মত-বিশ্লেষণ

‘ছেলেধরা’ এবং আমাদের কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: যাচ্ছিলুম সেই পথে। হাঙ্গামা শুনে নেমে এলুম পুকুর-ধারে। আমাকে দেখে উত্তেজিত জনতা আর একবার উত্তেজিত হয়ে উঠল। সবাই সমস্বরে বলতে লাগল, তারা একটা ছেলেধরা ধরেছে। লোকটার অবস্থা দেখে চোখে জল এলো, তার মুখ দিয়ে কথা বেরোবার শক্তি নেই। গাল-পাট্টায়, পাগড়িতে সিঁদুরে-রক্তে মাখামাখি। শুধু হাতজোড় করছে আর কাঁদচে।
জিজ্ঞেসা করলুম, ও কার ছেলে চুরি করেছে? কে নালিশ করচে? তারা বললে, তা কে জানে?
ছেলে কৈ?
তাই বা কে জানে?
তবে এমন করে মারচো কেন?
কে একজন বুদ্ধিমান বললে, ছেলে বোধ হয় ও পাঁকে পুঁতে রেখেচে। রাত্তিরে তুলে নিয়ে যাবে। বলি দিয়ে পুলের তলায় পুঁতবে।
বললুম, মরা ছেলে কখনো বলি দেওয়া যায়?
তারা বলল, মরা হবে কেন, জ্যান্ত ছেলে।
পাঁকে পুঁতে রাখলে ছেলে জ্যান্ত থাকে কখনো?
যুক্তিটা তখন অনেকের কাছেই সমাচীন বোধ হলো। এতক্ষণ উত্তেজনার মুখে সে কথা কেউ ভাববারই সময় পায়নি।
বললুম, ছাড় ওকে। লোকটাকে জিজ্ঞেসা করলুম মিঞা, ব্যাপারটা সত্যি কি বল ত? (গল্প ছেলেধরা)
এটা কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা প্রায় ১২৫ বছর আগের গল্প। সম্প্রতি সারা দেশে ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে পড়ায় আজ কয়েকদিন থেকে এই গল্পটা মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছে। পত্রিকা, টিভি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে আমরা ছেলেধরার খবর পাচ্ছি। খরব রটে গেছে সারা দেশে নাকি ছেলেধরা ঢুকে পড়েছে। নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুতে নাকি বাচ্চাদের মাথা লাগবে। এটা নাকি নদীর ভোগ। জল দেবতা নাকি খুব ক্ষেপে গেছে। ছেলেদের মাথা না পেলে সে সেতু হতে দেবে না। এমন গুজবে সারা দেশে রইরই পড়ে গেছে। ছেলেধরা সন্দেহে ইতোমধ্যে কয়েকজনের মৃত্যু খবর এসেছে। যারা আসলেই কেউ ছেলেধরা নয়। ব্যতিক্রম নেত্রকোনার ঘটনা। সেখানে সত্যি সত্যিই সজীব নামে এক ফুটফুটে বাচ্চা ছেলের মাথা পাওয়া গেছে এক যুবকের ব্যাগে। কিন্তু ঠিক কী কারণে ওই যুবক মাথাটি নিয়ে পালাচ্ছিল তা জানা যায়নি। কারণ এর আগেই আমজনতা ওই যুবককে হত্যা করেছে।
‘পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজে শিশুদের মাথা লাগবে’ এমন গুজবে দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা ভেবে এলাকায় অপরিচিত কাউকে দেখলেই পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। একই ঘটনা ঘটছে ঢাকায়। সম্প্রতি বাড্ডায় এক নারীকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পত্রিকা এবং সামাজিক গণমাধ্যমে আমরা এই অসহায় হতভাগ্য নারীর ছবি দেখেছি। বাঁচার জন্য তার আকুতি ছিল। যতক্ষণ জ্ঞান ছিল ততক্ষণই বারবার একটি কথাই বলছিলেন, ‘আমি ছেলেধরা নই, আমি ছেলে ধরা নই’। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেনি। বরং বেশিরভাগ লোকই হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছেন। শিক্ষকের কক্ষে ঢুকেও জীবনরক্ষা করতে পারেননি অসহায় এ নারী।
পরে জানা গেল ওই নারীর উদ্দেশ্য ছিল তার সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করা। রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তানকে ভর্তি করতে গিয়ে অভিভাবকদের গণপিটুনির শিকার হন রেণু নামে এই নারী। তার চার বছর বয়সী মেয়েকে স্কুলে দিতে সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বাড়ি ফিরেছেন লাশ হয়ে। সন্দেহজনক আচরণের কারণে পিটিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। অথচ তিনিও একজন অভিভাবক। যারা তাকে হত্যা করেছে তাদের মতো রেণুরও স্বপ্ন ছিল দুই সন্তানকে মানুষ করার। তাই বুকভরা আশা নিয়ে স্কুলে এসেছিলেন সন্তানকে ভর্তি করার খোঁজ-খবর নিতে। সঙ্গে তার পরিচয়পত্রও ছিল। কিন্তু কিছুই তাকে রক্ষা করতে পারেনি।