মত-বিশ্লেষণ

চোখের সুস্থতায় প্রয়োজন পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার

কামরুদ্দোহা শিরিন: আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ চোখ। তাই চোখের বিশেষ যত্ন একান্ত প্রয়োজন। তবে অনেকেই চোখের দিকে বিশেষ নজর দেন না। দৃষ্টিশক্তি না থাকলে পৃথিবী অন্ধকার। আজকাল আমরা কমবেশি সবাই চোখের সমস্যায় ভুগি। শরীরের অন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো চোখের যত্ন নেওয়াটাও খুব জরুরি। বড়দের পাশাপাশি ছোটদেরও হয় চোখের সমস্যা। অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদেরও দেখা যায় মোটা লেন্সের চশমা পরতে। তবে আমরা যদি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কিছুটা পরিবর্তন আনি, তাহলে চোখের সমস্যা অনেকটাই এড়ানো যায়। এতে আলাদা করে চোখের যত্নের ও প্রয়োজন পড়বে না, আর চোখ এমনিতেই সুস্থ থাকবে।
চোখকে সুস্থ রাখার জন্য চাই পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার। এমন কিছু খাদ্যের নাম উল্লেখ করা যায়, যেগুলোর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সবার জানা উচিত। যেমন গাজর অত্যন্ত স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিকর একটি সবজি। সুস্থ চোখ পেতে হলে যেসব খাবার খাওয়া উচিত তার মধ্যে অন্যতম হলো এ গাজর। এটি কাঁচা বা রান্না দুভাবেই খাওয়া যায়। এতে রয়েছে ভিটামিন ‘এ’ এবং বিটাক্যারোটিন, যা চোখকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। বিটাক্যারোটিন অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এটি ছানি পড়া, বয়সের কারণে চোখের জ্যোতি কমে যাওয়া প্রভৃতি সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করে। তাছাড়া গাজরে রয়েছে ফাইবার ও পটাশিয়াম। এ দুটি উপাদানও কিন্তু শরীরের জন্য ভালো। গাজর ক্যানসার প্রতিরোধক। আর আপনি যদি ওজন কমানোর চিন্তা করে থাকেন তবে গাজর আপনাকে সাহায্য করতে পারে।
নিজেকে সবুজ বা তরুণ রাখার মূলমন্ত্র হলো সবুজ শাকসবজি খাওয়া। কারণ শাকে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আর লুটিন, যা কোনো নীল আলোকরশ্মিকে চোখের রেটিনার ওপর প্রভাব ফেলা থেকে বিরত রাখে। সেইসঙ্গে এটি ম্যাঙ্গানিজের খুব ভালো উৎস। এগুলো চোখের সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে।
ভুট্টায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ ও লাইকোপিন, যা দৃষ্টিশক্তি প্রখর করতে সাহায্য করে। আধা কাপ রান্না ভুট্টায় চোখের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে। তাই নিয়মিত ভুট্টা খেতে পারেন। আর নিয়মিত ভুট্টা খেলে চোখের হলুদ পিগমেন্ট হারানোর কোনো ঝুঁকি থাকে না। এমনকি ছানি পড়ার ঝুঁকিও কমে যায়।
রসালো টমেটোতে রয়েছে লাইকোপিন, যা তীব্র আলোতে কাজ করার সময় চোখকে সুরক্ষা দেবে। এছাড়া এতে রয়েছে আঁশ, খনিজ ও ক্যারোটিন। টমেটো এখন সারা বছরই পাওয়া যায়। টমেটোতে রয়েছে ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘কে’, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ক্রোমিয়ামসহ নানা উপাদান। টমেটো যেমন কাঁচা খাওয়া যায়, তেমনি রান্না করেও খাওয়া যায়। সালাদে টমেটো অতুলনীয়। কমলালেবুতে রয়েছে রাসায়নিক লুটিন এবং ভিটামিন ‘সি’, যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। ভিটামিন ‘সি’ চোখের দৃষ্টি স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে, যা দামেও সস্তা।
