মত-বিশ্লেষণ

ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি ছিল লক্ষণীয়

ফরিদ আহম্মদ বাঙ্গালী: প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রাকৃতিকভাবেই শুরু হয়, প্রাকৃতিক নিয়মেই শেষ হয়। এটি ঠেকানোর জন্য মানুষের হাতে কোনো শক্তি নেই। যুগে যুগে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসেছে, ভয়াবহ আকারে ধ্বংস করে গেছে মানুষের ঘরবাড়িসহ অসংখ্য গ্রাম। আজও সেই ধ্বংস চিহ্ন মানুষ বয়ে বেড়ায়। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ সাইক্লোনের কথা ইতিহাসের ভয়াবহ সাক্ষী হয়ে আছে। ওই সালের ১২ নভেম্বর, উপকূলবর্তী জেলা সন্দ্বীপ, নোয়াখালী, হাতিয়ার ওপর দিয়ে ইতিহাসের ভয়াবহতম সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস বয়ে যায়। এই সাইক্লোনে প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা যায়, বহু মানুষ নিখোঁজ হয়। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়। পৃথিবীতে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কখনও মারা যাওয়ার ইতিহাস রচিত হয়নি। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার সাহায্য-সহযোগিতা বা উদ্ধারকাজে চরমভাবে উদাসীনতা দেখিয়েছে, যা ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তখন জেলখানা খেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দুর্গত মানুষের পাশে ন্যূনতম ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
এবারের সাইক্লোন ‘ফণী’ নিয়ে আবহাওয়া অধিদফতর বেশ কয়েক দিন পূর্ব থেকেই সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় ছিল, সংশ্লিষ্ট সব সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো সম্পূর্ণভাবে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পেরেছে। ফণীর ফণার আঘাতে ক্ষয়ক্ষতি যাতে হ্রাস করা যায় সেদিকে সরকারের সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টা ছিল শুরু থেকেই লক্ষণীয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে থেকেও নিজে ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র সার্বক্ষণিক খবরাখবর রেখেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে শুক্রবার সারা দেশে মসজিদে মসজিদে দোয়া মাহফিল করা হয়, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডায় প্রার্থনা সভা হয়েছে। এতে করে সৃষ্টিকর্তার করুণা পাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ সচেতন হয়েছে, একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ানোর মানসিকতা তৈরি হয়েছে।
উপকূলীয় ১৯ জেলার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে মনিটরিং সেল খোলা হয়েছিল। সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ রেডিও-টেলিভিশনসহ সব সরকারি-বেসরকারি ও সামাজিক প্রচারমাধ্যম নিজ নিজ উদ্যোগে মানুষকে সচেতন করে তোলার জন্য ব্যাপক প্রচার করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে দিনে একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমকে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানানো হয়েছিল। এতে করে লাখ লাখ মানুষকে যথাসময়ে সাইক্লোন সেন্টারে স্থানান্তর সম্ভব হয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রীসহ অন্যান্য উপকরণ মজুদ রাখা হয়েছিল এসব সেন্টারে। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও প্রস্তুত ছিল, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছে।
একটি বিষয় উল্লেখ করার মতো যে ‘ফণী’ মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সারা দেশ একত্র হয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিল। ফণী তার ফণাটি উড়িষ্যার পুরিতে ছোবল দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশের নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, খুলনা, সাতক্ষীরায় প্রবেশ করে। এতে করে গাছ পড়ে ঘর ভেঙে কিছু মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়, প্রায় দুই শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়। এটাও কাম্য ছিল না। ইতোমধ্যে মৃতদের দাফনের জন্য সরকার থেকে ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হচ্ছে। ফণীকে মোকাবিলা করার জন্য আমাদের ব্যাপক প্রস্তুতি থাকায় ‘ফণী’ তেমন কিছুই করতে পারেনি। বুদ্ধি, পরিকল্পনা, সমন্বয় ও সফল নেতৃত্বের গুণে তেমন প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে আক্রান্ত প্রত্যেক জেলার ক্ষেত্রভেদে ১০০-২০০ টন চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দিয়ে রাখা হয়েছিল।