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই গণপিটুনির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় পুলিশ। তদন্ত করা হচ্ছে গণপিটুনির ইন্ধনদাতাদের শনাক্তে। পুলিশ হয়তো অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারবে। শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারবে। কিন্তু প্রশাসনের কাছে কিংবা যারা রেণুকে হত্যা করেছে, তাদের কাছে রেণুর দুই সন্তান যদি প্রশ্ন করেÑ‘আমার মাকে ফিরিয়ে দিন কিংবা কী অপরাধ ছিল তার’। এই প্রশ্নের সঠিক জবাব কেউই দিতে পারবেন না।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে সারা দেশে ২১টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন। আহত ২২ জন। পরবর্তী সময়ে গণপিটুনিকে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ উল্লেখ করে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি বার্তা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। যে কোনো মূল্যে এই বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধে কাজ করছে তারা।
প্রশাসন বলছে, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’ বলে একটি গুজব ছড়ানোকে কেন্দ্র করে সম্প্র্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মর্মান্তিকভাবে কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রবিরোধী কাজের শামিল এবং গণপিটুনি দিয়ে মৃত্যু ঘটানো ফৌজদারি অপরাধ।
এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে ছেলেধরা সন্দেহে কাউকে গণপিটুনি দিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি গুজব ছড়ানো এবং গুজবে কান দেওয়া থেকে বিরত থাকতেও বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, কাউকে ছেলেধরা সন্দেহ হলে গণপিটুনি না দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিন।
ছেলেধরা সন্দেহে নওগাঁর মান্দা উপজেলায় ছয় জেলেকে গণপিটুনি দেয় স্থানীয়রা। পরে জানা গেছে তারা ছেলে ধরা নয়। রাজশাহীর তানোরে ছেলেধরা সন্দেহে পৃথক স্থানে দুই যুবককে গণপিটুনি দিয়েছে এলাকাবাসী। ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে এক যুবককে গণপিটুনির পর পুলিশে দিয়েছে স্থানীয় জনতা। একইভাবে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ছেলেধরা এক সন্দেহে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনির পর পুলিশে দিয়েছে এলাকাবাসী। আটক ব্যক্তির দাবি, তিনি ব্যবসায়ী। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে দুই ঘণ্টার ব্যবধানে দুজনকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এতে একজন যুবক নিহত ও আরেক নারী আহত হন। তবে তাদের গণপিটুনির পরও তারা ছেলেধরা কি না, সে বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এছাড়া সাভারের ফল ব্যবসায়ী রাসেল মিয়াকে, পাবনায় এক যুবককে, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। একইভাবে সাভারের তেঁতুলঝোড়া এলাকায় এক শিশুকে বিস্কুট খাওয়ানোর সময় এক নারীকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়।
১৬ জুলাই চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকায় অপরিচিত হওয়ায় তিন ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে আহত ও ১১ জুলাই চাঁদপুরে মনু মিয়া (৪০) নামে একজনকে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দেওয়া হয়। পরে তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, মনু মিয়া মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি। চালচলনে সন্দেহ হওয়ায় তাকে গণপিটুনি দেওয়া হয়।
কেন এমন হচ্ছে? জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, ‘যে কোনো উন্নয়নকে কেন্দ্র করে মানুষের রক্ত লাগে, শিশুদের মাথা লাগে’Ñএ ভ্রান্ত ধারণা মানুষের মনে যুগ যুগ ধরেই চলে আসছে। এগুলো যখন গুজব আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন যে কাউকে দেখলেই সন্দেহ করে সাধারণ মানুষ, তাদের সঙ্গে হিংস্র আচরণ করে। মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বিশ্বাস না থাকাও গণপিটুনির মাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার একটি অন্যতম কারণ।
