হোম মতামত-বিশ্লেষণ চামড়া কেনায় কারসাজি ও নৈতিকতার প্রশ্ন

চামড়া কেনায় কারসাজি ও নৈতিকতার প্রশ্ন


Warning: date() expects parameter 2 to be long, string given in /home/sharebiz/public_html/wp-content/themes/Newsmag/includes/wp_booster/td_module_single_base.php on line 290

সাইফুল হুদা: মুসলমানদের ঈদ বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের যে কোনো বড় উৎসব ঘিরে অর্থনীতিতে বড় ধরনের লেনদেন ও বাজার প্রবাহ তৈরি হয়। কেবল বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের সব দেশেই উৎসবকেন্দ্রিক অর্থনীতির বড় ধরনের বাজার ও জিডিপিতে তার দৃশ্যমান অবদান রয়েছে। আমাদের দেশেও রোজার ঈদ বা ঈদুল ফিতর আর কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখছে। রোজার ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য সারা বছরের অর্থনীতিতে যেমন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে, তেমনই কোরবানির ঈদও এক্ষেত্রে খুব পিছিয়ে নেই।

এ ঈদ সামনে রেখে বছরব্যাপী খামারি ও পশু ব্যবসায়ীরা পছন্দমতো গরু-ছাগল পালন করে বাজারে বিক্রির জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ করেন। পাশাপাশি ভারত ও মিয়ানমার থেকে অনেক গরু বৈধ-অবৈধ উপায়ে দেশে আসে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারত সীমান্তে গরু পাচার রোধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় সেখান থেকে গরু আসা কিছুটা কমলেও তা একেবারে বন্ধ হয়নি। ঈদের সময়ও কিছু এসেছে। আমাদের উচিত ছিল ভারত সীমান্তপথে গরু পাঠানো বন্ধের কড়া উদ্যোগ নেওয়ার পর দেশে পর্যাপ্ত খামার গড়ে তোলার মাধ্যমে এ খাতে নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা। সেটা এখনও সম্ভব হয়নি। ভালোভাবে উদ্যোগ নিলে বিষয়টি যে অসম্ভব নয়Ñতা বলাই বাহুল্য।

কোরবানিকেন্দ্রিক ব্যবসার প্রথমেই আসে গরু-ছাগল তথা কোরবানির পশুর ব্যবসা। এবারের কোরবানির ঈদে কম-বেশি ৭৫ থেকে ৮০ লাখ গরু-ছাগল জবাই হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। এসব পশুর আনুমানিক বাজার কোনোভাবেই ১০ হাজার কোটি টাকার কম নয়। কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় খামার গড়ে তোলা ও অন্যান্য সুবিধাজনক উদ্যোগের মাধ্যমে চাহিদা মোতাবেক গরু-ছাগল দেশেই উৎপাদনের সুযোগ আমাদের রয়েছে। তা আমরা পুরো কাজে লাগাতে পারিনি। এবার অবশ্য আকস্মিক ও মৌসুমি বন্যায় অনেক গবাদিপশুর মৃত্যুর পাশাপাশি সেগুলোর লালন-পালন ও তা কোরবানির বাজারের জন্য ধরে রাখা এক বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। গবাদিপশুতে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য সরকারের ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প বড় অবদান রাখতে পারতো; কিন্তু এতে দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির কারণে তা কাজে আসেনি। যথেষ্ট নজরদারি থাকলে এমন প্রকল্প থেকে সুফল না আসার কোনো কারণ নেই।

কোরবানির ঈদে দেশব্যাপী গরু-ছাগলের চামড়া, চামড়া প্রক্রিয়াকরণ ও এ-সংক্রান্ত কিছু বিষয়ে আলোকপাত করা যাক।

প্রতি বছরের মতো এবারও দেশে চামড়া নিয়ে কারসাজি করে সরকার নির্ধারিত মূল্য না দিয়ে পানির দরে চামড়া কেনা, পাচার ও পাচারের প্রস্তুতি কোনোটারই কমতি ছিল না সুযোগসন্ধানীদের। চামড়া সংগ্রহ, এলাকাভিত্তিক গুদামজাতকরণ ও সারা দেশ থেকে ট্যানারিতে আনা ও প্রক্রিয়াজাত করা, সর্বোপরি পাদুকাসহ বিভিন্ন শিল্পের উপযোগী করে একে রফতানি করে বড় মুনাফা অর্জনের প্রচেষ্টায় ঈদের আগ থেকেই প্রস্তুত হয়েছিলেন এক শ্রেণির ট্যানারি মালিক থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী। এটা সবারই জানা, চামড়া আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের অন্যতম প্রধান খাত। গার্মেন্ট শিল্পের পরই এ থেকে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। কেবল দেশের অভ্যন্তরে কাঁচা চামড়া বেচাকেনার সঙ্গে এক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা জড়িত। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করে প্রায় অর্ধেক; আর বাকি টাকার কিছু বেসরকারি ব্যাংক ও ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করে থাকেন।

