেখ্য, বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতা মাপা হয় ভূপৃষ্ঠ এবং ছয় কিলোমিটার উচ্চতা পরিমাণ স্থানের সুপ্ত তাপমাত্রার পার্থক্য দ্বারা। এ পার্থক্য ১.৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। বাতাসের উল্লম্ব কুন্তন পরিমাপ করা হয় ১.৫ কিলোমিটার ও ১২ কিলোমিটার উচ্চতার বায়ুবেগের আনুভূমিক (পূর্ব-পশ্চিম) উপাংশের পার্থক্য দ্বারা। এ পার্থক্য ঘণ্টায় ১৮ কিলোমিটারের কম হতে পারে। এর মান শূন্যের যত কাছাকাছি হবে, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতাও তত বেশি হবে। ট্রপোস্ফিয়ারের তিন কিলোমিটার হতে ছয় কিলোমিটার উচ্চতার মধ্যে বায়ুর গড় আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৪০ শতাংশের বেশি না হলে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে না। তাই এর মান ৭০ শতাংশের যত কাছাকাছি হবে, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতাও তত বেশি হবে।
ঘূর্ণিঝড়ের কাঠামো সম্পর্কে বলা যায় এর কেন্দ্রের ৬৫-৭০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বাতাসের সর্বোচ্চ গতি বিদ্যমান। এই সর্বোচ্চ গতি সাধারণত ভৃপৃষ্ঠ থেকে ঊর্ধ্বে প্রায় তিন কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। তারপর থেকে এর মান কমতে থাকে। বায়ুমণ্ডলের নিন্মস্তরে ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে একটি খুব সরু উষ্ণ অন্তস্তল বিদ্যমান থাকে, যা ছয় কিলোমিটার থেকে ১১ কিলোমিটার উচ্চতায় সবচেয়ে বেশি প্রশস্ত হয়। ঘূর্ণিঝড়ের সর্বোচ্চ বাতাসের এলাকায় তাপমাত্রার আনুভূমিক গ্র্যাডিয়েন্ট সবচেয়ে বেশি থাকে এবং পূর্ণতা প্রাপ্তির পর এই গ্র্যাডিয়েন্ট ঘূর্ণিঝড়ের চোখ বেষ্টনকৃত মেঘ-দেয়ালের মধ্যে অবস্থান করে। ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তি, তীব্রতা ও এর গতিপথ নির্ণয় করা হয় ভূপৃষ্ঠ থেকে বেশ উচ্চ বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন প্রকার আবহাওয়া উপাত্ত অঙ্কন, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে। বিভিন্ন সময়ে আবহাওয়ার নানাবিধ উপাদানের বিভিন্ন ধরনের পর্যবেক্ষণের পাঠ নেওয়া হয়। পর্যবেক্ষণগুলোর নাম হচ্ছে: ১. সিনোপটিক পর্যবেক্ষণ, ২. পাইলট বেলুন পর্যবেক্ষণ ও ৩. উইন্ড সাউন্ড পর্যবেক্ষণ প্রভৃতি। এ পর্যবেক্ষণগুলোর সময়সূচি বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত, যা বিশ্বের সব দেশের আবহাওয়া বিভাগ অনুসরণ করে চলেছে। এসব পর্যবেক্ষণ দ্বারা প্রাপ্ত আবহাওয়ার উপাদানগুলো চতুর্মাত্রিক বিশ্লেষণের ফলে ঘূর্ণিঝড়ের কাঠামো ও অবস্থান নিরূপণ করা সম্ভব হয়। এছাড়া এসব উপাত্ত ব্যবহার করে আবহাওয়ার মতি-গতি, প্রকৃতি প্রভৃতি নির্ণায়ক বিভিন্ন হাইড্রোডাইন্যামিক্যাল ও ডাইন্যামিক্যাল সমীকরণ সমাধান করে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাব্যতা, তীব্রতা ও গতিপথ নির্ণয় করা হয়। তারপর সময়োচিত সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া হয়। এগুলো ছাড়াও রয়েছে রাডার পর্যবেক্ষণ। ঘূর্ণিঝড় যখন রাডারের আওতার মধ্যে এসে পড়ে, তখন দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং এই পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ করে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ নির্ণয় করা হয়। এই গতিপথ ও আবহাওয়ার উপাত্ত বিশ্লেষণ দ্বারা প্রাপ্ত গতিপথ তুলনা করে সঠিক গতিপথের পূর্বাভাস দেওয়া হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের অধীনে বর্তমানে ৪০০ কিলোমিটার রেঞ্জবিশিষ্ট তিনটি অত্যাধুনিক কম্পিউটারযুক্ত রাডার রয়েছে। এই রাডারের সাহায্যে ঘূর্ণিঝড়ের মেঘরাশি কেমন করে আবর্তিত হচ্ছে, মেঘরাশির উচ্চতা ও এর গতি কোনদিকে তা সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। রাডারের চিত্র থেকে ঘূর্ণিঝড়ের সর্বোচ্চ বাতাসের গতি ও ঘূর্ণিঝড়ের গতি নির্ণয় করা সম্ভব। অর্থাৎ এই রাডারের সাহায্যে ঘূর্ণিঝড়ের ত্রিমাত্রিক ধারণা পাওয়া সম্ভব। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়ের চিত্র স্যাটেলাইটের মাধ্যমেও পাওয়া যায়। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও গতিপথ পূর্বাভাসের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে, যা বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরসহ উষ্ণমণ্ডল অঞ্চলের প্রত্যেকটি দেশের আবহাওয়া বিভাগ যথাযথভাবে অনুসরণ করে থাকে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর কর্তৃক ঘূর্ণিঝড়ের যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। বাংলাদেশের জনসাধারণ আবহাওয়াসচেতন হলে আগামী দিনে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও কমে যাবে।

ইভ্যালুয়েশন অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন অফিসার
বিআইবিএম

সর্বশেষ..