প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

চেয়ারম্যানের পরিবারকে অনৈতিক সুবিধা দিতে তৎপর ডাচ্-বাংলা

শেখ শাফায়াত হোসেন: আশপাশের সবাইকে বলা হচ্ছে নির্মাণাধীন ভবনটি ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের। কিন্তু ভবনটি আসলে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান সায়েম আহমেদের মা এবং সাবেক চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন আহমেদের স্ত্রী আছমা আহমেদের নামে। মালিকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এই ভবনে প্রধান কার্যালয় প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে তিন বছরের অগ্রিম ভাড়া বাবদ ৯৭ কোটি টাকা প্রদানের জন্য ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদনও করেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ওই ভবন ভাড়া নিয়ে প্রধান কার্যালয় করার বিষয়ে আপত্তি রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের।
গতকাল মঙ্গলবার ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন আহমেদ, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবুল কাশেম মো. শিরিন এবং ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তাকে নিয়ে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।
জানা গেছে, বৈঠকে ওই ভবনের ভাড়া বাবদ যে টাকা দেওয়া হবে তা দিয়ে নিজেরাই কেন এমন ভবন নির্মাণ বা কিনে প্রধান কার্যালয় প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি সে বিষয়টিতে গুরুত্বারোপ করা হয়। ভবনটি ভাড়া না নিয়ে ফ্লোরস্পেস কিনে নেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়। তাছাড়া ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের তুলনায় স্থাবর সম্পদের পরিমাণও নির্ধারিত সীমার অনেক কম থাকায় আরও কিছুটা সম্পদ কেনার সুযোগ ছিল বেসরকারি এই ব্যাংকটির। এসব বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়। ব্যাখ্যা লিখিত দেবেন বলেও জানিয়েছেন ব্যাংকটির এমডি মো. শিরিন। ওই ব্যাংখ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংক সন্তুষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট ভবনে ফ্লোর ভাড়া নেওয়ার অনুমোদন পাবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক।
অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বর সংলগ্ন নির্মাণাধীন ২১ তলা এ ভবনটিতে এক লাখ ৬৫ হাজার বর্গফুট জায়গা ভাড়া নিতে চায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। তবে সম্প্রতি সাইটটি সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সেখানে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সাইটের কোনো সাইনবোর্ড টানানো হয়নি। ফলে ভবন সম্পর্কিত প্রাথমিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় লোকজন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কাছে ভবনটি ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বলে প্রচার করা হয়েছে।
সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন আহমেদের স্ত্রীর নামে ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কাছে ভবনটি ভাড়া দেওয়া হবে। অন্য কারও কাছে ভবন ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা ভবন মালিকের নেই।
বর্তমানে শাহাবুদ্দিন আহমেদের ছেলে সায়েম আহমেদ ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।
জানা গেছে, ওই ভবনে প্রধান কার্যালয় করার জন্য অগ্রিম ভাড়া বাবদ অর্থ পরিশোধের অনুমোদন চেয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক।
প্রতি বর্গফুটের ভাড়া মাসে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হতে পারে এমন কথা বলা হয়েছে আবেদনের সময়। এক লাখ ৬৫ হাজার বর্গফুট জায়গা ভাড়া নেওয়া হবে। এতে তিন বছরের অগ্রিম ভাড়া বাবদ ৯৭ কোটি টাকা বা এরকম একটি অঙ্ক ব্যাংক থেকে ওই ভবন মালিক অর্থাৎ ব্যাংক মালিকদের দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন চাওয়া হয়।
