চট্টগ্রামের ঋণখেলাপিরা গ্রেফতার আতঙ্কে

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: বেসরকারি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক ও চট্টগ্রামের এসএ গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দীন আলমকে গত সপ্তাহে গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রাইম ব্যাংকের মামলায় তাকে গ্রেফতার করে গত রোববার রিমান্ডে নেওয়া হয়। চলতি মাসেই রাইজিং গ্রুপের পরিচালক জমিলা নাজনীন মাওলাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে কেয়া কসমেটিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল কাদের মোল্লাসহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী গ্রেফতার হন।
গত কয়েক বছরে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও দুর্নীতির কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং দুদক মামলা করেছে কয়েক হাজার। আর এসব মামলায় ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের সম্ভাবনা আছে। ফলে আতঙ্কে আছে ঋণখেলাপি ও দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীরা। খেলাপি ঋণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা এগিয়ে থাকায় এক্ষেত্রে তাদের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক বেশি।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সূত্র অনুসারে অর্থ আত্মসাতের মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গত রোববার এসএ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. শাহাবুদ্দিন আলমকে দুই দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আবু সালেম মোহাম্মদ নোমানের আদালত তাকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। এর আগে ১৭ অক্টোবর ঢাকার গুলশানের একটি হোটেল থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাকে গ্রেফতার করে। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
উল্লেখ্য, বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেন শাহাবুদ্দিন আলম। তার মোট ঋণের পরিমাণ তিন হাজার ৬২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার বেশি। বিভিন্ন সময়ে এসব ঋণ নিয়ে তিনি পরিশোধ করেননি।
এদিকে গত ৮ অক্টোবর চট্টগ্রামে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা সাউথইস্ট ব্যাংকের ১৩৫ কোটি টাকার অর্থ আত্মসাৎ মামলায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর স্ত্রী ও রাইজিং গ্রুপের পরিচালক জমিলা নাজনীন মাওলাকে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিশেষ জজ আকবর হোসেন মৃধার আদালত। এছাড়া কেয়া কসমেটিকসের এমডি আবদুল কাদের মোল্লাসহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ঋণখেলাপির দায়ে গ্রেফতার হন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, দেশের আর্থিক খাতের দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী, অর্থপাচারকারী ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে অর্থ মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় কমিটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সুপারিশ করে। আর বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো মামলা করে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের বিরুদ্ধে। এছাড়া আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন মহলের চাপ আছে প্রশাসনের ওপর। ফলে অর্থ পাচারকারী, ঋণখেলাপি ও দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য প্রশাসন জোরালো ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে।
চট্টগ্রামের একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপকরা বলেন, এসএ গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দীন আলম গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে দেশের আলোচিত ঋণখেলাপিরা পাওনা পরিশোধে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এর মধ্যে আছেন রাজনৈতিক নেতা, ভোজ্য তেলের ব্যবসায়ী, জাহাজ ভাঙার ব্যবসায়ী ও পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। আগ্রহী ব্যবসায়ী পুনঃতফসিলের সুযোগ ও নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধের
জন্য ওয়াদা করছেন। এসব আগ্রহী ব্যবসায়ীদের মধ্যে আছেন সানম্যান গ্রুপের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, ক্রিস্টাল গ্রুপের এমডি মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম, এমইবি গ্রুপের উদ্যোক্তাসহ আরও বেশ কিছু ব্যবসায়ী।
ব্যাংকারদের সঙ্গে আলাপকালে মেজর (অব.) আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, ‘আমরা পাওনা পরিশোধে চেষ্টা করছি। আমরা যাদের কাছ থেকে অর্থ পাই, তারা আমাদের পাওনা দিচ্ছে না। এ কারণে একটু দেরি হচ্ছে। আর খেলাপি ঋণ পরিশোধের জন্য আমরা একটি প্যাকেজ হাতে নিয়েছি। আগামী মাসে আমরা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধ করতে শুরু করব।’
ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুশাসনের ঘাটতি থাকায় ব্যাংকগুলোয় অনিয়ম-দুর্নীতি বেড়ে যাচ্ছে। এতে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটালে এমনটি হওয়ার কথা নয়। ব্যাংকের ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও কঠোর হতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে আলাপকালে সিটি ব্যাংক লিমিটেডের ক্লাস্টার হেড অব ব্রাঞ্চ (গ্রুপ-২) মোহাম্মদ নিয়ামত উল্লাহ শেয়ার বিজকে বলেন, ঋণখেলাপিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে অন্য কেউ দেশের সাধারণ মানুষের আমানত লুট করতে সাহস না পায়। তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত ঋণখেলাপি বেড়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়ছে না, অন্যদিকে আগে বিতরণ হওয়া ঋণের টাকাও ফেরত পাচ্ছে না ব্যাংক। এতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ আসছে না, ব্যবসা-বাণিজ্যে ফিরছে না গতি। এজন্য বিচার না হওয়া, সীমাহীন দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। আর এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আগামীতে এ খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে, যা সার্বিক অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
উল্লেখ্য, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্প্রতি সংসদে জানান, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে ঋণখেলাপির সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৩০ হাজার ৬৫৮ জন; তাদের কাছে অনাদায়ী অর্থের পরিমাণ এক লাখ ৩১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। আর খেলাপি ঋণের সঙ্গে জড়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮৮টি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ১৮ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ৯ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের চার হাজার ৯০১ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের আট হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা, কৃষি ব্যাংকের দুই হাজার ১৭৮ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের দুই হাজার ৩৩২ কোটি টাকার অনাদায়ী ঋণ রয়েছে। আর বেসরকারি পূবালী ব্যাংকের দুই হাজার ১১৬ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের পাঁচ হাজার ৭৬ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংকের তিন হাজার ৫২০ কোটি টাকা এবং প্রাইম ব্যাংকের তিন হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা রয়েছে অনাদায়ী।