চৌকস বিনিয়োগ

মিজানুর রহমান শেলী: কিছুদিন ধরে আমি কোকা-কোলার ১৮৯৬ সালের প্রতিবেদন পড়ছি। আপনি চিন্তা করতে পারেন, আপনিও আমার এই পাঠ সঙ্গী। অথবা আপনি এর পেছনে অবস্থান করছেন। যাহোক, এটা স্পষ্টত যে ভোক্তা হিসেবে আপনি নিজেও এই প্রতিবেদন পাঠের মধ্যে অবস্থান করছেন। ১৮৯৬ সালের আগের সেসব দিনে কোক ছিল কোমল পানীয়গুলোর মধ্যে সেরা, এমনকি তাদের এই খ্যাতি তারা প্রায় কয়েক দশক অবধি ধরে রেখেছিল।
যাহোক, কোকা-কোলার সেই প্রতিচিন্তা পরবর্তী ১০০ বছর ধরে আজও চলমান রয়েছে। এক লাখ ৪৮ হাজার ডলারে বার্ষিক আয় ১৮৯৬ সালের সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আসা ক্যান্ডলার কোম্পানির প্রেসিডেন্ট সেখানে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের প্রচেষ্টা থেকে পিছিয়ে নেই। আমরা সারা দুনিয়া এই শিক্ষা দিয়ে চলেছি যে, কোকা-কোলা এমন এক খাদ্যবস্তু যা সব অবস্থায়ই শ্রেষ্ঠ। এটা স্বাস্থ্যের জন্য এবং সব ধরনের মানুষের জন্য একটি উত্তম অনুভূতি উদ্রেক করতে সক্ষম হয়।’ যদিও স্বাস্থ্যের বিষয়টি যে কোনো মাত্রায় এখন পৌঁছে গেছে, অর্থাৎ কোক স্বাস্থের জন্য কতটুকু অনুকূল বা প্রতিকূল তা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। সেটা আমার বিষয় নয়। তবে ব্যবসায় নীতি বিচারে আমি কোকের ক্যান্ডলার তত্ত্ব নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করি। ক্যান্ডলারের সেই তত্ত্ব এখনও স্থির রয়েছে। আজ অবধি তা শতক পার হয়ে গিয়েছে, তবুও এই তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে কোক সর্বোচ্চ বাজার অবস্থান ধরে রেখেছে। আমি কোকের এই ব্যবসায় নীতিকেই ভালোবাসি। ক্যান্ডলার বলত, যেভাবে রবার্টো আজকের দিনে করে চলেছে। রবার্টো আজকের দিনে বলছে, ‘এ ধরনের জনস্বার্থমূলক প্রবন্ধ এর আগে কখনও এত দৃঢ়তার সঙ্গে লেখা হয়নি।’ ঘটনাক্রমে এ বছর এটা বিক্রি হয়েছে ১১৬,৪৯২ গ্যালন, অথচ এর আগে ১৯৯৬ সালে তা বিক্রি হয়েছিল তিন দশমিক দুই বিলিয়ন।
ক্যান্ডলারের উদ্ধৃতিগুলো উল্লেখ না করে আমি নিজের মন মানাতে পারি না। তিনি বলেছেন, ‘এই বছরের শুরুর দিকে অর্থাৎ মার্চের প্রথম তারিখে… আমরা ১০ জন ভ্রাম্যমাণ সেলসম্যান নিয়োগ দিয়েছিলাম। এই নিয়োগ প্রক্রিয়া অফিসের ব্যবস্থাতান্ত্রিকতার মধ্যে থেকেই সম্পন্ন করেছিলাম। মজার ব্যাপার হলো, এই দুই সেলসম্যান নিয়োগের মাধ্যমে আমরা প্রায় ইউনিয়নের পুরো অঞ্চলজুড়ে বিপণন সম্পন্ন করতে সক্ষম হই।’ এটাই হলো আমার এক প্রকার বিপণন শক্তি।
কোকা-কোলা এবং জিলেটের মতো কোম্পানিগুলোকে আমার মনে হয় ‘অদম্য’ বলে আখ্যায়িত করা যায়। আগামী দশ কিংবা বারো বছরে এই দুই কোম্পানির কোমল পানীয় বা শেভিং উপকরণের ব্যবসায় তারা কে কীভাবে কী করবে সে বিষয়ে হয়তো সামান্য হলেও যথাযথ পার্থক্য দেখাতে পারবে ভবিষ্যৎ বক্তারা। আমাদের কোনো অপরিহার্য আলোচনাকে ফেলে দেওয়া মানে হলো অপরিহার্য বা প্রাণপূর্ণ কোনো কাজকে খর্ব করা। মনে রাখতে হবে এসব কোম্পানিগুলো অবশ্যই যে কোনো উপায়ে হলেও তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। প্রস্তুত বিপণন, প্যাকেজিং বা পণ্য প্রবর্তনের মতো কাজে তারা কখনোই পিছপা হবে না। সবশেষে আর যাই হোক, কোনো ন্যায়নিষ্ঠ পর্যবেক্ষক না, না এসব কোম্পানির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিযোগী কখনোই কল্পনা করতে পারে যে এসব কোম্পানিগুলো কিছু বিষয় এত সূক্ষ্মভাবে মূল্যায়ন করে। যেমন কোক ও জিলেট তাদের নিজস্ব পণ্য খাতের বিশ্ববাজারে আগামী দিনে বিনিয়োগে আধিপত্য বিস্তার করবে আজীবন। কার্যত, তাদের আধিপত্য দিনে দিনে বাড়তেই থাকবে। উভয় কোম্পানিই গত দশ বছরে উল্লেখযোগ্য হারে তাদের বিপুল পরিমাণ শেয়ার বাড়িয়ে নিয়েছে ইতোমধ্যে। আর তাদের পদচারণার সব ইঙ্গিতেই বোঝা যায় তারা আগামী দশকজুড়ে এই দশকের সম্পন্ন কাজটি পুনরাই সম্পন্ন করবে সফলভাবে।
