চতুর্মুখী ফাঁদ

দুঃসাহসী সওদাগর: পর্ব-৪০

শামসুন নাহার: জি সিরিজ ডিবেঞ্চার ছাড়ার তিন দিনের মধ্যে আবারও ক্যাম্পেইন শুরু করল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। এবারের শিরোনাম, জি সিরিজ ডিবেঞ্চার, বন্ড বিক্রির জন্য যত মিথ্যাচার। এমনভাবেই রিপোর্টটি উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে রিলায়ান্সের শেয়ারহোল্ডাররা সত্যিকার অর্থেই দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। রিপোর্টে লেখা হয়েছে, ‘রিলায়ান্স পরিবারের সদস্য যাদের বলা হয় সেই শেয়ারহোল্ডাররা এখন দ্বিধাগ্রস্ত। একদিকে রিলায়ান্সের আশাপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে তাদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এ দুয়ের চাপে তারা এখন দিশেহারা। এখন তাকে বাস্তবসম্মতভাবে চিন্তা করতে হবে। অস্বাভাবিক সমৃদ্ধির মিথ্যা গালগল্পে বিশ্বাস না করে তাকে চোখ তুলে তাকাতে হবে। তাকে বুঝতে হবে, রিলায়ান্স যেভাবে সরকারকে ব্যবহার করে একচেটিয়া ব্যবসা করেছে, সেদিন আর নেই। এফ সিরিজ বন্ডকে রূপান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, পলিয়েস্টার সুতা আমদানির ওপর ১৫ হাজার রুপি অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। অথচ এ তথ্য কি শেয়ারহোল্ডারদের কাছে উপস্থাপন করেছে রিলায়ান্স? এসব পর্যালোচনা করেই বোঝা যায়, রিলায়ান্সের দিন ফুরিয়েছে। এখন উপায়ান্তর না দেখে মিথ্যাভরা ভুলভাল তথ্যকে পুঁজি করেছে তারা। কোনোকিছুই শেয়ারহোল্ডারদের প্রভাবিত করবে না বলে দাবি করেছে। এটা কীভাবে সম্ভব? মুনাফা কমলে তা অবশ্যই শেয়ারহোল্ডারদের প্রভাবিত করবে এবং মূলধন ব্যাপক হারে কমেছে। ১৯৮৬ সালের ২৭ জুন রিলায়ান্স দাবি করেছে, সে বছরের প্রথম পাঁচ মাসের আর্থিক অবস্থার ফলাফল আগের বছরের প্রথম পাঁচ মাসের চেয়ে অনেক ভালো। অথচ জি সিরিজ ডিবেঞ্চার ছাড়ার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে কোম্পানির আর্থিক চিত্র প্রকাশ করতে হয় এবং এতে কোম্পানির আর্থিক অবস্থার ভিন্ন রূপ উঠে এসেছে। এতে দেখানো হয়েছে, ১৯৮৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মুনাফা হয়েছে ২২ কোটি ৫৬ লাখ রুপি, যেখানে এর আগের বছর প্রথম ছয় মাসে মুনাফা ছিল ৬৩ কোটি রুপি এবং ১৯৮৪ সালে বছরের প্রথমার্ধে মুনাফা ছিল ৬১ কোটি রুপি। এ বছর বাকি অর্ধেকের অবস্থা আরও খারাপই হবে বৈকি। এমনকি প্রথম ছয় মাসের হিসাবেও অনেক ফাঁকি রয়েছে। অতিলাভের দিন শেষ। রিলায়ান্সেরও ঝাঁপিয়ে আগে যাওয়ার চেষ্টা না করে লাইনে দাঁড়ানো শিখতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতা এখন আর কাজে আসবে না।’

