মত-বিশ্লেষণ

চীনের প্রতি আমেরিকার মিথ্যাচার

স্টিফেন এস রোচ: ওয়াশিংটনের হাতে এখন চীনকে নিয়ে রয়েছে হরেক রকমের মামলা। এগুলো তারা বিশ্লেষণ করছে বহুভাবে। উপসংহারে আসছে বহুধা। কিন্তু সেসব উপসংহারে ওয়াশিংটন কেবল নিজেদের ক্ষতির মুখ দেখতে পাচ্ছে। আবার তারা চীনকে নিয়ে নানা ধরনের মিথ্যা কথা বলেও আমেরিকার জনগণকে ভুল বুঝিয়ে ধোঁকা দিতে পারছে না। হ্যাঁ, এটা সত্য যে চীনের এখনকার কার্যক্রম যে কোনো বিচারেই তাদের জন্য চিন্তার বিষয়, কিন্তু খারাপ উদ্দেশ্যে ও অসততার সঙ্গে চীনের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়াটা বেমানান বোধ হয়। বিশেষ করে এই চলমান দ্বন্দ্ব নিয়ে যত সব মিথ্যাচার চলছে, তা একেবারে মেনে নেওয়ার মতো বিষয় হতে পারে না।
আমেরিকার প্রভাবশালী দুটি দলের মধ্যে একমত হওয়ার মতো ঘটনা খুব বিরল। তারপরও রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটরা এখন একটি নির্দিষ্ট স্থানে এসে পৌঁছেছে। তারা উভয়ই চীনের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একমত-একাট্টা। এদিকে চীনা আক্রমণ কখনোই বিস্তর কোনো আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি।
কিন্তু চীনকে নিয়ে তারা যে সিদ্ধান্ত স্থির করেছে, তা আমেরিকার বুকে এতদিন ধরে ধারণ করা যাবতীয় স্বপ্নের জন্য একটি নির্মম হুমকি হয়ে দেখা দেবে। পরিশেষ তারা শোচনীয় পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে বাধ্য হবে। আসলে ট্রাম্প যে শুল্ক আরোপ করেছেন, তার পরিণতি ইটের বদলে পাটকেল হয়েই ফিরে আসবে। নানা রকমের নিরাপত্তা হুমকি দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। একটি নতুন শীতল যুদ্ধের ঘণ্টা বাজছে। এই দুই শক্তির মধ্যে অস্ত্রের দ্বন্দ্ব ও বৈশ্বিক আধিপত্য নিয়ে ফিসফিসানিও শোনা যাচ্ছে। একটি বাণিজ্যচুক্তিও খোলাখুলিভাবে নাকের ডগায় যেন ঘা দিচ্ছে। কিন্তু এসব ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে কেবল একটি কথাই বলতে লোভ লাগছে, ‘সব সংকটই কেটে যাবে।’ এটা একটি ইতিবাচক চিন্তা। সিনো-আমেরিকান আস্থা এখন ছিন্নভিন্ন টুকরায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাহ্যিক কোনো চুক্তি এসব সংকটময় পরিস্থিতি পরিবর্তনের কারণ হবে বলে কোনো সম্ভাবনা দেখা যায় না। বরং সামনের দিনগুলোতে সন্দেহ, উদ্বেগ ও দ্বন্দ্বের নতুন যুগ আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের এসব বকবকানি সব মিথ্যা হয় এবং চীনের ওপর এসব আক্রমণের মূল কারণটা যদি বহিরাক্রমণের হুমকির চেয়ে তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধির জন্য বেশি ক্ষতিকর হয়ে থাকে, তবে তার পরিণাম কী হবে? তবে নিশ্চিত করেই এটা বলা যেতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্র এসব মিথ্যাচারের মাধ্যমে কেবল নিজের জন্য ক্ষতিই ডেকে আনছে। তারা মূলত তাদের ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য ক্ষুন্ন করছে। তাতে তারা তাদের বিশ্ব নেতৃত্বের সক্ষমতাকে কেবল তিল তিল করে খুইয়ে বসার দুয়ার উম্মোচন করছে। এখানে বাণিজ্যই বিবেচনার বিষয়। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে ৪১৯ বিলিয়ন ডলারের মার্চেন্ডাইজ বাণিজ্য ঋণে পড়েছে। মোটের ওপর এটা ৮৭৯ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতির মধ্যে ৪২ শতাংশ। এটা নিয়ে বিতর্ক চলছে বেশ বড় আকারে। ট্রাম্পের ভাষায় এই ক্ষতিটাকে ‘কার্নেজ’ (গণহত্যা) বলতে হয়। এর মাধ্যমে চাকরি হারানো ও মজুরি সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প তো নয়ই, বরং যুক্তরাষ্ট্রের আরও অন্যান্য রাজনীতিকও স্বীকার করবেন না যে, তাদের এই ক্ষতির পেছনের একমাত্র কারণ হলো ১৯১৮ সালে তারা ১০২টি রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঋণে পড়ে গেছে। এটা মূলত দেশটির অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের অধঃপতন বলেই সংজ্ঞায়িত করা হয়। তবে এই অধঃপতন যে তাদের বাজেটে ঋণের দায় বাড়িয়ে দিয়েছে, তা কংগ্রেস ও রাষ্ট্রপতি