চীনা ফান্ডের অর্থ বিনিয়োগে হাউজ মালিকদের লোকসান শুরু

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শেয়ারহোল্ডাররা সম্প্রতি বহুল কাক্সিক্ষত কৌশলগত বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে শেয়ার বিক্রির অর্থ হাতে পেয়েছেন। এরই মধ্যে সেই অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে শুরু করেছেন তারা। কিন্তু অর্থ বিনিয়োগ করে প্রথমেই হোঁচট খেয়েছেন, কারণ এর অর্থ বাজারে এনে এরই মধ্যে লোকসানে পড়েছেন সিংহভাগ হাউজ মালিক। ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ করেও প্রতিদিনই লোকসানের হিসাব কষতে হচ্ছে তাদের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যেসব হাউজ মালিক চীনা ফান্ডের অর্থে কর সুবিধা নিয়েছেন, তারা নির্দিষ্ট বিও অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে অর্থ বিনিয়োগ শুরু করেছেন। কিন্তু তারা যে উদ্দেশ্য নিয়ে বিনিয়োগ শুরু করেছিলেন, এখন তার উল্টোচিত্র দেখা যাচ্ছে। কারণ এরই মধ্যে তারা গুনতে শুরু করেছেন লোকসানের বোঝা। একাধিক ব্রোকারেজ হাউজে খোঁজ নিয়ে এমন তথ্য জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর একটি স্বনামধন্য বোকারেজ হাউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, চীনা ফান্ডের অর্থ বিনিয়োগ করে এরই মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এই অবস্থার জন্য বাজার পরিস্থিতিকে দায়ী করে তিনি বলেন, আমি যে শেয়ারগুলোতে বিনিয়োগ করেছিÑসবই মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি। এখানে রয়েছে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ার। কিন্তু এর পরও লোকসান রোধ করতে পারিনি। পুঁজিবাজার সঠিক নজরদারিতে নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একই ধরনের তথ্য মিলেছে আরও কয়েকটি হাউজ থেকে। অনেকেই এরই মধ্যে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা লোকসানে পড়েছেন। তারা বলেন, বাজারে এখনও ছোট ছোট কোম্পানির শেয়ার নিয়ে খেলা হচ্ছে। এই তালিকায় রয়েছে আরও কিছু দুর্বল এবং ‘জেড’ ক্যাটেগরির কোম্পানি। এসব কোম্পানির দৌরাত্ম্য থাকায় ভালো শেয়ারগুলোর দর বাড়ছে না। ফলে পুঁজিবাজারও তার স্বরূপে ফিরতে পারছে না।
তারা আরও জানান, এমনিতেই লেনদেন কমে যাওয়ার কারণে তাদের আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। এরপর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে সেখানেও লোকসান করতে হলে তাদের অবস্থা আরও করুণ হবে। এজন্য তারা সংশ্লিষ্টদের বাজার তদারকি বাড়ানোর আহ্বান জানান।
এর আগে কৌশলগত বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে পাওনা অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের শর্তে চলতি বছরের ৩০ অক্টোবর ১০ শতাংশ কর ছাড়ের প্রজ্ঞাপন জারির পর ডিএসই এই টাকা বিতরণ শুরু করে।
চীনের কনসোর্টিয়াম জোটটিকে ডিএসই’র কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চলতি বছরের ৩ মে অনুমোদন দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। বিএসইসি’র অনুমোদনের পর কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চলতি বছরের ১৪ মে চীনা জোটের সঙ্গে চুক্তি সই হয়। পরে চলতি বছরের ৩ সেপ্টেম্বর ডিএসই চীনা কনসোর্টিয়ামের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে এবং ৪ সেপ্টেম্বর চীনের কনসোর্টিয়াম ডিএসই’র শেয়ার গ্রহণ করে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে বাজারসংশ্লিষ্টরা বলেন, বর্তমানে বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো নয়, সে কারণে প্রায় সবাই লোকাসানে রয়েছে। এখানে ছোট-বড় বিনিয়োগকারী বলে কিছু নেই। হাউজ মালিকেরা যদি ভালো মানের শেয়ারে বিনিয়োগ করে থাকেন, তা হলে বিষয়টি নিয়ে তাদের চিন্তার করার কিছু নেই। কারণ ধৈর্য ধারণ করলে ভালো শেয়ার থেকে রিটার্ন আসবেই।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি নিতেই হবে। আর সব সময় ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে পুঁজি সেভ হবে, এমন কোনো কথা নেই। কারোই এটা ভাবা উচিত নয়। তবে সময়ের ব্যবধানে ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে লোকসান উতরে যাওয়া যায়।
কিছু শর্ত সাপেক্ষে চীনের দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে অন্যতম শর্ত হলো, যাবতীয় কার্যক্রম সিকিউরিটিজ আইন ও দেশের প্রযোজ্য অন্যান্য আইনসহ ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন ২০১৩ এবং ডিএসইর ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম অনুযায়ী পরিপালন করতে হবে। এই চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চুক্তি স্বাক্ষরের পরবর্তী এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করে কমিশনকে অবহিত করতে হবে। এছাড়া কমিশনের পূর্ব-অনুমোদন ছাড়া শর্তাবলির আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয় পরিবর্তন করা যাবে না।