চোখ ইরানে: জ্বালানি তেলের দাম কি বাড়বে?

ফরহাদ হোসেন: ইসরাইলের উসকানিতে ওবামা সরকারের সময় ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি বাতিল করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই সম্পাদিত ওই চুক্তিতে সই করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি। চুক্তি অনুযায়ী পরামণু অস্ত্র বানানো, উন্নয়ন কিংবা সংগ্রহ করতে পারবে না ইরান। বিনিময়ে দেশটির ওপর থাকা অবরোধ শিথিল করা হয়। ইসরাইল অভিযোগ করছে চুক্তি মানছে না ইরান। দেশটির (ইসরাইল) হাতে আসা কিছু নথিপত্রও ট্রাম্প প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষ্য, আগের মার্কিন প্রশাসনের মতো সন্ত্রাসবাদকে অবহেলা করা হবে না। তাই চলতি মাসেই বাতিল হতে পারে চুক্তি, বাড়তে পারে অবরোধের কড়াকড়ি।
শেষ পর্যন্ত পরমাণু চুক্তি বাতিল করে যদি ইরানের ওপর অবরোধ কড়াকড়ি হয়, তাহলে জ্বালানি তেলের বাজারে আবারও ঘোড়া ছুটবে। জ্বালানি তেল উত্তোলন ও রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের হিসাবে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ইরান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তেল উত্তোলনকারী দেশ। অন্যদিকে অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) রফতানিতে বিশ্বের চতুর্থ দেশ ইরান। দেশটির ওপর অবরোধ আরোপ করলে তেলের বাজার যে আবারও অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে, সে বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে জ্বালানি তেল নিয়ে গবেষণা করা বৈশ্বিক সংস্থাগুলো।
বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি কমোডিটি প্রাইস ফোরকাস্ট (ভোগ্যপণ্যের মূল্য পূর্বাভাস) প্রতিবেদনে বলছে, চলতি বছর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৫ ডলারের নিচে নামবে না। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত খবরে বিশ্বের ১৪টি বিনিয়োগকারী ব্যাংকের করা এক জরিপে বলা হচ্ছে, চলতি বছর জ্বালানি তেলের চাহিদা ৫০ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা আছে। এতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৪ ডলার থাকবে। গত কয়েক বছর তেলের বাজার নিম্মুনখী ছিল, চাহিদা কমে যাওয়ায় ও উত্তোলন বেশি হওয়ায় ২০১৬ সালে ব্যারেলপ্রতি ৩০ ডলারে নেমে আসে। এতে ক্ষতিতে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ তেলনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো।
পরিস্থিতি উত্তরণে ২০১৬ সালের শেষ দিকে ওপেক সদস্য দেশগুলো তেল উত্তোলন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ওপেকের সঙ্গে একমত হয় রাশিয়াও। গত বছরের শুরুর দিকে উত্তোলন কমানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ঘুরতে শুরু করে তেলের বাজার। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি দাম ৭০ ডলার ছুঁই ছুঁই করছে। এই দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও। বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিলিয়ে দেশের বাজারে দাম সমন্বয় করা হতে পারে। ফেব্রুয়ারিতেই এ বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তেলের বাজারের ঊর্ধ্বগতিতে দাম সমন্বয় (বাড়ানো) করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।
ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের (বিপি) তথ্যমতে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল প্রতিদিন কম-বেশি ১৮ হাজার মেট্রিক টন। এই চাহিদা বেড়ে এখন ২০ হাজার টন ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা যায়। বিপিসি’র ওয়েবসাইটে থেকে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সালে ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত জ্বালানি তেল) আমদানি করেছে এক লাখ ১৬ হাজার ৫৭৬ টনের বেশি। সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান সৌদি অ্যারাবিয়ান অয়েল কোম্পানি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি ছিল এই তেলের জোগানদাতা। অন্যদিকে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের জোগান দেয় কুয়েত, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ওমানসহ কয়েকটি দেশ।