সত্য বলে মেনে নিয়েছেন। তবে এখানে সরবরাহ-বলয়ের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে তারা স্বীকার করেন না। এই সরবরাহ বলয়ের বেশিরভাগই আসত বিভিন্ন দেশ থেকে, কিন্তু তা প্রথমে চীনের হাতে যেত, চীন সেসব পণ্যের অ্যাসেম্বলেজ করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিত। এমনকি এই ক্ষতির মাধ্যমে যে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য ভারসাম্য ৩৫-৪০ শতাংশ খাটো হয়ে গেছে তা তারা স্বীকার করছে না। বৈশ্বিক উৎপাদন প্ল্যাটফর্মের প্রাথমিক ব্যষ্টিক অর্থনীতি ও নতুন সক্ষমতা যে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের লাভবান করে, সেটাও তারা মানতে চায় না। এটা স্পষ্ট যে, আবার নতুন করে আমেরিকার পক্ষে বিশ্বের বুকে বুক চেতিয়ে ওঠার জন্য চীনকে যেকোনোভাবে নিন্দা বা গালাগাল করা সহজ, কিন্তু বাস্তবতা তা নয়।
এরপর তারা চীনকে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা চুরিরও দায় দিয়ে যাচ্ছে। এখন তারা সত্য বলে ধরে নিচ্ছে যে, চীন আমেরিকার বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার শত শত বিলিয়ন ডলার চুরি করছে প্রতি বছর। ফলে এটা আমেরিকার নিত্যপ্রবর্তনী পরাক্রম শক্তির একেবারে মর্মমূলে গিয়ে আঘাত হানছে। এই দাবির গৃহীত উৎস তথাকথিত আইপি কমিশন ২০১৭ অনুসারে বলা যায়, ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ২২৫ থেকে ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এটা একটি হাস্যকর তথ্য। যদি সত্য বলে ধরে নিই, তবে অঙ্কটি একটি ক্ষীণ দৃষ্টান্তে স্থির থাকবে। একটি সন্দেহজনক প্রক্সি মডেলিং হিসেবে সংজ্ঞায়িত হবে। এটা মূল্য চুরির বাণিজ্য গোপনীয়তায় আটকে যাবে বিভিন্ন ধরনের পৈশাচিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। যেমন মাদক পাচার, দুর্নীতি, পেশাগত প্রতারণা ও অনৈতিক আর্থিক প্রবাহ। চীনের বিরুদ্ধে এই চুরির অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস ও বর্ডার প্যাট্রোল ডেটা থেকেই এসে থাকে মূলত। এটা ২০১৫ সালের মোট জাল ও চুরিকৃত পণ্য থেকে নিষ্কাশিত, যার পরিমাণ এক দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। এই অঙ্কের পরিমাণটি সমানভাবে সন্দহজনক চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় রাষ্ট্রের প্রতিই। এই ছোট অঙ্কটি আনুমানিক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বর্তায় এবং একই সঙ্গে চীনের সর্বোপরি হিসেবের ৮৭ শতাংশের ওপর আরোপিত হয়। আর এটা যদি সত্য হতো তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসটিআরের ২০১৮ সালের মার্চের সেকশন ৩০১ প্রতিবেদনে ‘রেড হেরিং’ হিসেবে চিহ্নিত হতো। এই প্রতিবেদনে মূলত চীনের শুল্ক ও লেভিকে ভিত্তিগত মূল্যায়ণে প্রকাশ করা হয়ে থাকে: মূলত বলপ্রয়োগকারী প্রযুক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিভিন্ন জয়েন্ট ভেঞ্চারের মধ্যে বিনিময় হয়ে থাকে। এখানে ‘বলপ্রয়োগ’ শব্দটিই প্রধান শব্দ। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেসব অভিযোগবিহীন কোম্পানিকেই ইঙ্গিত করা হয়ে থাকে, যেসব কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবেই চীনের মতো বিরোধী পক্ষের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে চীনা কোম্পানিগুলোর ব্যবসা করতে হলে তাদের মালিকানাস্বত্বকে সমর্পণ করতে বাধ্য হতে হয়। এমনকি তারা তাদের ব্যবসাকৌশল, পরিচালনা প্ল্যাটফর্ম ও পণ্য পরিকল্পনাকে জনগণের সামনে খোলাসা করে থাকে। কিন্তু সমগ্র মালিকানাস্বত্ব এখানে নিগৃহীত হয়ে থাকে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের মূল মালিকানা প্রযুক্তিগুলো তাদের বিরোধী পক্ষ চীনের কাছে সমর্পণ করার ব্যপারে কোনো কথাই কানে তোলে না। