চীনা কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ডিএসইর চুক্তি সই

কৌশলগত বিনিয়োগকারী

নিজস্ব প্রতিবেদক: কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়ামকেই বেছে নিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। ২৫ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তর বিষয়ে গতকাল ওই কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ডিএসইর আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছে। এই চুক্তি পুঁজিবাজার ও অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘চীনের সঙ্গে চুক্তি দেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার উভয়ের জন্য ভালো। এতে আমরা লাভবান হবো। কারণ চীন অনেক বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। তারা অর্থনৈতিকভাবেও অনেক শক্তিশালী।’ এ সময় ‘পুঁজিবাজার আগে ভালো ছিল না। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় এখন অনেক ভালো’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএসইসি চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, ‘আজ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বৈচিত্র্যপূর্ণ ইতিহাসের আরও একটি বিশেষ দিন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সুদীর্ঘ ছয় দশকের পথচলায় আজকের দিনটি ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এক্সচেঞ্জের সফলতার এ নতুন মাইলফলক একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে ইঙ্গিত করছে।
ডিএসইর তথ্যমতে, দীর্ঘ কর্মকাণ্ডের পর বিশ্বের অন্যতম স্টক এক্সচেঞ্জ চীনের সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়াম ডিএসইর কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হলো। এতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তার ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। নতুন নতুন পণ্য বাজারে যুক্ত করে দেশের পুঁজিবাজারকে বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় ডিএসই।
তথ্যমতে, ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বিশ্বের ২৬তম ডিমিউচুয়ালাইজড স্টক এক্সচেঞ্জ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আর ডিমিউচুয়ালাইজেশনের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল ডিএসইর ২৫ শতাংশ শেয়ার কৌশলগত বিনিয়োগকারীর হস্তান্তর করা। এজন্য ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন মেনে কৌশলগত অংশীদারের কাছে ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করতে উš§ুক্ত দরপত্র আহ্বান করে ডিএসই। চীনের শেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়াম এবং ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক ত্রিদেশীয় কনসোর্টিয়াম অংশীদার হতে দাম প্রস্তাব করে।
চীনা কনসোর্টিয়াম ডিএসইর প্রতিটি শেয়ার ২২ টাকা আর তিন কোটি ৭০ লাখ ডলার কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব দেয়। এর বিপরীতে পক্ষে ত্রিদেশীয় কনসোর্টিয়াম প্রতি শেয়ারের দাম প্রস্তাব করে ১৫ টাকা। শেয়ারের দাম ও কারিগরি সহায়তা ‘আকর্ষণীয়’ হওয়ায় চীনা কনসোর্টিয়ামকেই কৌশলগত অংশীদার করার সিদ্ধান্ত নেয় ডিএসই। তবে ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান বাংলাদেশ সফরে এসে কৌশলগত অংশীদার হতে ডিএসইকে চাপ প্রয়োগ করে।
বিএসইসিও ভারতের পক্ষ নিয়ে ডিএসইকে চাপ প্রয়োগ করে। এমনকি চীনকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্য ডিএসইর দেওয়া প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেয় বিএসইসি। কৌশলগত বিনিয়োগকারী ইস্যুতে ভারত-চীন রশি টানাটানির কারণে বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সরকারের দায়িত্বশীলরাও এ প্রশ্নে ভারতের পক্ষে মত দেন।
সে সময় এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে দেওয়া বিবৃতিতে টিআইবি বলেছে, ‘বিদেশি অংশীদার বাছাইয়ে ডিএসইর ওপর অনৈতিক হস্তক্ষেপ ও চাপ সৃষ্টি করছে বিএসইসি। এই হস্তক্ষেপ বন্ধ করে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচিত করার পাশাপাশি অবৈধ চাপ সৃষ্টি করা প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হোক। পুঁজিবাজারের অস্বাভাবিক আচরণ রোধে উদ্যোগ ও পরিকল্পনায় এ ধরনের ঘটনা নেতিবাচক বার্তা দেবে। কারসাজি, যোগসাজশ ও কৃত্রিম হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করা চক্র অশুভ পাঁয়তারায় লিপ্ত কিনা তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি। অংশীদার বাছাইয়ে অবৈধ হস্তক্ষেপে বিএসইসির কেউ জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার।’
ডিএসইর সিদ্ধান্তে হস্তান্তরের কারণে দেশজুড়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে চীনা কনসোর্টিয়ামকেই বেছে নিল ডিএসই। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদের সভায় চীনা কনসোর্টিয়ামকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে বেছে নেয় ডিএসই। ১৯ ফেব্রুয়ারি চীনের কনসোর্টিয়ামকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে অনুমোদনের জন্য বিএসইসিতে প্রাথমিক প্রস্তাব জমা দেয় ডিএসই। এরপর ডিএসইর কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনা কনসোর্টিয়ামের কাছে ডিএসইর ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রির বিষয়ে গত ৩০ এপ্রিল পর্ষদ সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ওইদিন বিকালে বিএসইসি চেয়ারম্যান ড. এম. খায়রুল হোসেনের কাছে ডিএসইর কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনের কনসোর্টিয়ামের কাছে শেয়ার বিক্রির বিষয়ে চূড়ান্ত প্রস্তাব দেওয়া হয়। গত ৩ মে বিএসইসির কমিশন সভায় ডিএসইর কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনা কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তির অনুমতি দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ডিএসইর প্রতিটি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের সঙ্গে ১১ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২১ টাকা মূল্যে প্রায় ৪৫ কোটি শেয়ার বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনের শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল হাশেম, প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন, চীনের সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারভাইজরি বোর্ডের চেয়ারপারসন পেন শুয়েশিয়ান ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জের প্রেসিডেন্ট ও সিইও ওয়াং জেনজুন উপস্থিত ছিলেন।