প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

চাকরি খোয়ালেন পূবালী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক

স্বার্থের দ্বন্দ্ব বাড়ছে ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে

শেখ আবু তালেব: দেশের ব্যাংক পরিচালকদের আচরণ ক্রমেই লাগামহীন হয়ে পড়ছে। পরিচালকদের মন জুগিয়ে না চলায় একাধিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের পর্যন্ত বিদায় নিতে হয়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগও জমা হচ্ছে প্রচুর। সর্বশেষ সম্প্রতি পরিচালকদের স্বার্থে কাজ না করায় ব্যাংক থেকে বিদায় নিতে হয়েছে পূবালী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান জোদ্দারকে। দায়িত্বশীল সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মিজানুর রহমান জোদ্দারকে গত বছর জুলাইয়ের প্রথম দিকে পূবালী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক-১ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কয়েক সদস্যের আগ্রহে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কোনো বিধিনিষেধ না থাকায় ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অবসরে গিয়ে বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংকে যোগ দেন মিজানুর রহমান।
পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকটি স্বাধীনতার পরে পূবালী ব্যাংক হিসেবে রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছিল। পরে ১৯৮৩ সালে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রথম প্রজন্মের এ ব্যাংকটিতে পরিচালকদের দ্বন্দ্বের বিষয়টি এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। সর্বশেষ চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়েও পরিচালনা পর্ষদে গণ্ডগোল হয়। ভোটাধিকারের মাধ্যমে চেয়ারম্যান নিয়োগ ইস্যুতে এক পরিচালক পদত্যাগ পর্যন্ত করেন। পরে স্বতন্ত্র পরিচালক এম আজিজুল হককে চেয়ারম্যান করা হয়।
জানা গেছে, পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ মিজানুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সুবিধা আদায়ের জন্য। বিশেষ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আসা বিভিন্ন অডিট টিমকে যাতে ব্যাংকের পক্ষে ম্যানেজ করতে পারেন। এছাড়া কিছু কিছু ঋণে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নিতে হয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। সে বিষয়ে যাতে মিজানুর রহমান ভূমিকা রাখতে পারেন। এছাড়া পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে যাতে কোনো বাধা দিতে না পারেন।
সূত্র জানিয়েছে, এসব বিষয়ে তেমন সুবিধা করতে পারেনি পরিচালনা পর্ষদ। ফলে পর্ষদ সদস্যদের মনে হয়েছে, তাকে ব্যাংকে রেখে কোনো লাভ নেই। তিনি ব্যাংকের পলিসি বোঝেন কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংক চালাতে গিয়ে অনিয়মে সায় দেননি। ফলে পরিচালকরা মনে করেছেন, ব্যাংকে রেখে তাদের কোনো লাভ নেই।
অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদটি পূবালী ব্যাংকের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পরের ধাপের পদ। এজন্য ব্যাংকের সব সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাবনায় তার মতামত রাখতে হয়। কিন্তু সম্প্রতি কয়েকটি ঋণ মঞ্জুরি ও অনৈতিক সুবিধায় তার মতামত পাওয়া যায়নি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মিজানুর রহমানকে ব্যাংক ছাড়তে বলা হয়। এমনকি কয়েক ক্ষুব্ধ পরিচালক তার পাওয়ানাদি না দেওয়ারও প্রস্তাব করেন। কিন্তু অন্য পরিচালকদের হস্তক্ষেপে তা করা হয়নি।
এ বিষয়ে ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল এক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় মিজানুর রহমান জোদ্দারকে পূবালী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি পরিচালনা পর্ষদের মন জুগিয়ে চলতে পারেননি। এজন্য পরিচালকরা মিজানুর রহমানকে আর চাচ্ছেন না। তার ব্যাপারে পরিচালকদের মূল্যায়ন হলোÑমিজানুর রহমান পূবালী ব্যাংকের জন্য তেমন কিছুই করেননি, আবার ব্যাংকের কোনো ক্ষতিও করেননি। তাকে দিয়ে ব্যাংকের কোনো লাভ হচ্ছে না। এজন্য তাকে রাখার প্রয়োজন মনে করছেন না পরিচালকরা।
এরপরই পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মাধ্যমে মিজানুর রহমানকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তাকে বলা হয়, স্বেচ্ছায় পদত্যাগ পত্র দিতে।
পরিচালনা পর্ষদের এমন সিদ্ধান্তে মিজানুর রহমান অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে চাকরি ছাড়েন।
এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল হালিম চৌধুরী বলেন, ‘মিজানুর রহমান জোদ্দার পদত্যাগ করেছেন। তিনি এখন ব্যাংকে নেই।’ জোরপূর্বক পদত্যাগ হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
উল্লেখ্য, এর আগে দেশের ব্যাংক খাতে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মতের বাইরে যাওয়ায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা চাকরি হারিয়েছেন। সর্বশেষ দেশের বেসরকারি খাতের প্রথম প্রজন্মের এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ব্যাংক ছাড়তে হয়।
বেসরকারি ব্যাংকের শুধু এমডি পদে নিয়োগ ও বাতিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। কিন্তু পরিচালনা পর্ষদ না চাইলে কোনো এমডিই চাকরি বাঁচাতে পারেন না। এখন তারপরের স্তরেও এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে।

 

ট্যাগ »

সর্বশেষ..