এসব বিষয়ে কথা বলতে গত সপ্তাহের মঙ্গল, বুধ এবং বৃহস্পতিবার তিনদিন স্বশরীরে মতিঝিলে সেনা কল্যাণ ভবনে অবস্থিত ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বর্তমান প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে ব্যাংকের এমডি আবুল কাশেম মো. শিরিনের সঙ্গে দেখা করতে চেষ্টা করেও তার দেখা পাওয়া যায়নি।
প্রতিদিনই বেশ কিছুক্ষণ বসিয়ে রেখে পরের দিন আসতে বলা হয়। সর্বশেষ গত রোববারও ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে এমডি আবুল কাশেম মো. শিরিনের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ ধরনের সাক্ষাৎ সম্ভব নয় বলেও জানানো হয়।
পরে মোবাইল ফোনে কথা বলার জন্য একাধিকাবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এসএমএস পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু উল্লেখ করে এমডির ই-মেইল ঠিকানায় যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো জবাব দেননি তিনি। গতকাল গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ডাচ্-বাংলার এমডিকে প্রতিবেদক পরিচয় দিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হয়। এবারও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সাইটের সাইনবোর্ডহীন এই ভবনটির বিভিন্ন জায়গায় ছোট করে লেখা ‘সাবধান, নির্মাণকাজ চলছে’। বাংলাদেশ ব্যাংকের উত্তর দিকের গেটের উল্টো দিকে নির্মাণাধীন ওই ভবনের সামনের ফুটপাতের কিছুটা জায়গা ছাড়া হলেও তিন দিকে তেমন কোনো জায়গা ছাড়ার নজির দেখা যায়নি।
সাইট ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল ইসলাম স্বীকার করেছেন সাইনবোর্ড না টানানো ভুল ছিল। আজ থেকে সাইনবোর্ড টানানো হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) ওই ভবনে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় প্রতিস্থাপনের জন্য ভাড়া নেওয়ার অনুমোদন দেওয়ার আগে ভবনটি পরিদর্শনের জন্য ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ-১-এর কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, মালিকের চাপে পড়ে এতগুলো টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মিত ভবনে বিনিয়োগ করে ঝুঁকি তৈরি করছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। তাছাড়া বর্তমানে অনেক ব্যাংকই নিজস্ব ভবনে প্রধান কার্যালয় প্রতিস্থাপনকে ব্যবসায়িক কৌশল হিসেবে দেখছে। এনসিসি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকসহ এমন অনেকই এখন সুরম্য ভবন তৈরি করে সেখানে প্রধান কার্যালয় করেছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো এককালীন একটি বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনছে। কেননা দীর্ঘমেয়াদে ওই ভবনটি তাদের স্থাবর সম্পদ হিসেবে থেকে যাচ্ছে।
এমন উদ্যোগ না নিয়ে অন্যের ভবন ভাড়া নিয়ে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় বাড়াচ্ছেন কেন? এমন একটি প্রশ্ন ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বর্তমান এমডির ই-মেইলে পাঠানো হলেও তিনি তার কোনো জবাব দেননি।
তবে ব্যাংকটি যে নতুন ভবনে ওঠার জন্য উš§ুখ হয়ে আছে তার প্রমাণ মিলেছে সেনা কল্যাণ ভবনে ডাচ্-বাংলার বর্তমান প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে। অফিসের আসবাবপত্রগুলো মলিন অবস্থায় পড়ে আছে। অভ্যর্থনা কক্ষের টেবিলের ভাঙা পায়া স্কচটেপ দিয়ে জোড়া লাগিয়ে রাখা হয়েছে। অভ্যর্থনা ডেস্কের একাংশ ভেঙে গেছে। টেবিলটির ভেতরে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। কার্পেটগুলোও জানান দিচ্ছে তাদের এখন বিদায় নেওয়ার সময় হয়েছে।
এর আগে কোটি টাকার বৃত্তি প্রদানের একটি উদ্যোগ নিয়েও বিতর্কিত হয়েছিল ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। জানা যায়, এ ব্যাংকটিতে ডাচ্দের বিনিয়োগ থেকে তারা কোনো লভ্যাংশ নিচ্ছে না। ব্যাংকের সিএসআর থেকে প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসি উত্তীর্ণদের নামমাত্র বৃত্তির নামে বিরাট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যদিও তাতে একাধিক মন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হতো।

সর্বশেষ..