এ পরিস্থিতি উত্তরণে পুলিশ সদস্যদের সবসময় সতর্ক আচরণ করতে হবে, এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে তৎপর থাকতে হবে। এছাড়া এলাকার নির্বাচিত ও অনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে একটি কমিটি হতে পারে। এলাকায় সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে তাকে ধরে কমিটির কাছে এনে যাচাই-বাছাই করা যেতে পারে। এছাড়া স্কুল ও মসজিদভিত্তিক শিক্ষার দিকে জোর দিতে হবে। শিশুদের জানাতে হবে যাতে তারা অভিভাবককে না বলে কারও সঙ্গে কোথাও না যায়। টিভিতে, বিজ্ঞাপন, লিফলেট বিতরণ ও সমাবেশের মতো সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।
এবার আসি আমাদের কাণ্ডজ্ঞানের বিষয়ে। দেশে সচেতন ব্যক্তি নেইÑএ কথা বললে ভুল হবে। বরং তাদের সংখ্যাই বেশি। তবে কাণ্ডজ্ঞানহীন লোকের সংখ্যাও কম নয়। তাদের হুজুগে বাঙালি বললে সম্ভবত ভুল হবে না। তাদের কাজ হচ্ছে কোনো কিছু যাচাই-বাছাই না করে অন্যের কথা শুনে কাজ করা। অর্থাৎ আন্দাজে ঢিল মারা। এ ধরনের লোকের জন্য আজ রেণু কিংবা রাসেলের মতো নিরীহ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। এসব মানুষ যদি নিজের বুদ্ধি খরচ করতেন, ভালোমন্দ বিচার করতেন তাহলে এতগুলো লোকের প্রাণ দিতে হতো না।
কোনো আইনই হত্যাকে বৈধ ঘোষণা করেনি। কোনো কিছুর বিনিময়ে খুন হতে পারে না। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার জন্য পুলিশ প্রশাসন রয়েছে। তাহলে কেন আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নেব। প্রথম কথা হচ্ছে, সন্দেহের বশে কাউকে হয়রানি করতে নেই। দ্বিতীয়ত, কাউকে যদি খুব বেশি সন্দেহজনক মনে হয় তাহলে পুলিশে খবর দিন। তারা যাচাই করে দেখবে অভিযুক্ত ব্যক্তিটি সত্যি সত্যি অপরাধী কি না।
লেখার শুরুটা ছিল প্রিয় কথাশিল্পী শরৎবাবুর গল্প দিয়ে। এই লেখাটা ১২৫ বছর আগের। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসে ২০০ বছর আগেও ছেলেধরার কথা রয়েছে। সেই সময়ে ছেলেধরা সন্দেহে অনেক মানুষকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। তখন বেশিরভাগ মানুষ অশিক্ষিত ছিল। কুসংস্কারে বিশ্বাস করতেন। ফলে তারা মানুষ হত্যার মতো কাজকে মামুলি মনে করতেন। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তারা যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারতেন।
এখন দিন বদলেছে। আমরা আরও ২০০ বছর এগিয়ে গিয়েছি। এখন ঘরে ঘরে শিক্ষিত লোকের দেখা মেলে। কুসংস্কার অনেক দূরে চলে গেছে। এগিয়ে গিয়েছে চিকিৎসাসেবাই। প্রযুক্তির কারণে আজ আমরা নিমিষের মধ্যে সারা দুনিয়ার খবর নিতে পারি। কিন্তু এত কিছুর পরও আমরা কোথায় যেন আটকে রয়েছি। সেটা না হলে আমাদের কেন বিশ্বাস করতে হবে নদী ভোগ চাচ্ছে, জল দেবতা ফুটফুটে বাচ্চাদের মুণ্ডুর জন্য অপেক্ষা করছে?
তর্কের খাতিরে যদিও ধরে নিই সত্যি সত্যি জলদেবতা আছে। তাহলে সে রাজ্যে সেতু নির্মাণ করতে গেলে আগেই দেবতার আবদার পূরণ করার কথা বলত। নদীর ভোগ কিংবা জলদেবতার গল্প সারা জীবন এভাবেই শুনে এসেছি। অর্থাৎ কাজ শুরুর আগেই জলদেবতা তার দেনা-পাওনা মিটিয়ে নিত। এরই মধ্যে পদ্মা সেতুর পাইলিংয়ের কাজ শেষ। ৩০টি পিলার উঠে গেছে। এত দিন পর হঠাৎ করেই কি জলদেবতার মুণ্ডুর দরকার হলো? যারা জলদেবতা কিংবা নদীর ভোগে বিশ্বাস করেন, তাদের মনে কি এমন প্রশ্নের উদয় হয় না? হলে অবশ্যই তারা বুঝতেন এটা নিছক গুজব যে কোনো কারণেই হোক একটি চক্র এমন গুজব ছড়াচ্ছে।
পরিশেষে একটা কথা বলতেই হয়, সচেতন ব্যক্তি হিসেবে আমাদের উচিত গুজবে কান না দেওয়া। পক্ষান্তরে কোনো ঘটনা ঘটলে তার যাচাই-বাছায় করে দেখা। কাউকে ছেলেধরা কিংবা অন্য কোনো অপরাধী হিসেবে সন্দেহ হলে পুলিশে খবর দেওয়া। আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়া এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। আপনি আইনের প্রতি সম্মান দেখালে অন্যরাও আপনাকে দেখে শিখবে। এমনি করে একদিন হয়তো হারিয়ে যাবে হুজুগে বাঙালি শব্দটি। বন্ধ হবে আমাদের কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড। আর এমন হলে দুর্ঘটনা অনেক কমে যাবে। অকারণে প্রাণ দিতে হবে না রেণু কিংবা রাসেলদের মতো নিরীহ মানুষকে।

গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]

সর্বশেষ..



/* ]]> */