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানিকে ব্যবসা করতে গেলে এই বৈষম্যের বিষয়টি কি একেবারেই মাথায় আনতে হবে না। অথচ চীনের এর চুরির অভিযোগের বিরুদ্ধে সেকশন ৩০১ প্রতিবেদনে কোনো শক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি; এটাকে নিশ্চিয় শক্ত কোনো অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একটি নরম কিন্তু দুঃখজনক দৃষ্টান্ত বলতে হয়। উল্লেখ্য, আইপি কমিশনের মতোই ইউএসটিআরও যুক্করাষ্ট্র-চীনের ব্যবসা পরিষদের মতো একটি বড় প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্য তদন্তে প্রক্সি সার্ভের উপর নির্ভর করে থাকে। দেখা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের উত্তরদাতারা তাদের নিজেদের দেশের (যুক্তরাষ্ট্রের) প্রযুক্তি ব্যবহারে চীনের আচরণের ব্যাপারে নানারকম দুঃখজনক তথ্যই দিতে থাকে। আবার ওয়াশিংটন তাদের কথাবার্তায় চীনকে নিয়ে এমন এক চিত্র আঁকতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে চীনকে সবার মাঝে একটি জলহস্তী রূপে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। আর তার আশেপাশে বসে আছে বহুল পরিচিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন বড় বাণিজ্য উদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠান। এগুলো প্রিফারেনশিয়াল ক্রেডিটস, অবৈধ ভর্তুকি ও ইনসেনটিভ ভোগ করে থাকে, যা অনেক উঁচু মানের শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়ে চীনের মেইড ইন চাইনা ২০২৫ ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্ট ২০৩০-এর মূলনীতির সঙ্গে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের নিচু-সক্ষমতা, নিন্ম-মানের লভ্যাংশ আহরণের বড় বড় উদাহরণের ক্ষমতাকে কোনোভাবেই নজর দেওয়া হয় না। এমনকি এখানে তুলনাযোগ্য শিল্পনীতিতেও কোনো সন্দেহ থাকে না। এমনকি এই নীতিমালাগুলো এর আগে জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স ও এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও চর্চা করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এই আদেশে একটি এআই উদ্যোস গ্রহনের কথা বলা হয়েছে। এই এআই অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য ১২০ দিনের মধ্যে একটি কাঠামো প্রণয়নের আদেশও দেওয়া হয়েছে। চীন কিন্তু তাদের নিজেদের দেশের জাতীয় নীতি প্রস্তুতের জন্য খুব কম সময়ই কষ্টে পড়ে। তারা মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এ বিষয়ে। আবার পরিশেষে চীনা মুদ্রা জালিয়াতির ক্ষেত্রেও একটি সময়সাপেক্ষ ইস্যু এসে হাজির হয়। তবে আশঙ্কা করা হয় চীন অবৈধভাবে প্রতিযোগিতায় সুবিধা আদায় করতে ইচ্ছাকৃতভাবেই তাদের মুদ্রানীতি রেনমিন্বিকে দমিয়ে রাখবে। এমনকি ২০০৪ সালের শেষের দিকে সত্যিকার অর্থে চীনের বিস্তর পরিসরের বাণিজ্যবান্ধব মুদ্রা ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। তার পরিণতি ভালো হয়নি তাদের এককালের অনেক বড় আকারের চলতি হিসাব উদ্বৃত্তি এখন নিঃশেষ হয়ে গেছে, কিছুই নেই। এমনকি বিগত বছরের সেই মুদ্রাকেন্দ্রিক দুর্দশা এখনও রয়েই গেছে। এ বিষয়ের ওপর সবারই একটি নজর রয়েছে। এটা কেবল মিথ্যাচারকেই আরও জটিল করে তোলে। সর্বোপরি ওয়াশিংটন তাদের হাতে থাকা বিভিন্ন দৃষ্টান্ত, বিশ্লেষণ ও উপসংহার নিয়ে একটি গোলেমেলে ক্ষতির পরিবেশে পড়ে আছে। আবার তারা চীনকে নিয়ে নানা ধরনের মিথ্যা কথা বলেও আমেরিকার জনগণকে ভুল বুঝিয়ে ধোঁকা দিতে পারছে না। হ্যাঁ, এটা সত্য যে চীনের এখনকার কার্যক্রম যে কোনো বিচারেই তাদের জন্য চিন্তার বিষয়, কিন্তু খারাপ উদ্দেশ্যে ও অসততার সঙ্গে চীনের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়াটা বেমানান বোধ হয়। বিশেষ করে এই চলমান দ্বন্দ্ব নিয়ে যত সব মিথ্যাচার চলছে, তা একেবারে মেনে নেওয়ার মতো বিষয় হতে পারে না। দুঃজনক হলেও সত্য যে, কোনো বিষয়ের ওপর বাহ্যিকভাবে দোষ চাপিয়ে দেওয়াটা খুব সহজ ব্যাপার, কিন্তু আয়নায় নিজের মুখটি দীর্ঘক্ষণ সুক্ষ্মভাবে দেখাটা বড়ই কঠিন।

সাবেক চেয়ারম্যান ও চিফ ইকোনমিস্ট
মরগান স্ট্যানলি এশিয়া
ফেলো ও সিনিয়র লেকচারার, ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে
ভাষান্তর: মিজানুর রহমান শেলী

সর্বশেষ..



/* ]]> */