ছাতক স্লিপার কারখানা আধুনিকায়নে জটিলতা

ইসমাইল আলী: রেলপথ সংস্কার ও নির্মাণে প্রায় ১০০ কোটি টাকার কংক্রিট স্লিপার কিনে থাকে রেলওয়ে। তবে নিজস্ব সক্ষমতা না থাকায় এর পুরোটাই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। এজন্য ছাতকের স্লিপার কারখানাটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়। এতে আটকে গেছে প্রকল্পটি। সম্প্রতি ফেরত পাঠানো হয়েছে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবনা।

সূত্র জানায়, ছাতক সিøপার কারখানাটি আধুনিকায়নে গত জুনে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করা হয়। এতে বলা হয়, ছাতকের সিøপার কারখানাটি আধুনিকায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সরকারি অর্থায়নে এটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়।

প্রস্তাবটি রেলওয়ের পরিবীক্ষণ কমিটিতে পাঠানো হলে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এতে জানানো হয়, ২৭ বছর আগে ছাতক সিøপার কারখানাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ফলে এর অধিকাংশ যন্ত্রপাতি দুর্বল হয়ে গিয়েছে। নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপনের মাধ্যমে এ প্ল্যান্টটি উন্নত, আধুনিক ও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। এছাড়া ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর করা হবে। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন রুটে ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে মিটার গেজের পরিবর্তে ডুয়েল গেজ ও ব্রড গেজ স্লিপারের প্রয়োজন হবে। এজন্যও কারখানাটি আধুনিকায়ন করা দরকার।

বৈঠকে আরও জানানো হয়, ২৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে প্রণীত প্রকল্পগুলোয় আবশ্যিকভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পাদন করা প্রয়োজন। আর এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এছাড়া প্রস্তাবিত প্রকল্পে স্লিপার প্ল্যান্টটি আধুনিকায়নের পাশাপাশি ব্রড গেজ ও ডুয়েল গেজ স্লিপার তৈরির প্রস্তাবও করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় পৃথক সমীক্ষা প্রয়োজন। এজন্য প্রস্তাবটি ফেরত দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে আগে সমীক্ষার জন্য পৃথক প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রণয়নের আগে সমীক্ষা করা হয়নি। এতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এছাড়া ২৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বের প্রকল্পে সমীক্ষা বাধ্যতামূলক। তাই প্রস্তাবনাটি ফেরত দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে আগে বিশদ সমীক্ষার জন্য প্রকল্প গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ প্রকল্প নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, রেলপথ নির্মাণে ব্যবহৃত কাঠের স্লিপারের স্থায়িত্ব ১০-১২ বছর আর কংক্রিটের ৩০ বছরেরও বেশি। এ কারণে ১৯৮৬ সালে ১২ কোটি ২১ লাখ টাকায় ছাতকে ছয় একর জমির ওপর কংক্রিট স্লিপার কারখানা স্থাপন করে রেলওয়ে। ১৯৮৮ সালের মে মাসে এতে পরীক্ষামূলক এবং অক্টোবরে আনুষ্ঠানিক উৎপাদন শুরু হয়। বছরে ২৪০ কোটি টাকা মূল্যের স্লিপার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে কারখানাটির, যা দিয়ে রেলের সারা বছরের স্লিপারের চাহিদা পূরণ সম্ভব।

রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাটিতে কংক্রিট স্লিপার তৈরির প্রধান কাঁচামাল ইস্পাতের রড ও পাত আমদানি করা হয় ভারত থেকে। এর সঙ্গে ছাতক সিমেন্ট কারখানার স্পেশাল সিমেন্ট এবং ভোলাগঞ্জের পাথর ও বালু ব্যবহার করে তৈরি হতো উচ্চমানের কংক্রিট স্লিপার। ২৭ বছরের মধ্যে কঁাঁচামাল সংকটের কারণে কারখানাটি বহুবার বন্ধ করা হয়েছে। তবে ব্রড গেজ ও ডুয়েল গেজ স্লিপার উৎপাদন সক্ষমতা না থাকায় এবার কারখানাটি স্থায়ী বন্ধের পথে।

বর্তমানে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণে বছরে গড়ে ৬০ কোটি টাকার স্লিপার কেনে রেলওয়ে। এর দুই-তৃতীয়াংশই কংক্রিটের স্লিপার । এছাড়া নতুন প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য প্রতিবছর কেনা হয় ৫০-৬০ কোটি টাকার স্লিপার, যার পুরোটাই কংক্রিটের। এ হিসাবে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার স্লিপার কেনা হয় বেসরকারি খাত থেকে।

এদিকে ২০১৩ সালে বেসরকারি খাতে গড়ে তোলা তমা ও ম্যাক্সের তৈরি কংক্রিট সিøপারের গুণগত মান পরীক্ষার জন্য ছাতকের কারখানায় পাঠানো হয়। পরীক্ষায় সেগুলো তুলনামূলক নিম্নমানের প্রমাণিত হয়। ফলে বিভিন্ন রেলপথে ব্যবহৃত নিম্নমানের এসব স্লিপার কম সময়ে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে সরকার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাতক কারখানার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, বেসরকারি কারখানায় দেশি রড, অখ্যাত কোম্পানির সিমেন্ট, লাল পাথর ও বালু ব্যবহার করা হয়। নিম্নমানের কাঁচামাল দিয়ে তৈরি স্লিপারের গুণগত মানও খারাপ। এগুলো বিক্রি করার জন্য কয়েক বছর ধরেই ছাতকের কংক্রিট স্লিপার কারখানাটি বন্ধের পাঁয়তারা করছে স্বার্থান্বেষী একটি মহল।