প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

চার শর্তে সংরক্ষিত বনের জমি পেল রেলওয়ে

দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ নির্মাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার সীমান্ত গুনদুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০১০ সালে। ২০১৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। এ সময় দোহাজারী থেকে কক্সবাজার অংশটি ২০১৮ সালের মধ্যে শেষ করার শর্ত দেওয়া হয়। তবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি বুঝে না পাওয়ায় প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ঝুলে যায়। যদিও তিন বছর পর চার শর্তে রেলওয়েকে এ জমি বুঝিয়ে দেওয়া হলো।
রেলওয়ের তথ্যমতে, দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের জন্য বেসরকারি মালিকানাধীন এক হাজার ৩৬৭ একর জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন হবে। এর বাইরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত তিন সংস্থার ২১ একর জমি দরকার। আর সংরক্ষিত বনের ২০৭ একর জমি ডি-রিজার্ভপূর্বক অধিগ্রহণ করতে হবে।
বেসরকারি জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া ২০১৬ সালেই শুরু করা হয়। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জমি বুঝিয়ে দিতেও একই বছর চিঠি দেওয়া হয় জেলা প্রশাসকের দফতরে। তবে সংরক্ষিত বনের জমি রেলওয়েকে এতদিন বুঝিয়ে দিতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
সূত্র জানায়, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে কক্সবাজার জেলায় রয়েছে ১৬৫ দশমিক ১১ একর ও চট্টগ্রাম জেলায় ৪২ দশমিক চার একর জমি। ফলে ওই বনভূমি ডি-রিজার্ভের (গাছ কাটার) লক্ষ্যে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৭ সালের আগস্টে এবং ২০১৮ সালের মার্চে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীকালে একাধিকবার ওই বনভূমি ডি-রিজার্ভের জন্য তাগিদপত্র প্রেরণ করা হয়। এজন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আয়োজনের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু ওই বনভূমি ডি-রিজার্ভে কোনোরূপ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
অবশেষে গত ৬ জুন সংরক্ষিত বনের জমি ডি-রিজার্ভের প্রজ্ঞাপন জারি করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। এতে প্রকল্পটি সংশোধনের প্রায় তিন বছর এ জমি বুঝে পেল রেলওয়ে। তবে জমির গাছ কাটার জন্য চারটি শর্ত দেওয়া হয়েছে।
শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে বরাদ্দ করা বনভূমিতে বিদ্যমান গাছপালার মূল্য বাবদ প্রায় ১০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে রেলওয়েকে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিপূরণকল্পে যে পরিমাণ গাছ কাটা হবে, তার তিনগুণ গাছ বন অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে রেলওয়ে কর্তৃক রেললাইনের উভয় পাশে রোপণ করতে হবে ও ১০ বছর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। রোপিত গাছের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় বন অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে রেলওয়েকে তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া প্রকল্প এলাকায় বন্যহাতিসহ সব বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচলের জন্য আন্তর্জাতিক মানের ওভারপাস বা আন্ডারপাস নির্মাণ করতে হবে। আর ট্রেনের শব্দে বনাঞ্চলের প্রাণীর যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অংশে রেলওয়েকে শব্দ প্রতিরোধক (সাউন্ড বেরিয়ার) নির্মাণ করতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার ও রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ৮৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। তবে জমি অধিগ্রহণ বৃদ্ধি, ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ ও হাতি চলাচলের নিরাপত্তার যুক্তিতে ২০১৬ সালে সংশোধনের সময় প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ, নির্মাণ শুরুর আগেই প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয় ১৬ হাজার ১৮২ কোটি ১৩ লাখ টাকা বা ৮৭৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। তবে এ ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবেও রেলপথটি নির্মাণে গতি আসেনি।
প্রকল্পটির সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদনকালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) কিছু সিদ্ধান্ত দেয়। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল ‘দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩১ কিলোমিটার রেলপথ আবশ্যিকভাবে ডিসেম্বর, ২০১৮ সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে।’ একনেকের দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি ছিল ‘পর্যটন খাতসহ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের লক্ষ্যে প্রকল্পটি ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রকল্পভুক্ত করতে হবে।’ ২০১৭ সালেই প্রকল্পটি ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত করা হয়েছে। তবে এর কোনো প্রভাব পড়েনি রেলপথটি নির্মাণ ক্ষেত্রে। এখনও নির্মাণকাজ শুরুই করা যায়নি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক কাজী মো. রফিকুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে বেশকিছু জটিলতা ছিল। বিষয়গুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করা যায়, দ্রুতই প্রকল্পটির ভৌত নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে।

 

ট্যাগ »

সর্বশেষ..