পত্রিকার রিপোর্ট কোনো অমোঘ বাণী নয়। তাতেও ভুল থাকতে পারে এবং প্রায়ই থাকে। কিন্তু বড় একটি বিজনেস হাউজের বিরুদ্ধে অসত্য বা দ্বিধাপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হলে তা অনেকগুলো ফ্যাক্টরকে প্রভাবিত করতে পারে। গুরুমূর্তির এ রিপোর্টের পর ২৬ নভেম্বর আবদুল রেহমান হুসেইন মালকারি মুম্বাই উচ্চ আদালতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। তার দাবি, তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা রিলায়ান্সের শেয়ারহোল্ডার। তাদের শেয়ার ও ডিবেঞ্চারের মূল্য মোট ৪০ লাখ রুপি। এক্সপ্রেসকে জি সিরিজের ডিবেঞ্চার প্রসঙ্গে আর কোনো রিপোর্ট প্রকাশ করা থেকে বিরত রাখার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেছেন মালকারি। নেতৃস্থানীয় আইনজীবীদের সহায়তায় মালকারি দাবি করেন, জি সিরিজ নিয়ে প্রকাশিত প্রথম নিবন্ধে ভুল তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। ১৯৮৬ সালের প্রথমার্ধের মুনাফাকে তুলনা করা হয়েছে ১৯৮৫ ও ১৯৮৪ সালের সম্পূর্ণ বছরের মুনাফার সঙ্গে। এভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রিলায়ান্সের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে এক্সপ্রেস। আর এর প্রভাব পড়ছে শেয়ারহোল্ডারদের ওপরেও। বিচারক এন কে পারেখ এক্সপ্রেসের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

এর পরই অবশ্য এ আদেশ তুলে নেওয়ার জন্য আবেদন করে এক্সপ্রেস। প্রতিশ্রুতি দেয় কোনো ভুল তথ্য প্রকাশ করা হয়ে থাকলে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দুই দিনের মধ্যেই তা প্রত্যাহার করে নিবন্ধ প্রকাশ করা হবে। এরপর ২৮ নভেম্বর বিচারক পারেখ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। তিনি বলেন, জনসাধারণের অধিকার রয়েছে সত্য জানার। আবার নিজেদের সম্পদকে রক্ষা করার অধিকারও তাদের রয়েছে। এরপর আর কোনো ভুল তথ্য প্রচারের কারণে জনগণের আর্থিক ক্ষতি হলে প্রমাণসাপেক্ষে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এক্সপ্রেসকে।

এর পরদিন এক্সপ্রে সিরিজ প্রকাশ অব্যাহত রাখল। এতে প্রথম আর্টিকেলে উল্লিখিত ভুল সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। অবশ্য এবার রিলায়ান্সের আর্থিক অবস্থার যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তাও নির্ভুল ছিল না। এর আগে এক্সপ্রেসের বক্তব্য যে শেয়ারহোল্ডারদের মনে রিলায়ান্সের প্রতি আস্থা কমাতে পেরেছে, তা নয়। শেয়ারহোল্ডাররা ভালো করেই জানতেন অন্যসব কোম্পানিকে পেছনে ফেলে কীভাবে রিলায়ান্স এগিয়ে যাচ্ছে। এ কোম্পানির পণ্যের মান ভালো সন্দেহ নেই; পণ্যের দামও তুলনামূলক কম, এটাও সত্য। কিন্তু এই জনপ্রিয়তাই মাত্র এক দশকে শতবর্ষী বিজনেস গ্রুপের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রধান হাতিয়ার নয়। রিলায়ান্সের শেয়ারহোল্ডাররা জানতেন, এ কোম্পানির লবিস্টরা এমন কিছু নেই; যা করতে পারেন না। সরকার রিলায়ান্সের করায়ত্তে। সরকারের সাহায্যেই বেয়ার কার্টেলরা রিলায়ান্সের ধারেকাছে ঘেঁষত না। রাজনৈতিক নেতাদের সুদৃষ্টির কারণেই রিলায়ান্সের শেয়ারমূল্য হয়েছিল ৩৯৩ রুপি। এক্সপ্রেস এত দিন যত অনুসন্ধান করে একের পর এক রিপোর্ট ছেপেছে, সেগুলোর বড় কোনো প্রভাবই পড়েনি শেয়ারহোল্ডারদের ওপর । অধিকাংশ বড় করপোরেট কর্মকর্তাদের মতো তারাও বরং অভিভূত হয়েছেন অর্থ ব্যবস্থাপনায় ও সরকার নিয়ন্ত্রণে আম্বানির দক্ষতা দেখে। তাদের কাছে কোম্পানির প্রবৃদ্ধি, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও মুনাফাই মুখ্য। তাই এবার এক্সপ্রেসের লক্ষ্য রিলায়ান্সের ওপর থেকে শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা কমিয়ে দেওয়া। রিলায়ান্স এখন কোণঠাসা অবস্থায় পড়েছে এবং সরকারের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, তা প্রমাণ করাই মূল উদ্দেশ্য। জি সিরিজের ওপর লেখা আর্টিকেলগুলো কিছুটা হলেও এ উদ্দেশ্য অর্জন করতে পেরেছে। রিলায়ান্সের শেয়ারমূল্য নেমে স্বাভাবিক অবস্থায় এসেছে। কোম্পানি অবশ্য এমন একটা ভাবমূর্তি প্রকাশ করছে যে, অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ধীরুভাইয়ের বৈঠক ও জি সিরিজের অনুমোদনই বলে দেয়, সরকারের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে কোম্পানিটি। প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক আসলে সাধারণ আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া কিছুই ছিল না।