প্রতিবছরের মতো এবারও ট্যানারি ব্যবসায়ী ও প্রক্রিয়াজাতকারীরা অনেক দালাল নিয়োগ করেছিলেন; যারা তাদের হয়ে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে চামড়ার দামের প্রকৃত ভোক্তা হতদরিদ্রদের ঠকানোর কাজটি অবলীলায় করে গেছে। অনেক এলাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দেখা গেছে মসজিদ-মাদরাসার নামে ফ্রি চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রি করতে। পরে নামমাত্র অর্থ মসজিদ-মাদরাসায় দেওয়ার ঘটনা ঘটলেও এভাবে চামড়া সংগ্রহে ব্যবসায়ীদেরই লাভ। কেননা এমন সংগ্রহকারীদের হাত থেকে কম দামে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করতে পারেন তারা। এটা সত্য, আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা উৎসবকেন্দ্রিক বিশেষ করে দুই ঈদে পণ্য বিক্রির সময় মানুষের পকেট কাটেন আর নিজেরা যখন কোনো কিছু কিনতে যান, তখন কীভাবে পানির দরে কিনে অতিরিক্ত মুনাফা করা যায়Ñসে মতলবে থাকেন। রমজানের আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে নিয়ে কাপড়চোপড় ও কোরবানির অনেক আগে থেকে রফতানি কম, বিদেশ থেকে আসছে নাÑএমন অজুহাতে মসলার দাম বাড়িয়ে দেন। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। অথচ পৃথিবীর সব দেশেই উৎসবকেন্দ্রিক বাজারে ‘বেশি বিক্রিতে বেশি লাভ’ তত্ত্ব নিয়ে পণ্যমূল্যে ছাড় দেওয়ার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এদেশে এর বিপরীত অবস্থান জাতীয়ভাবে আমাদের নৈতিক স্খলনেরই প্রতীক বলা যায়।

চামড়া কেনার সময় কীভাবে ব্যবসায়ীরা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকেন, তা দেখা যাক। এ বছর সরকার গরুর চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তির দিকে হলেও ব্যবসায়ীরা হাজারীবাগ ছেড়ে সাভারের নতুন ট্যানারিপল্লিতে যাওয়ায় তাদের অসুবিধা বিবেচনায় নিয়ে গত বছরের দামই রাখে সরকার। ট্যানারি মালিকরা অবশ্য সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লবণ দেওয়া চামড়া আরও বেশি দামে কিনবেন। তবে মৌসুমি ও আঞ্চলিক ব্যবসায়ীরা চামড়া কেনার সময় সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বর্গফুটে না কিনে পিস হিসেবে কিনে থাকেন। এতে প্রথমেই কম দামে কেনার মাধ্যমে বড় মুনাফার সুযোগ তৈরি হয়। তারপর বিভিন্ন হাত ঘুরে উচ্চদামে সেটা বিক্রি হয়। ঈদের আগে শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বছর চামড়াপ্রতি ব্যবসায়ীরা মুনাফা করবেন দুই হাজার ২৫০ টাকার বেশি। অথচ গড়ে একটি চামড়া কিনতে এ পরিমাণ অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই খরচ হবে না। এবার সরকারি হিসাবে একটি চামড়া কিনতে সর্বোচ্চ খরচ ১২১০ টাকার মতো হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন গুজব তুলে, সিন্ডিকেট করে তা কেনা হয় সর্বোচ্চ ৫০০-৬০০ টাকায়। অনেক স্থানে গরুর সঙ্গে ছাগলের চামড়া ফ্রি নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম ও বিভিন্ন বিষয় হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতি বর্গফুট চামড়া নির্ধারিত ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় যদি কেনা হয়ও, তারপরও প্রতি বর্গফুট প্রক্রিয়াজাত করার পর লাভ থাকার কথা ১০২ টাকা।

এভাবে আন্তর্জাতিক বাজার ও প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায় দাম কম হওয়ায় আমাদের চামড়া পাচারের মুখে পড়ে প্রতিবছর, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পের জন্য বড় ক্ষতির কারণ। এবার পোস্তার আড়তে কাক্সিক্ষত পরিমাণ চামড়া আসেনিÑএখন পর্যন্ত মাত্র তিন লাখ পিসের মতো চামড়া এসেছে। ঢাকার আড়তে চামড়া কম আসার অর্থ হচ্ছে, এগুলো বিভিন্ন চক্র দেশের বাইরে পাচারের চেষ্টা করছে। ব্যবসায়ীরা অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। তারা বিনিয়োগ করেন, ঝুঁকি নেন। লাভ তারা করতেই পারেন। তবে কোরবানির পশুর চামড়া কেনার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে ব্যবসা করাটা দৃষ্টিকটু বলা যায়। কারণ এটা সবারই জানা, কোরবানির চামড়ার মূল্য হতদরিদ্রদের অধিকার। অনেকের জানা থাকার কথা, কোরবানির পশুর চামড়া যদি কোরবানি যিনি করেছেন, তিনি প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহার করেন, তবে সেটা যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহারের অধিকার তার আছে। কিন্তু যখনই এটি বিক্রি করে দেওয়া হবে, তখন ওই অর্থের মালিক কেবল হতদরিদ্ররা। কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ অনেকে এতিমখানায় দান করেন। এ চামড়া কিনে নিয়ে ব্যবসায়ীরা যখন আকাশচুম্বী মুনাফা করেন, তাও ছলেবলে কৌশলে, দালাল বসিয়ে কম দামে কেনার মাধ্যমেÑনিশ্চয়ই সেটি তখন নৈতিকতার মানদণ্ডে উতরে যেতে পারে না।

চামড়াশিল্প বর্তমানে এক ধরনের ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। হাজারীবাগ থেকে সাভারে গিয়ে এখনও ভালোভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারেননি অনেক ব্যবসায়ী। এরই মধ্যে চামড়া সংগ্রহে বড় কারসাজি হলো। পাচারেরও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিতে চামড়াশিল্পের অবদান ও মাঠ পর্যায়ে এর দামের প্রকৃত ভোক্তার আর্থিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সুষম একটি চামড়ানীতি করা গেলে কারসাজি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এতে শিল্পটি বিকাশেও তা বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

 

গণমাধ্যমকর্মী