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, খরা, ভূমিধস, টর্নেডো, শৈত্যপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছর জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বিশেষত উপকূলীয় অঞ্চলের অধিবাসীদের সচেতন করার জন্য সরকার সবসময়ই তৎপর থাকে। কেননা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে জনগণের করণীয় বিষয়গুলো জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে।
ঝড়-জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ বাংলাদেশে মূলত এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এসব দুর্যোগ প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা মানুষের হাতে থাকে না, তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি কিছু করণীয় আছে। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার সময় উপকূলের নিচু এলাকা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে নিচু এলাকায় পাকা দালানে থেকেও বিপদ ঘটতে পারে। সুতরাং কর্তৃপক্ষের পরামর্শ মেনে দেরি না করে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়া উচিত। ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি ও গতিপথ অনুযায়ী বন্দরগুলোয় জারি করা হয় বিপদ সংকেত। এসব সংকেত মেনে চলা উচিত। অবহেলা করলেই বড় ধরনের বিপদ হতে পারে।
উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, শিশু ও গর্ভবতী নারীদের আগে পাঠাতে হয়। আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সময় টর্চলাইট, দিয়াশলাইসহ মোমবাতি, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সঙ্গে নিতে হবে। দুর্যোগের সময় কোন এলাকার লোক কোন আশ্রয়কেন্দ্রে যাবে, গবাদিপশু কোথায় থাকবে, তা আগে ঠিক করে রাখা হয়। জেলে নৌকা, লঞ্চ ও ট্রলারে রেডিও রাখতে হবে। এসব এলাকার জেলেদের সকাল, দুপুর ও বিকালে আবহাওয়ার পূর্বাভাস শোনার অভ্যাস করা হয়। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে বা অন্য আশ্রয়ে যাওয়ার সময় কী কী জরুরি জিনিস সঙ্গে নেওয়া যাবে এবং কী কী জিনিস মাটিতে পুঁতে রাখা হবে, তা ঠিক করে সেই অনুসারে প্রস্তুতি নিতে হবে। ঘূর্ণিঝড়ের মাসগুলোতে বাড়িতে মুড়ি, চিড়া ও বিস্কুটজাতীয় শুকনো খাবার রাখা ভালো।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পরেও কিছু করণীয় রয়েছে। যেমন রাস্তা বা ঘরবাড়ির ওপর উপড়ে পড়া গাছপালা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে, যাতে সহজে সাহায্যকারী দল আসতে পারে এবং দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব হয়। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষকে বাড়ি ফিরতে সাহায্য করা এবং নিজের ভিটায় বা গ্রামে অন্যদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিতে সহায়তা করে। অপেক্ষাকৃত ভালো পানি ফিটকারি বা ফিল্টার দিয়ে খাবার ও ব্যবহারের উপযোগী করা, যাতে পানিবাহিত রোগ না হয়। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণ শুধু এনজিও বা সরকারি সাহায্যের অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজে যেন অন্যকে সাহায্য করে সে বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে। যেহেতু ঝড়-বাদলা এ সময়ে ঘটতেই পারে তাই খেয়াল রাখতে হবে ঝড় একটু কমলেই যেন ঘর থেকে কেউ বের না হয়। কেননা পরে আরও প্রবল বেগে অন্যদিক থেকে ঝড় আসার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ঝড়ের পূর্বেই কিছু শুকনো খাবার সংরক্ষণে রাখতে হবে। এ সময় যেটা জরুরি তা হলো অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা। নারী, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ লোকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় ত্রাণ বণ্টন (আলাদা লাইনে) করতে হবে।
ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ ৪ ক্যাটেগরির শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ছিল। একই ক্যাটেগরির ঘূর্ণিঝড় ছিল ১৯৭০ সালের। ১৯৭০ সালে যেখানে ১০ লাখ লোক মারা গেছে সেখানে ২০১৯ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ১২ জন লোক মারা গেছে। এখানেই দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অগ্রগতি ও সফলতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে কোনো দুর্যোগে মৃত্যুর হার একক সংখ্যায় নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন। তারপরও কিছু সময় প্রশাসনের নাগালের বাইরে কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে যায়। এ একই ঘূর্ণিঝড় কিন্তু ভারতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। আমরা আশা করছি সরকারের আন্তরিকতা আর জনগণের সচেতনতায় দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি আরও কমে আসবে, দুর্যোগে বাংলাদেশ রোল মডেল এ তকমা আরও সুসংহত হবে।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..



/* ]]> */