হ্যাঁ, অবশ্য হাইটেক ব্যবসাকে এখন ভিন্নভাবে দেখতে হবে। এ আলোচনায় হাইটেক খাতের ক্রমবর্ধনশীল পরিস্থিতি এবং সবার ঊর্ধ্বে থেকে নিজেদের অবস্থা বহুদিন টিকিয়ে রাখার কাজটি খুবই সহজ হয়েছে। এর সঙ্গে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে এমব্রিওনিক ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে। এটা ব্যবসার জীবনচক্রের প্রাথমিক ধাপ। আগামী দিনগুলোয় এই হাইটেক ব্যবসা ও অ্যাম্ব্রিয়নিক কারখানা শতকরা হারে কোক ও জিলেটের অদম্য ব্যবসার অদম্য গতি চেয়ে বেশি গতিতে ধেয়ে চলবে। কিন্তু আমি কোনো ভালো কিছুর প্রতি আশাবাদী হওয়ার চেয়েও বেশি আশ্বস্ত হবো কোনো কিছুর ভালো ফল দেখে।
অবশ্যই চার্লি আর আমি মাত্র কয়েকটি ব্যবসাকে অদম্য বলে মানতে রাজি। তবে এই চূড়ান্ত মতামত কেবল তখনই প্রকাশ করব, যখন আমরা আমাদের জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাব। আসলে কোনো ব্যবসার সামান্য কয়েক বছরের অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করে তাকে অদম্য বলা যায় না। কোনো ব্যবসার একক নেতৃত্ব কখনও তাকে অমর বা অদম্য করতে পারে না। এর জ্বলজ্বলে উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। যেমন জেনারেল মোটরস, আইবিএম ওসিয়ারস। এসব কোম্পানির সবগুলোই তাদের ব্যবসায় জীবনের দীর্ঘকাল ধরে অপরাজেয় হিসেবে এগিয়ে চলেছিল। তাদের প্রতিযোগিতায় থামানো বা তাকে পাশ কাটিয়ে উঠে যাওয়ার মতো কেউ যেন ছিলই না। কিন্তু তা হলো না। যদিও কিছু শিল্প-কারখানা বা কিছু ব্যবসায় খাত তাদের ব্যবসায় নেতাদের চরিত্রকে অনতিক্রমনীয় বা অদমনীয় বলে গুণ-বৈশিষ্ট্যে প্রকাশ করে থাকে। নিজেদের এভাবেই এগিয়ে নেওয়ার পথ দেখে থাকে। আর এ প্রবণতার মূল কারণ হলো, তারা মনে করে বিশালতাই হলো টিকে থাকার মূল মন্ত্র। এটাকেই তারা প্রকৃতির নিয়ম বলে মনে করে। আসলে সব ক্ষেত্রে তা নয়। আসলে সবসময় অদম্য পরিভাষাটি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। ব্যবসায় অঙ্গনে আজকের দিনে প্রায় সবাই নিজেদের অদম্য বলে দাবি করছে। সে যাই হোক তাদের মাঝেও কিছু বড় ব্যবসায় কোম্পানি রয়েছে যারা নিজেদের অদম্য বলে দাবি করে কিন্তু অদম্য বলে মূল্যায়িত হওয়ার সব গুণ-যোগ্যতা তাদের নেই। এরকম ডজন ডজন কোম্পানি রয়েছে যারা ভণ্ড। তারা নিজেদের অনেক উচ্চ অবস্থান করিয়ে নিচ্ছে অথচ প্রতিযোগীদের আক্রমণে তারা সহজেই ঘুণে খাওয়া শক্তিশালী লাঠির মতো ভেঙে পড়ে। কোনো কোনো বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে অদম্য বলা চলে এই প্রশ্নে চার্লি ও আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি আমরা কখনোই নিফটি ফিফটির মানে উঠতে পারব না। এমনকি ১/ভিংকিং বা ১ ভেন্টি পর্যায়েও পৌঁছতে পারব না। আমাদের পোর্টফোলিওকে অদম্য করার জন্য তাই আমরা প্রায়ই ‘উচ্চ সম্ভাব্য’কে যুক্ত করেছি।
এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