চাঁপাইয়ের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করছে অত্যাধুনিক চালকল

আম ও কাঁসা-পিতলের জন্য বিখ্যাত জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। কৃষি, শিল্প আর ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর ভর করে ঘুরছে এখানকার অর্থনীতির চাকা। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়ায় চাঙা হয়ে উঠছে জেলার অর্থনীতি। আমের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে অত্যাধুনিক চালকল। কৃষিভিত্তিক খাতটি গুরুপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে। এক সময় জেলায় অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ শিল্প ছিল কাঁসা-পিতল। পরবর্তীকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বোরো ধানের আবাদ। কয়েক বছরের মধ্যে জেলাটি উদ্বৃত্ত বোরো ধান উৎপাদনে সক্ষম হয়।
এখন পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জে যেসব
শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে, এর অধিকাংশই কৃষিভিত্তিক খাদ্য ও খাদ্যজাত পণ্য উৎপাদন করে। এর মধ্যে চালকলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখানে তিনটি বৃহৎ, ১১টি মাঝারি ও ৬৭৪টি ক্ষুদ্রশিল্প রয়েছে। খদ্যজাত পণ্য চাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নবাব অটো রাইস অ্যান্ড ফিড মিলস, মেসার্স এরফান সুপার রাইস মিল ও রোকেয়া অটোমেটিক রাইস মিলস (প্রা. লি.)Ñএ তিনটি জেলার বৃহৎ শিল্প। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০টি খাদ্যজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আর একটি জুট প্রডাক্ট। খাদ্য ও খাদ্যজাত পণ্য উৎপাদনকারী ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান ৩১০, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ ৫০, কাঠের ফার্নিচার ১০২, ‘স’ মিল ৩৪, স্টিল ফার্নিচার ৩৫, অ্যালুমিনিয়াম ফ্যাক্টরি ৫, বস্ত্রশিল্প ৩৫, প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং ২০, কেমিক্যাল দুই, পোলট্রি ফার্ম ৫০ ও বিবিধ শিল্প ৩১টি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, জেলায় প্রথম অটো রাইস মিল ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। উদ্যোক্তা তাইনুস আলী পৌরসভার নতুনহাট এলাকায় ‘সোনালী অটো’ নামে অটো রাইস মিল নির্মাণ করেন। এরপর ১৮ বছরের ব্যবধানে এটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায় পরিণত হয়। তারা বলছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে চালকলে বিনিয়োগ সব থেকে বেশি। এ বিনিয়োগের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও তা প্রায় ৬০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। কারণ প্রতিটি অটোমেটিক রাইস মিল তৈরিতে প্রায় ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকা প্রয়োজন। চালকল মালিক সমিতির তথ্যমতে, ছোট-বড় মিলিয়ে ৩২টি অটো চালকল রয়েছে। অটো মিলগুলো প্রতিদিন ছয় থেকে ১২ টন চাল উৎপাদন করছে। সুগন্ধি পোলাও চালের পাশাপাশি মিনিকেট, আটাশ, পাইজাম, স্বর্ণা, জিরাশাইল, গুটিস্বর্ণাসহ সব ধরনের চাল উৎপাদন করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপাদিত এরফান, বাঁশরী, সাগর, টি ইসলাম, নবাব, হক, মঞ্জুর ও পলাশ ব্র্যান্ডের চাল বাংলাদেশের বাজারে চাহিদার শীর্ষে রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপাদিত অন্যান্য চাল ১০ ভাগ ও পোলাওর চাল দেশের প্রায় ৫০ ভাগ চাহিদা পূরণ করে থাকে।
বর্তমানে দেশের অন্যতম খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী এরফান মিল রয়েছে এখানে। চাল খাত একদিকে অবদান রাখছে জেলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখছে। পৌরসভার অদূরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-আমনুরা সড়কের দু’ধারে বরেন্দ্র ভূমিতে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক চালকল। নির্জন এ অঞ্চলটি যে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এত বড় ভূমিকা রাখবে, তা হয়তো ২০০০ সালের আগে কেউ চিন্তাও করেননি।
এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পুরোনোগুলো সম্প্রসারণ ও নতুনভাবে গড়ে উঠছে একাধিক রাইস মিল। নাচোল উপজেলার লক্ষ্মীপুর এলাকায় নির্মাণাধীন রয়েছে সাতটি অটো রাইস মিল। এ মিলগুলোর নির্মাণ শেষ হলে শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রায় তিন হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। প্রতিদিন প্রায় ১৫০ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন সম্ভব হবে এ মিলগুলোয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার আয়তন এক হাজার ৭০২ দশমিক ৫৬ বর্গকিলোমিটার। এখানে মোট জমির পরিমাণ এক লাখ ৭০ হাজার ৪৮৩ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদি জমির পরিমাণ এক লাখ ৩৪ হাজার ৭৯৮ হেক্টর। সিংহভাগ আবাদি জমিতে ধান উৎপন্ন হয়। হিসাবমতে জেলার ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চালকল মালিক সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, শুধু আমার মিল থেকেই প্রতিদিন ১০০ টন পোলাও ও অন্যান্য ৩৩০ টন চাল উৎপাদন হয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে এ খাতটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা এসব অত্যাধুনিক চালকলে রফতানিযোগ্য মানসম্মত চাল উৎপাদন করা হয়। তিনি আরও জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপাদিত চাল রফতানির সুযোগ পেলে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এখানকার চাল বিদেশেও সুনাম অর্জন করবে বলে মনে করেন তিনি।
জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক ওবাইদুল ইসলাম পাঠান বলেন, চাল খাত জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অর্থনৈতিক বিবেচনায় জেলার অন্যতম সমৃদ্ধ খাত এটি। এ খাতের কারণে জেলায় প্রচুর আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সহযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে।

ফারুক আহমেদ চৌধুরী