চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা রদ হলে সুফল মিলবে

অবশেষে রাজধানীতে চুক্তির ভিত্তিতে যাত্রীবাহী বাস চালানো বন্ধ হতে যাচ্ছে বলে খবর মিলল। গত বুধবার বিআরটিসি ভবনে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানায় ঢাকাভিত্তিক পরিবহন মালিকদের সংগঠন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। এটি নিঃসন্দেহে ভালো সিদ্ধান্ত। চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানোর কারণে চালকরা একে অন্যের আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা করেন। বেশি যাত্রী তোলার এ পাল্লা থেকেই ঘটে অধিকাংশ দুর্ঘটনা। তাই দুর্ঘটনা বন্ধে প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনকে সমর্থন দিয়ে এ ঘোষণা দেওয়া হলো। এবার সিদ্ধান্তটির বাস্তবায়ন কতটা হয়, তার ওপর নির্ভর করছে এর সফলতা।
নতুন এ পদ্ধতিতে পরিবহন মালিকরা চালকদের বেতনের ভিত্তিতে নিয়োগ দেবেন, যেটা অনেকদিন ধরেই দাবি করা হচ্ছিল। এতে চালকরা নির্ভার হতে পারবেন টার্গেট পূরণের চাপ থেকে। বেশি ট্রিপ নেওয়া বা অতিরিক্ত যাত্রী তোলার সঙ্গে তাদের আর্থিক প্রাপ্তির সম্পর্ক এখন থাকবে না। এতে যত্রতত্র বাস থামিয়ে প্রতিযোগী গাড়ির পথ রোধ করার প্রয়োজনও ফুরাবে নিশ্চয়ই। যানজট হ্রাসেও এর প্রভাব পড়বে। সম্প্রতি সড়ক সংলগ্ন ফুটপাতে অপেক্ষমাণ দুই শিক্ষার্থী দ্রুতগামী বাসের চাপায় পিষ্ট হয়। এ ঘটনায় সড়ক দুর্ঘটনায় চালকদের বেপরোয়া মনোভাবই যে বড় কারণ, তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু কেন চালকরা দিনদিন এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠছেন, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। সীমিত উপার্জন, যানজট ও দুর্নীতিÑএসব মিলে গড়ে ওঠা অব্যবস্থাই চালকদের এদিকে প্ররোচিত করেছে। সড়কে নৈরাজ্যের বিষয়টি আসলে কিছু পরস্পর সম্পর্কযুক্ত সমস্যার সম্মিলিত রূপ। তাই চুক্তিভিত্তিক বাস চালানো বন্ধের পাশাপাশি চালকদের মধ্যে যাত্রীবান্ধব মনোভাব তৈরিতে আরও কিছু ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে।
আলোচ্য সিদ্ধান্তটির বাস্তবায়ন হলে তা যাত্রী ভোগান্তি কমাবে, সন্দেহ নেই। চালকদের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারটিও মাথায় রাখতে হবে। তাদের বেতন যাতে নিয়ম মেনে ও বাস্তবসম্মতভাবে ধার্য হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সেটা না হলে তারা আয় বৃদ্ধির কোনো না কোনো উপায় খুঁজে নেবেন। এটি আবার যাত্রীদের নতুন ভোগান্তির কারণ হতে পারে। মিটারচালিত সিএনজি অটোরিকশার ক্ষেত্রে আমরা এমনটি দেখেছি। মিটারে ভাড়ার হার ন্যায্য প্রতিভাত হলেও চালকরা একপর্যায়ে তা আর মেনে চলেননি। যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো বাড়তি ভাড়া আদায় করে চলেছেন তারা এখনও। তাই সঠিকভাবে বাসচালকদের বেতন নির্ধারণ করতে হবে। অন্য কোনোভাবে তাদের বেশি যাত্রী তুলতে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারেও কর্তৃপক্ষকে সজাগ থাকতে হবে। পরিবহন শ্রমিক হিসেবে তাদের অন্য সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করা চাই। তাদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধিতেও পদক্ষেপ নিতে পারে দায়িত্বশীল মহল। কর্মমুখী প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের নৈতিক প্রশিক্ষণও প্রয়োজন। পরিবহন শ্রমিকদের হাতে বহু মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নির্ভর করে। অথচ তাদের বেশিরভাগেরই পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটুকু নেই। আইন সংস্কারের মাধ্যমে সেটি নিশ্চিত করার প্রয়াস অবশ্য নেওয়া হয়েছে সম্প্রতি। এমন পদক্ষেপ না নিয়ে তাদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করা আসলে বোকামি। সরকার ও সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোকে এ ব্যাপারে যত্নশীল হতে হবে। পরিবহন শ্রমিকরা আর্থিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে ভালো থাকলে যাত্রীরাও তাদের হাতে কিছুটা নিরাপদ থাকবেন বলে মনে হয়।