মিষ্টিআলু দেখে নাক সিটকানোর দিন এখন শেষ। কারণ মিষ্টিআলু পুষ্টিগুণে ভরপুর। এতে রয়েছে বিটা-ক্যারোটিন, ভিটামিন ‘সি’, ‘ই’ ও ‘ডি’। চোখের যত্ন মিষ্টিআলু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি খাবার। এটি চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। দৃষ্টিশক্তি ধরে রাখতে এর তুলনা হয় না। প্রতিদিন একজন মানুষের যতটুকু পুষ্টি দরকার, তার বেশিরভাগই মেলে মাঝারি আকারের একটি মিষ্টিআলুতে। এতে রয়েছে প্রতিদিনের চাহিদার ২৮ শতাংশ ম্যাঙ্গানিজ ও ৪০ শতাংশ ভিটামিন ‘সি’। আর মিষ্টিআলু শুধু চোখের যত্নই কাজে লাগে না, হাড়ের ক্ষয়রোধেও সাহায্য করে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতেও মিষ্টিআলু বেশ উপকারী।
ডিমের কুসুমের গুণের কথা কম-বেশি সবাই জানি। এতে রয়েছে লুটিন ও যথেষ্ট পরিমাণে জিংক, যা চোখকে ‘মাসকুলার ডিজেনারেশন’ সমস্যা থেকে বাঁচায়। এ সমস্যা সাধারণত ৫০ বছর বয়সের পরে দেখা দেয়। মাছে রয়েছে প্রচুর ওমেগা-৩ ও ফ্যাটি এসিড। তাই দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক রাখতে স্যামন, সার্ডিন, ম্যাকরেল, কড ও টুনামাছ খাওয়া ভালো। আর মাছ, মাংস, দুধ ইত্যাদি খাওয়া শিখতে হবে একেবারে ছোটবেলা থেকেই।
মুরগির মাংসে রয়েছে প্রচুর জিংক ও ভিটামিন ‘বি’, যা চোখের স্বাস্থ্যরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। মুরগির মাংস নানাভাবে খাওয়া যেতে পারে। এমনকি ছোটরাও এই মাংস খেতে পারে ফ্রাই করে। হলুদ, সবুজ ও কমলা রঙের, অর্থাৎ গাজর, কমলা, পেঁপে, ক্যাপসিকাম, ভুট্টা ইত্যাদি বিভিন্ন রঙের ফলমূল ও শাকসবজি, যেগুলোয় ভিটামিন ‘এ’ আছে, এমন খাবার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা উচিত। নিয়মিত এই কাজটি করলে চোখের যত্ন নেওয়া হবে।
অ্যাভোকাডোতে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান, যেমন ভিটামিন ‘সি’, ‘ই’, ‘বি-৬’ এবং বিটাক্যারোটিন দৃষ্টিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। এতে থাকা লুটিন নামক যৌগ চোখে ছানি পড়ার আশঙ্কা থেকে রক্ষা করে, সেইসঙ্গে বেশি বয়সের চোখের রোগ হওয়া প্রতিরোধ করে।
বিভিন্ন ধরনের বাদাম, যেমন কাঠবাদাম, কাজুবাদাম ও চীনাবাদামেও থাকে মাছের মতো ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড। যদিও খুব বেশি পরিমাণে নয়, তবুও তা চোখের রোগ ও শুষ্কতা কমাতে সাহায্য করে। তাই একমুঠো বাদাম খাওয়া যায়। চোখের জন্য ডার্ক চকোলেট বেশ ভালো। বিশেষ করে এতে থাকা ফ্লেভোনয়েড চোখের রক্তনালিগুলোকে রক্ষা করে। শক্তিশালী রক্তনালি মানেই শক্তিশালী কর্নিয়া ও লেন্স। তাই চোখকে ভালো রাখতে ডার্ক চকোলেট খান।
চোখকে ভালোবাসুন। পৃথিবীর সব সৌন্দর্য মানুষের চোখে। যার দৃষ্টিশক্তি নেই, সেই বুঝে পৃথিবীটা না দেখতে পারার ব্যথা। শরীর ঠিক রাখতে আমরা কত কি না করি। অথচ চোখের ভেতরের স্বাস্থ্যের প্রতি সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তবে চোখের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিনযুক্ত খাবার। যথেষ্ট পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার খেলে চোখ থাকবে সুস্থ। এছাড়া প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিন। চোখে পানির ঝাপটা দেওয়ার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো মুখভর্তি পানি নিয়ে নিন। মুখে পানি নেওয়া অবস্থাতেই চোখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিন। কিছুক্ষণের জন্য সবুজ গাছের দিকে তাকিয়ে থাকুন। প্রতিদিন অন্তত আট-দশ গ্লাস পানি পান করুন। নিয়মিত কম করে হলেও আট ঘণ্টা ঘুমান।
দেহের অতিসংবেদনশীল অঙ্গগুলোর মধ্যে চোখ অন্যতম। চোখের যত্নের সচেতন হওয়া প্রয়োজন প্রত্যেকের। যত্নের পাশপাশি যে কোনো সমস্যায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সর্বোপরি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার চোখের যত্নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম।

পিআইডি নিবন্ধ

সর্বশেষ..