জনতা ব্যাংকের মামলা : ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ আরএসআরএম গ্রুপ

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামভিত্তিক ইস্পাত শিল্প গ্রুপ আরএসআরএম। এ গ্রুপটির একটি প্রতিষ্ঠান মডার্ন স্টিল মিলস লিমিটেডের কাছে ২০০৬ সাল থেকে চলতি বছরের ২০ আগস্ট পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৪০৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। আর এ ঋণের করপোরেট গ্যারান্টার আরএসআরএম গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া গ্রুপটির বেশ কয়েকজন পরিচালক, চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকও এ ঋণের জিম্মাদার।

নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ না করায় সবার বিরুদ্ধে গত ২৯ আগস্ট চট্টগ্রামে জজ অর্থঋণ আদালতে একটি মামলা করে জনতা ব্যাংক। যদিও ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ঋণ পুনর্গঠন সুবিধাসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় আরএসআরএমকে।

মামলার নথি অনুসারে, মডার্ন স্টিলের কাছে জনতা ব্যাংকের আসল ও সুদ মিলে মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ৪০৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এসব পাওনা পরিশোধে বেশ কয়েকবার আরএসআরএম গ্রুপের কর্ণধারদের আইনি নোটিস প্রদান করলেও কোনো ধরনের সাড়া দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি নিয়মানুসারে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হন গ্রুপটির কর্ণধার মাকসুদুর রহমানসহ অন্যান্য করপোরেট গ্যারান্টাররাও। ফলে জনতা ব্যাংক অর্থ আদায়ে চট্টগ্রামে জজ অর্থঋণ আদালতে ২৯ আগস্ট মামলাটি দায় করে।

এতে বিবাদী করা হয় গ্রুপটির অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মডার্ন স্টিল মিলস লিমিটেড, ব্যব¯’াপনা পরিচালক (এমডি) মাকসুদুর রহমান, এমডির ভাই ইউনুস ভূঁইয়া, এমডির দুই ছেলে মিজানুর রহমান ও মারজানুর রহমান, মডার্ন স্টিল মিলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন, পাশাপাশি করপোরেট গ্যারান্টার জেআরএফ জুট স্পিনার্স লিমিটেড, এসএম স্টিল রি-রোলিং মিল লিমিটেড, পুঁজিবাজারে ইস্পাত খাতে তালিকাভুক্ত রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড, রতনপুর শিপ রি-সাইকিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও মোকাবিলা বিবাদী করা হয় সোনালী ব্যাংক লিমিটেডকে।

আরএসআরএম গ্রুপের পরিচালক ও মডার্ন স্টিলের ব্যব¯’াপনা পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বিষয়টি স্বীকার করে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আপনি বিষয়টি নিয়ে আমাদের ঢাকা অফিসের সঙ্গে আলাপ করেন। ওরা ভালো বলতে পারবেন।’ তবে আরএসআরএম স্টিলের ব্যব¯’াপনা পরিচালক মাকসুদুর রহমানের সঙ্গে ফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

রতনপুর গ্রুপ ও ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে চলতি মূলধন জোগানো ও ঋণ পরিশোধে পুঁজিবাজার থেকে ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করে রতনপুর গ্রুপের কোম্পানি আরএসআরএম স্টিলস। এছাড়া রাজনৈতিক অ¯ি’রতার কারণ দেখিয়ে ২০১৫ সালে বড় ব্যবসায়ীদের ঋণ শোধে বিশেষ নীতিমালা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সময় ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণগ্রহীতা ১১ শিল্প গ্রুপ ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম রতনপুর গ্রুপ। ঋণ পুনর্গঠন সুবিধার আওতায় আবেদন করা রতনপুর গ্রুপের মোট ঋণের পরিমাণ ঋণ ছিল ৪৩৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা। সুবিধা পাওয়ার এক বছর পর ঋণ পরিশোধের সময় এলে অনেকের মতো গ্রুপটিও পাওনার কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়। উল্টো পুনর্গঠন করা ঋণে আরও ছাড় চাইছে, নতুন করে আরও ঋণ চাইছে। ফলে বিপাকে পড়ে ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান জনতা ব্যাংক লিমিটেড।

ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালা অনুযায়ী, দুই কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী খেলাপি হয়ে পড়ে গ্রুপটি। আর এসব ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালত আইন অনুসারে মামলা দায় করে গত ২৯ আগস্ট চট্টগ্রামের মহানগরের জজ অর্থঋণ আদালত-১-এ। অন্যদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি আরএসআরএম স্টিল লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ মূলধন ও ঋণ পরিশোধে রাইট শেয়ার ইস্যুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোম্পানিটি ১৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ প্রতি তিন শেয়ারে দুটি করে রাইট শেয়ার (প্রতিটির ইস্যু মূল্য ২৫ টাকা) ইস্যু করবে, যা আগামী ১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কোম্পানিটির এজিএম ও ইজিএম অনুমোদন নেওয়া হবে। এ নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চরম সন্তোষ প্রকাশ করে।

 

নাম প্রকাশে অনি”ছুক জনতা ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘পুনর্গঠনের পর রতনপুর গ্রুপ এক কিস্তির অর্ধেক টাকা দিয়েছে। তারা কিছু দাবি জানিয়েছে, আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছি। গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকবার আইনি নোটিস দেওয়া হলেও গ্রুপটি কোনো সাড়া দেয়নি। ফলে আমরা আইনি ব্যব¯’া নিতে অঞ্চলপ্রধানকে চিঠি দিই। আর সেই নির্দেশনা অনুসারে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।’

 

জনতা ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৬ সূত্রমতে, ইস্পাত শিল্প গ্রুপ আরএসআরএমের কাছে ফান্ডেড লোন ৪০৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ও নন-ফান্ডেড লোন ১৮০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। উভয় ধরনের ঋণ মিলে মোট পাওনা হয় ৫৮৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা জনতা ব্যাংকের গত অর্থবছরের মুনাফার দুই গুণের চেয়েও বেশি। কারণ ২০১৬ সালে জনতা ব্যাংক কর-পরবর্তী মুনাফা করে ছিল ২৬১ কোটি টাকা।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে আরএসআরএম গ্রুপের মডার্ন স্টিল মিলস লিমিটেড ও রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের কাছে সোনালী ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ৪৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ৩৭২ কোটি ১৪ লাখ টাকা।