চাকরির আবেদন ফি সহনীয় করুন

প্রায় ১৮ বছরের পড়ালেখার পাট চুকিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় আরও বড় ধরনের যুদ্ধের মুখে, আর তা হলো চাকরি পাওয়ার যুদ্ধ। সোনার হরিণ নামে পরিচিত এই চাকরি নিয়ে হাজারো সংগ্রাম আর ত্যাগের কথা এখন লোকমুখে প্রচলিত। দেশের গরিব, মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের জন্য সরকারি কিংবা বেসরকারি চাকরিই শেষ ভরসা। কিন্তু সেই চাকরির আবেদন প্রক্রিয়াটাই যেন এখন তাদের ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে।

চলতি বছর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী দেশে এখন বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ, যার মধ্যে অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত; স্নাতক বা তার চেয়ে উচ্চ ডিগ্রিধারী প্রতি ১০০ জনের ৯ জনই বেকার। এ বেকারদের জন্য শেষ ভরসা সরকারি কিংবা বেসরকারি চাকরি। কিন্তু এ চাকরির সংখ্যাও এখন অপ্রতুল। সামান্য কিছু পদের বিপরীতেই এখন আবেদন পড়ে কয়েক লাখ। ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষা যার সবচেয়ে বড় উদাহরণÑদুই হাজার ২৪টি পদের বিপরীতে আবেদন পড়েছে তিন লাখ ৮৯ হাজার। আর এই আবেদন করতে গিয়ে অসহায় চাকরি প্রার্থীদের যেন নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। কারণ এ আবেদন করতে গিয়েই যে তাদের গুনতে হচ্ছে সর্বোচ্চ এক হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত!

সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছেÑকিছু সরকারির চাকরির আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার টাকা থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত! শুধু তাই নয়, বিসিএস চাকরির পরীক্ষার জন্যও নেওয়া হয় ৭০০ টাকা! এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশে সরকারি চাকরির আবেদন করার ক্ষেত্রে এত বড় অঙ্কের ফি নির্ধারণ করা কতটা যৌক্তিক? এ পরিমাণ টাকা দেওয়ার সক্ষমতা এদেশের বিশাল বেকার যুবসমাজের কি আছে?

দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। কলেজ কিংবা স্কুলজীবনের অনেক বন্ধুও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাদের সংস্পর্শে আর নিজের অভিজ্ঞতায় বেকার যুবসমাজের কঠিন জীবনযুদ্ধ সম্পর্কেও ভালোভাবেই পরিচিত হওয়ার সুযোগ মিলেছে আমার। নিজেও যে এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হয়েছি, এটাও স্বীকার করে নিতে কোনো দ্বিধা নেই। মূলত বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর বছর কিংবা দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন শিক্ষার্থীরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দরিদ্র কিংবা নি¤œ মধ্যবিত্ত পরিবারের এসব শিক্ষার্থীর অভিভাবকেরা প্রয়োজনীয় অর্থ দিতে পারেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের সামান্য কিছু টাকার টিউশনি কিংবা পার্টটাইম কোনো চাকরি খুঁজে নিতে হয়। আর তা পাওয়াও কোনো সহজ কাজ নয়।

আর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করার পর তারা যেন পড়েন অথৈ সাগরে। বেকার জীবন, তারপর আবার পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার তাড়নাÑসব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করতে হয় তাদের। হলে থাকার সময় দেখেছি, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করা অনেক বড় ভাই বাড়ি যাওয়ার সময় বেশ কিছু টাকা খরচ হয়ে যাবে এ ভয়ে ঈদে পরিবার-পরিজন ছেড়ে হলেই কাটিয়ে দিয়েছেন। আর সেই তাদের সামনে সরকারি চাকরির আবেদন ফি কিনা এক হাজার ৫০০ টাকা!

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এক হাজার ৫০০ টাকা তো দূরের কথা, ৫০০ টাকা দিতে গেলেও অনেকের নাভিশ্বাস উঠে যায়। আর দেশের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা সরকারি চাকরিতে এত বড় অঙ্কের ফি নির্ধারণ কোন স্বার্থে? এর পেছনে উদ্দেশ্য কী? যেখানে একই স্কেলের সরকারি অনেক চাকরির পরীক্ষার আবেদন ফি নেওয়া হয় ২০০ থেকে ৪০০ টাকা, সেখানে কিছু পরীক্ষায় এত টাকা নেওয়া হচ্ছে কী কারণে? সংশ্লিষ্টদের বাড়তি আয় করে নেওয়াই কি এর পেছনে বড় উদ্দেশ্য?

বিপুল এই অর্থ নেওয়া চাকরিগুলোর পদসংখ্যাও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অর্ধশত কিংবা তারও অনেক কম। আর এ চাকরির আবেদন পড়ছে দেড় লাখ কিংবা দুই লাখের মতো। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ গুনতে হচ্ছে বিপদের মধ্যে থাকা এসব বেকার যুবসমাজকে? অনেকে টাকার অভাবে আবেদনই করতে পারছেন না। তাদের জন্য এটা কি বাড়তি একটা বোঝা নয়? এর মাধ্যমে সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে না?

আশার কথা হলো দেশের ব্যাংকগুলোর চাকরির আবেদন সম্পূর্ণ ফ্রি করে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বেসরকারি ব্যাংকের চাকরির ক্ষেত্রেও আবেদন ফ্রি করা হয়েছে। তাহলে সরকারি অন্যান্য চাকরির আবেদন ফি এত নেওয়া হবে কেন? বিষয়টি অবশ্যই সরকারের সংশ্লিষ্টদের গুরুত্বসহ ভেবে দেখতে হবে। সামান্য উপার্জন করা পরিবারের সন্তান, যারা বাবা-মায়ের পাঠানো সামান্য অর্থে কিংবা টিউশনি করে দিনাতিপাত করেন, তাদের পক্ষে কোনোভাবেই চাকরির আবেদনে এ পরিমাণ অর্থ দেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে চাকরির আবেদন ফি অবশ্যই যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। সম্ভব হলে চাকরির আবেদন ফ্রি করে দেওয়া, কিংবা ১০০ থেকে ২০০ টাকা করার বিষয়টি গুরুত্বসহ ভেবে দেখতে হবে। অন্যথায় বিশাল শিক্ষিত বেকার যুবসমাজের মধ্যে বড় ধরনের হতাশা জš§ নেবে, যা রাষ্ট্রীয়, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিকÑকোনো ক্ষেত্রেই ভালো ফল বয়ে নিয়ে আসবে না।

 

হুমায়ুন কবির

দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা