ছোট অপরাধে বড় দণ্ড রেখে সংসদে সড়ক পরিবহন আইন

মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ: নকল বা ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালালে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড। আর সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে দায়ী চালক বা মালিককে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড। আর বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালালে তিন মাসের কারাদণ্ড। এমনই অসামঞ্জ্যপূর্ণ বিধান রেখেই চূড়ান্ত করা হয়েছে সড়ক পরিবহন আইন। এতে ছোট অপরাধে বড় দণ্ড রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ সড়ক দুর্ঘটনার মতো বড় অপরাধে শাস্তির বিধান তুলনামূলক কম।
গত বৃহস্পতিবার আইনটি সংসদে উত্থাপন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আইনটি পর্যালোচনায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। তাদের মতামতের ভিত্তিতে আইনটি পাস করা হবে।
নতুন আইনে বলা আছে, কেউ নকল বা ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি বা ব্যবহার করলে তিনি অনধিক দুই বছর, তবে অন্যূন ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা, তবে অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
যদি কোনো ব্যক্তি ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান ও গণপরিবহন চালনা করেন তাহলে এটি একটি অপরাধ বলে বিবেচ্য হবে এবং এজন্য তিনি অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
অতিরিক্ত ওজন বহন করে মোটরযান চালনা করে অনধিক তিন বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক তিন লাখ টাকার অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে এবং এক্ষেত্রে চালকের দুই পয়েন্ট কাটা হবে।
মহাসড়কের মালিকানাধীন মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী কোনো স্থানে কেউ কোনো স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না। কেউ যদি মহাসড়কে পার্শ্ববর্তী স্থানে কোনো অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করে তিনি অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করলে অনধিক পাঁচ লাখ টাকা আর অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করলে অনধিক ৫০ হাজার টাকার অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
ড্রাইভিং লাইসেন্স হস্তান্তরযোগ্য হবে না। যদি কেউ তা হস্তান্তর করতে যায় তাহলে তিনি অনধিক এক মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
কোনো ব্যক্তি ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত, বাতিল বা প্রত্যাহার করার পরও যদি তিনি মোটরযান চালনা করেন তবে তিনি অনধিক তিন মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
কন্ডাক্টর লাইসেন্স ছাড়া কেউ কোনো গণপরিবহনে কন্ডাক্টরের দায়িত্ব পালন করলে তিনি অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
কোনো ব্যক্তি মোটরযানের লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান চালনা করলে তিনি অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। আর ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করলে কোনো ব্যক্তি অনধিক দুই বছর তবে অন্যূন ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা তবে অন্যূন এক লাখ টাকা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
কেউ বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালালে তিনি অনধিক তিন মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং চালকের এক পয়েন্ট কাটা যাবে।
এদিকে মোটরযানের ফিটনেস ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস সনদ ব্যবহার করে কেউ মোটরযান চালনা করলে তিনি অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
রুট পারমিট ছাড়া মোটরযান চালালে অনধিক তিন মাসের কারাদণ্ড বা ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড। অনির্ধারিত জায়গায় গাড়ি পার্কিং করলে পাঁচ হাজার টাকার অর্থদণ্ড।
এছাড়া দুর্ঘটনাজনিত শাস্তির বিষয়ে বলা আছে, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া ও অবহেলাজনিত গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে এবং সেই দুর্ঘটনায় কেউ আহত বা নিহত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
বিলে শাস্তির বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে, ফৌজদারি কার্যবিধিতে যাহাই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি বেপরোয়া ও অবহেলাজনিত মোটরযান চালানোর কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত হলে বা তার প্রাণহানি ঘটলে ওই ব্যক্তি অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’ বিলে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে কাউকে আহত করলে তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
আর ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য কোনো ব্যক্তিকে অন্তত অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে। আর সহকারীর অন্তত পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে। ট্রাফিক আইন অমান্য করলে পয়েন্ট কাটার ব্যবস্থাও থাকবে আইনে। নির্ধারিত পয়েন্টের নিচে গেলে লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। চালককে নতুন করে আবার লাইসেন্স নিতে হবে। বিলে ব্যক্তিগত গাড়ি চালনার জন্য চালকের বয়স আগের মতোই অন্তত ১৮ বছর রাখা হয়েছে।
বিলের বিধান অনুযায়ী, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না চালক। এই বিধান অমান্য করলে এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হবে। এছাড়া ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। আইনে ১১ ধরনের অপরাধ সংগঠনের ক্ষেত্রে জড়িত কোনো ব্যক্তিকে পোশাকধারী পুলিশকে ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
নতুন আইনের বিধি অমান্য করলে পয়েন্ট কাটার বিধান রাখা হয়েছে বিলে। বিলের বিধান অনুযায়ী লাইসেন্সে থাকবে মোট ১২ পয়েন্ট। বিভিন্ন বিধি অমান্য কাটা যাবে এই পয়েন্ট। পয়েন্ট শূন্য হলে বাতিল হবে চালকের লাইসেন্স। এরপর চালককে নতুন করে লাইসেন্স নিতে হবে।
দুর্ঘটনার ফলে আহত বা নিহত হলে তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য একটি আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠন করা হবে। কর্তৃপক্ষ বিধি ধারা নির্ধারিত হারে ও পদ্ধতিতে মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোটরযানের শ্রেণি বিন্যাস বিবেচনা করে প্রত্যেক মোটরযানের বিপরীতে আর্থিক সহায়তা তহবিলের জন্য বার্ষিক এককালীন চাঁদা আদায় করবে। মালিকরা এই চাঁদা প্রদানে বাধ্য থাকবে। এই তহবিল পরিচালনার জন্য একজন চেয়ারম্যানসহ মোট ১১ সদস্যের একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হবে।