প্রথম পাতা

চাল আমদানিতে শুল্ককর বেড়ে দ্বিগুণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের কৃষকদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা ও চাল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে চাল আমদানিতে শুল্ককর দ্বিগুণ করা হয়েছে। রেগুলেটরি ডিউটি (নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক) তিন শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। আর আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ ও অগ্রিম আয়কর পাঁচ শতাংশ বহাল রাখা হয়েছে। ফলে সব ধরনের চাল আমদানিতে বর্তমানে ৩৩ শতাংশের জায়গায় প্রজ্ঞাপন সংশোধন করে শুল্ককর ৫৫ শতাংশ করা হয়েছে। গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া সই করা হয়েছে। বাড়তি এ শুল্ককর প্রজ্ঞাপন জারির দিন থেকে কার্যকর হবে।
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) প্রায় তিন লাখ তিন হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। এতে দেশীয় কৃষকরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে চাল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। যার ফলে প্রান্তিক কৃষকরা আর্থিকভাবে বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি হতে রক্ষা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সদয় অনুশাসন অনুযায়ী আমরা আমদানি পর্যায়ে চালের ওপর শুল্ককর বৃদ্ধি করেছি।’
গতকাল এনবিআরের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ এ মুমেন সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এনবিআর চাল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে চালের ওপর বর্তমানে প্রযোজ্য আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ বহাল রেখে রেগুলেটরি ডিউটি তিন শতাংশ হতে বৃদ্ধি করে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ সব পণ্যের ওপর পাঁচ শতাংশ অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হয়েছে। ফলে চাল আমদানির ক্ষেত্রে মোট শুল্ককর ৫৫ শতাংশ (কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ+রেগুলেটরি ডিউটি ২৫ শতাংশ+অগ্রিম আয়কর পাঁচ শতাংশ) উন্নীত করা হয়েছে। এনবিআর আজ ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ/২২ মে ২০১৯ খ্রি. তারিখ এ সংক্রান্ত একটি এসআরও নং-১৩০ জারি করেছে, যা আজ থেকেই কার্যকর হবে।’
এবার বোরোর ভালো ফলনের পর সরকারি পর্যায়ে ধান-চাল কেনা শুরু না হওয়ায় কৃষকরা ফড়িয়াদের কাছে বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছিলেন। এতে উৎপাদন খরচ না ওঠায় অসন্তোষ থেকে পাকা ধানে কৃষকের আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষকদের রক্ষায় চাল আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করার সুপারিশ করেছিল খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
বৈঠকে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, সরকার সারা দেশে পাঁচ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ২০০টি ‘প্যাডি সাইলো’ নির্মাণ করার পরিকল্পনা করছে। সরকার ১৪ শতাংশ আর্দ্রতা সম্পন্ন ধান কিনছে। যে কারণে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে চাতাল মালিকদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করছেন। প্যাডি সাইলো নির্মাণ করা হলে কৃষক সেখানে নিজের ধান শুকিয়ে বিক্রি করতে পারবেন। এক মাসের মধ্যে এ প্রকল্পের জন্য ডিপিপি প্রণয়ন করা হবে। খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ধান যাতে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কেনা হয়, তা তদারকির জন্য ২০টি মনিটরিং টিম কাজ করবে। তারা কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করবে।
এর আগে, গত ১৯ মে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছিলেন, দেশের কৃষকদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চাল আমদানিতে কঠোর হবে সরকার এবং আমদানি নিরুৎসাহিত করতে অতিরিক্ত শুল্কারোপ করা হবে। পাশাপাশি দেশের বাড়তি চাল রফতানির উদ্যোগ হিসেবে ভর্তুকি দেওয়া হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সরকারি-বেসরকারিভাবে গত ১০ মাসে দুই লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। আমদানির অপেক্ষায় রয়েছে আরও তিন লাখ ৮০ হাজার টন চাল। ২০১৭ সালের মে মাসে হাওরে আগাম বন্যায় ফসলহানির পর সরকার চালের আমদানি শুল্ক উঠিয়ে দেয়। সরকার থেকে বলা হয়েছিল, এ ক্ষতির ফলে ঘাটতি হবে ১০ লাখ টন চালের। কিন্তু গত দু’বছরে দেশে প্রায় ৬০ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। গত নভেম্বরে সরকার ২৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক পুনর্বহাল করে। এতে চাল আমদানি কমলেও বন্ধ হয়নি। বাড়তি উৎপাদন ও আমদানির চাল বাজারে চাপ তৈরি করছে, ফলে দাম নিয়মিত কমছে। ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় বিপদে পড়েছেন কৃষকেরা। এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ-কর্মসূচিও পালিত হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি হিসাব বলছে, দেশে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এ বাড়তি চাল রফতানির বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কেন দেশে চাল আমদানি হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা।

ট্যাগ »

সর্বশেষ..