দৃশ্যত মনে হতে পারে বাংলাদেশ যেহেতু ইরান থেকে তেল আমদানি করছে না, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ালে সমস্যা কোথায়? বাস্তবতা হচ্ছে, ইরানের ওপর অবরোধ কড়াকড়ি হলে এর প্রভাব আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও পড়বে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকেও আসছে দিনগুলোতে বেশি দামে জ্বালানি তেল আমদানি করতে হবে। তাই সম্ভাব্য লোকসান ঠেকাতে আগেভাগেই দাম বাড়ানোর আবেদন করে রেখেছে বিপিসি। তবে দাম বাড়ানো কতটা যৌক্তিক ও নৈতিক হবে সেই প্রশ্নটি ঘুরে-ফিরে আসছে। এর উত্তর পেতে হলে আমাদের কিছুটা পিছনে ফিরে যেতে হবে।
২০১২ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম উঠে যায় ব্যারেলপ্রতি ১২০ থেকে ১২৫ ডলার। এতে বিপিসির লোকসানের পাহাড় তৈরি হয়। লোকসান কমাতে ২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারি দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। ২০১৪ সাল থেকে তেলের ঊর্ধ্বগতি কমতে থাকে। ২০১৬ সালে তা নেমে আসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। দাম কমে যাওয়ায় লোকসান কাটিয়ে লাভের মুখ দেখে বিপিসি। আন্তর্জাতিক বাজারে টানা তিন বছর দাম পড়লেও দেশের বাজারে সেই হারে দাম সমন্বয় হয়নি। বিভিন্ন পক্ষের কড়া সমালোচনাতে একরকম বাধ্য হয়েই ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ১০ শতাংশ কমায় সরকার।
এখন আবার বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুতের দামও বাড়বে। এখনও ২০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় জ্বালানি তেল দিয়ে। গত বছরের নভেম্বরেই বিদ্যুতের দাম গড়ে ৫.৩ শতাংশ বাড়ানো হয়। বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে মোট সাতবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। গ্যাস সংকট থাকায় কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র তেলে চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে আসছে গরম মৌসুমে নতুন করে জাতীয় গ্রিডে যে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে তার পুরোটাই তেলে উৎপাদিত হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী। কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখলে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, গুনতে হয় ব্যাংকের সুদ।
এদিকে গ্যাস সংকট নিসরনে আমদানি করা এলএনজির প্রথম চালান বঙ্গোপসাগরে চলে এসেছে। তবে এখনও এই জ্বালানির দাম নির্ধারণ করা হয়নি। দেশে উত্তোলিত প্রাকৃতিক গ্যাসের চেয়ে এলএনজির দাম বেশি হবে এতে সন্দেহ নেই। গ্যাস সংকটের কারণে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যেতে পারছে না, সেগুলোতে বাড়তি দামের এলএনজি ব্যবহার করা হবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও বাড়বে। একদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়া, অন্যদিকে উচ্চমূল্যের এলএনজিÑএই দুটি মিলে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় প্রভাব ফেলবে।
তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার দাম বাড়ানোর ঝুঁকি নেবে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়। জ্বালানির দাম না বাড়ানো হলে সেক্ষেত্রে তেল ও এলএনজিতে দুটোতেই ভর্তুকি দিতে হবে। এতে সরকারের ভর্তুকিজনিত খরচ বেড়ে যাবে। তবে দাম বাড়ানোটাও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, সে প্রশ্ন আগেও তোলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম কম ছিল তখন দেশের বাজারে দাম না কমিয়ে সুবিধা নিয়েছে সরকার। গত অর্থবছরের আগের তিনটি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে তেলের দাম কমার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়েছে।
এখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় দেশের বাজারেও দাম বাড়ানো হলে নৈতিক দিক থেকে সমালোচনার মুখে পড়তে পারে সরকার। তবে নির্বাচন-পরবর্তী নতুন বছরে বিদ্যুৎসহ অন্য জ্বালানির দাম যে বাড়বে তা বলাই যায়। সেক্ষেত্রে নতুন বছরে হয়তো ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরেক দফা বেড়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। সে ধারণা মাথায় রেখেই হয়তো আসছে অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে।

গণমাধ্যম কর্মী

[email protected]