এর কয়েক মাস পর রিলায়ান্সের শেয়ারমূল্য বাড়তে শুরু করে। ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি আসতে না আসতেই জি সিরিজের ডিবেঞ্চারের সফলতা প্রমাণিত হয়। সব প্রোপাগান্ডা সত্ত্বেও ডিবেঞ্চার কেনার জন্য বিনিয়োগকারীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বর্তমান শেয়ারহোল্ডার বাদে সাধারণ জনগণের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৩২ কোটি রুপির বন্ড। অথচ সাবস্ক্রিপশন জমা পড়েছে ৪৯৪ কোটি রুপির। এর কৃতিত্ব অনেকটাই কোম্পানির ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের এক তরুণ কর্মকর্তার ওপর বর্তায়। ২৯ বছর বয়সী আনন্দ জাইন মুকেশ আম্বানির ছেলেবেলার বন্ধু। ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি রিলায়ান্সে যোগ দেন। কয়েকদিন পরেই ধীরুভাই পুরোনো কলিগ চন্দ্রবদন চোক্ষীকে সরিয়ে কোম্পানির শেয়ার অপারেশনের দায়িত্ব দেন আনন্দকে। বোম্বের বড় স্টকব্রোকারদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের গোপনীয় তথ্য বের করেন আনন্দ। এরপর তাদেরই হুমকি দিয়ে বেয়ার কার্টেলদের দূরে হঠাতে সক্ষম হন। পুরো ব্যাপারটা আনন্দের পরিকল্পনামতোই ঘটে। রিলায়ান্স ক্যাপিটাল অ্যান্ড ফাইন্যান্স ট্রাস্টের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। একপর্যায়ে ধীরুভাইয়ের মৃত ভাগনে রশিকভাই আম্বানির জায়গা অর্জন করেন আনন্দ। কোম্পানির প্রধান লবিস্ট ও চুক্তি সম্পাদনকারীর কাজ করেন তিনি।

তো আপাতত আর্থিক চাপমুক্ত হতে পেরেছে রিলায়ান্স। পিটিএ ও ল্যাব প্লান্টের কাজ শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন পাওয়া গেছে। যদিও এ কাজে অন্তত ছয় মাসের মতো দেরি হয়ে গেল। কিন্তু এর পরও ধীরুভাই নির্দ্বিধায় এ কথা দাবি করতেই পারেন যে, তার ওপর শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা রয়েছে। সত্যি বলতে কি, তিনি তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। তবু তার বিপদ কেটে যায়নি। ইতোমধ্যেই এক্সপ্রেসের অনুমান সত্য হয়েছে। ১৯৮৭ সালের মাত্র দু’মাস বাকি। এখনকার অবস্থা হিসাব করলেও গতবছরের চেয়ে মুনাফা অনেক কম হবে। এছাড়া ভুরে লালও আছেন সুযোগের অপেক্ষায়। মুকেশ তার সঙ্গে সমঝোতা প্রস্তাব করলে ফিরিয়ে দিয়েছেন ভুরে লাল। ওদিকে ডু পন্ট ও কেমটেক্সে থেকেও নিয়মিত চাপ রয়েছে। রিলায়ান্সের সঙ্গে লেনদেন উভয় সংকটে ফেলেছে তাদের। সর্বোপরি রয়েছে শো কজের বিরাট জরিমানার ঝুঁকি। সব মিলিয়ে এখনও জটিল ফাঁদে আটকে আছেন আম্বানি।