চাকরির প্রলোভনে দালালচক্র হাতিয়ে নিল কোটি টাকা

চট্টগ্রাম কাস্টমস

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের শূন্য পদে নিয়োগের প্রলোভনে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে দালালচক্র। কাস্টমস কমিশনারের স্বাক্ষর নকল করে নিয়োগপত্রও দিয়েছে তারা। দালালদের একজন নিজেকে কাস্টমস কর্মকর্তা পরিচয়ে ভুয়া পদবি ও ঠিকানা ব্যবহার করে প্রার্থীদের কাছে জনপ্রতি ১২ লাখ টাকা দাবি করে। এরই মধ্যে সে আটজনের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা করে এবং সালাউদ্দিন নামের যশোরের এক প্রার্থীর কাছ থেকে আট লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
যশোরের বাঘারপাড়ার বাবর আলীর পুত্র সালাউদ্দিন। মা কানিজ পারভীনকে নিয়ে বাবার সঙ্গে ৪ ডিসেম্বর তিনি এসেছেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে দালালের মাধ্যমে পাওয়া নতুন চাকরিতে যোগদান করতে। তার হাতে থাকা নিয়োগপত্রে নির্দেশ আছে ২৯ নভেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বরের মধ্যে যোগদান করতে হবে। সে মোতাবেক তিনি এসেছেন। কিন্তু চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে এসে দেখলেন ভিন্ন চিত্র। এই পদে কোনো নিয়োগ হচ্ছে না এখানে। নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ভুয়া। আর যে কর্মকর্তার মাধ্যমে চাকরি পেয়েছেন, তার কোনো অস্তিত্ব নেই এই হাউজে। ফলে মা ও বাবাকে নিয়ে বিপাকে পড়েন সালাউদ্দিন। এরপর নিয়োগপত্রটি নিয়ে কাস্টমস কমিশনারের ব্যক্তিগত সহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এ ধরনের কোনো নিয়োগ না হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত করেন তাদের।
সালাউদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে ছয়টি পদে ১৯৫ জনকে নিয়োগ দেবে এমন একটি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এর মধ্যে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে নিয়োগ দেওয়া হবে ৪১ জন। এর পরিপ্রেক্ষিতে এলাকার বড় ভাই সাইফুজ্জমান চৌধুরী ভোলার মাধ্যমে নোয়াখালীর মো. আনোয়ার হোসেনের (মোবাইল নং-০১৭২৬৬৫৪৫২২) সঙ্গে পরিচয় হয়। সে চট্টগ্রাম কাস্টমসের উচ্চমান সহকারী। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে তাদের পরিচয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আনোয়ার ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে ওই পদে নিয়োগ দিতে পারবে এমনটি জানিয়েছে ভোলা। চাকরি না হলে টাকা ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয় তারা। আর টাকা ফেরতের জামিনদার হিসেবে সাইফুজ্জমান চৌধুরী ভোলা নিজেই ছিল। তারা বলেছে, এই নিয়োগ আগে হয়ে গেছে। বর্তমানে কিছু পদ খালি আছে সেগুলোতে গোপনে নিয়োগ দিতে হবে। তাই লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা না নিয়ে আমাকে দিয়ে দুটি ফর্ম পূরণ করায়। এর ১৫ দিন পর আমার বাড়িতে পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য স্থানীয় থানা থেকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আসে।
পুলিশ ভেরিফিকেশনের পর চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনারের স্বাক্ষরিত স্মারক নং- এস/এষ্টব/১২/বিবিধ/নব-নিয়োগ/৪৭৩(অংশ-১)/২০১৮/৭২ তারিখ ২৫-১১-২০১৮-তে আমার বড়িতে নিয়োগপত্র আসে। নিয়োগপত্রে বলা হয়েছে, ২৯ নভেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বরের মধ্যে যোগদান করতে হবে। এর পর চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যলয়ে এসে ৩ ডিসেম্বর মেডিক্যাল করিয়েছি। আর ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে যোগদান করতে আসার পর পুরো প্রক্রিয়াটি ভুয়া প্রমাণিত হলো। চট্টগ্রাম কাস্টমস বলছে, এ ধরনের কোনো নিয়োগ এখানে হচ্ছে না এবং উচ্চমান সহকারী (এএমপি গেইট ডেলিভারি শাখা, কাস্টমস) আনোয়ার হোসেন নামে কোনো ব্যক্তি এখানে নেই। এছাড়া সালাউদ্দিন আরও বলেন, আমি ছাড়া সাতক্ষীরার আরও আটজনের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা করে নিয়েছে দালালরা। বাকি টাকা পরিশোধের জন্য তাড়া দিচ্ছে।
কানিজ পারভীন শেয়ারবিজকে বলেন, আমরা গরিব মানুষ। ছেলের চাকরির জন্য নিজেদের বাড়ি বিক্রি করে আট লাখ টাকা দালালকে দিয়েছি। এখন ঘর-ভিটে ছাড়া আমাদের কাছে কিছু নেই। আর বাবর আলীর প্রতিবেদকের সামনে আনোয়ার হোসেনকে ফোন করলে আনোয়ার নিয়োগের দিন কিছু খরচ আছে বলে জানিয়ে আরও ২০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে বলে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার ড. এ কে এম নুরুজ্জমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, আমার নাম ব্যবহার করে দালালচক্র নিয়োগপত্র পাঠিয়েছে। কিন্তু আমার স্বাক্ষরের সঙ্গে মিল নেই এবং আমার নামটিও ভুল লিখেছে। আর আনোয়ার হোসেন নামে আমাদের কোনো অফিস সহকারী নেই। এরা সংঘবদ্ধ দালালচক্র। এদের সঙ্গে অনেক লোক জড়িত থাকতে পারে। কারণ যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ কাজ করেছে তা খুবই জটিল।