প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

চলতি অর্থবছরে পিডিবির লোকসান বাড়ছে ১১%

নিজস্ব প্রতিবেদক:  গত ১০ বছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে তিনগুণের বেশি। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের অংশই বেশি। যদিও এসব কেন্দ্রের বড় অংশই ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক। এতে উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ কিনে কম মূল্যে বিক্রি করায় প্রতি বছর বড় অঙ্কের লোকসান গুনছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে চলতি অর্থবছর সংস্থাটির লোকসান রেকর্ড পরিমাণ বাড়ছে।
তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় ছিল ছয় টাকা ২৫ পয়সা। আর এ বিদ্যুৎ বিক্রির পাইকারি (বাল্ক) মূল্য ছিল চার টাকা ৮৪ পয়সা। এতে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পিডিবির লোকসান দাঁড়ায় ৯ হাজার ২৮৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা। সংস্থাটির ইতিহাসে এটি ছিল সর্বোচ্চ লোকসান। তবে চলতি অর্থবছর সে রেকর্ড ভেঙে লোকসান আরও বেড়ে যাচ্ছে।
চলতি অর্থবছর এপ্রিল পর্যন্তই পিডিবির লোকসান দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২৭১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এতে ১০ মাসেই রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সংস্থাটির লোকসান বেড়ে গেছে প্রায় ১১ শতাংশ। যদিও অর্থবছর শেষে এ লোকসান ১১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেকর্ড লোকসানের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে মনে করেন পিডিবির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক পরিচালক) মো. কাওসার আমীর আলী। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি জ্বালানি তেল আমদানি করে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধিও এদের ব্যয় বৃদ্ধির আরেকটি কারণ।
তিনি আরও বলেন, গত অর্থবছর নতুন এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার তেলভিত্তিক কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে। পাশাপাশি গ্যাসের সংকটের কারণে পুরোনো কয়েকটি কেন্দ্রও তেলে চালাতে হয়েছে। আবার বিদ্যুতের বাল্ক মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হলেও তা অনুমোদন করেনি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। উল্টো তা ছয় পয়সা কমানো হয়েছে। সবমিলিয়ে পিডিবির লোকসান বেড়ে গেছে।
পিডিবির তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চার হাজার ৪৩৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছিল সংস্থাটি। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে লোকসান ছিল তিন হাজার ৮৭৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সাত হাজার ২৮২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছিল পিডিবি। এছাড়া ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পিডিবি লোকসান গুণে ছয় হাজার ৮০৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছর পাঁচ হাজার ৪৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ছয় হাজার ৬৯৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ও ২০১০-১১ অর্থবছরে চার হাজার ৬২০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে গত ৯ বছরে সংস্থাটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৯১৩ কোটি টাকার বেশি।
যদিও এর আগের দুই অর্থবছর পিডিবির লোকসান ছিল অনেক কম। এর মধ্যে ২০০৯-১০ অর্থবছরে সংস্থাটি লোকসান গুণে ৬৩৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৮২৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। তবে ওই দুই অর্থবছর বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল খুবই কম।
এদিকে ঘাটতি মেটাতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি বছর ঋণ নিচ্ছে পিডিবি। আবার এ ঋণের ওপর তিন শতাংশ সুদও দাবি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। যদিও লোকসানের কারণে ঋণ পরিশোধ না করে তা ভর্তুকিতে রূপান্তরের জন্য বরাবরই প্রস্তাব দিয়ে আসছে পিডিবি। প্রতিবারই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণাতে সরকারের প্রতি এ আহ্বান জানিয়েছে বিইআরসি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত অর্থবছরই প্রথম ভর্তুকি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়।
লোকসানের ঘাটতি পূরণে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৫০ হাজার ৭৪০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিল পিডিবি। এর মধ্যে বাজেটারি সহায়তা বাবদ দেওয়া হয়েছে ৪৩ হাজার ১৬০ কোটি ১২ লাখ টাকা। আর সরকারি ঋণ সাত হাজার ৫৮০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এতে পিডিবির ব্যালেন্স সিটের অবস্থা খুবই করুণ হয়ে পড়েছে।
বিপুল এ আর্থিক চাপ সামাল দিতে পিডিবিকে প্রদত্ত পুরো ঋণ মওকুফ বা ভর্তুকিতে রূপান্তরে বিকল্প নেই বলে মনে করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি নিরসনের লক্ষ্যে সরকারি খাতের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। তবে বেসরকারি কেন্দ্রগুলো থেকে উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ কেনায় পিডিবির বড় অঙ্কের লোকসান হচ্ছে। এজন্য ঋণ মওকুফ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা চলছে।
গত অর্থবছর অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী পিডিবিকে প্রদত্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় সরকার যে অর্থ প্রদান করে তা ঋণ-ইক্যুইটি অনুপাত ৪০: ৬০ রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু বিগত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী বিউবো’র ঋণ-ইক্যুইটি অনুপাত ১১৪: (১৪)। পরে তা আরও বেড়ে গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী তা ৪০: ৬০-এ উন্নীত করার লক্ষ্যে পিডিবির ঋণকে ইক্যুইটিতে রূপান্তর করা দরকার।
পিডিবির আওতায় ইসিএ ফাইন্যান্সিংসহ ব্যাংক হতে ঋণগ্রহণপূর্বক একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ঋণ প্রদানের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য পিডিবির ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট ও ব্যালেন্স সিট অবলোকন করে থাকে। এক্ষেত্রে ইক্যুইটি ঋণাত্মক থাকায় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানসমূহ নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। তাই সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ঋণকে ইক্যুইটিতে রূপান্তরের জন্য চিঠিতে সুপারিশ করা হয়।

সর্বশেষ..