জন্মদিন: ঋত্বিক ঘটক

(৪ নভেম্বর, ১৯২৫-৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬)
‘আমার সমস্ত বাংলাকে ভালোবাসার মূল হচ্ছে পূর্ব বাংলা। নিজেদের ষোলআনা সুবিধের জন্য জোচ্চুরি দ্বারা যে দেশ ভাগ করা হলো, তার ফলে আমার মতো প্রচুর বাঙালি শেকড় হারিয়েছে। এ দুঃখ ভোলার নয়। আমার শিল্প তারই ভিত্তিতে।’ কথাটি বাংলা চলচ্চিত্রের ধ্রুবতারা ঋত্বিক কুমার ঘটকের। আজ ৪ নভেম্বর তার জš§দিনে শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
দেশভাগ তাকে করে তুলেছিল বিপর্যস্ত। দেশত্যাগী, বাস্তুচ্যুত ও ছিন্নমূল মানুষের কথা তিনি বলেছেন তার সৃষ্টির সব মাধ্যমেই। কবিতা ও গল্প লেখা দিয়ে শুরু হয়েছিল তার শিল্পকর্ম। পরে মঞ্চনাটক, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমায় তা রূপ নেয়। তার তার গল্প, কবিতা, সিনেমা সব মাধ্যমেই রয়েছে দাঙ্গা, মন্বন্তর, বিশ্বযুদ্ধ ও দেশভাগের মর্মপীড়া। ২১ বছর বয়সে দেশভাগের কারণে পূর্ব বাংলা ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় যেতে বাধ্য হন তিনি। তার প্রায় প্রতিটি কাজের মধ্যেই ফুটে ওঠে তার পূর্ব বাংলা ছাড়ার ব্যথা। আমৃত্যু তিনি পূর্ব বাংলার প্রতি তার ভালোবাসার কথা বলেছেন অকপটে।
খ্যাপাটে সৃজনশীল এ মানুষের জš§ও একটি বিখ্যাত পরিবারে, যদিও তার জীবযাপন দেখে তা বোঝার সাধ্য নেই। এ মহান মানুষের জš§ ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশেই। পাবনার ভারেঙ্গা গ্রামে ঋত্বিক ঘটকের মূল বাড়ি। তবে বাবার কর্মসূত্রে তার পরিবার থাকত ঢাকার ঋষিকেশ দাস লেনের বাড়িতে। সেখানেই ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর জš§ হয়েছিল ঋত্বিক ঘটকের। বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক, মা ইন্দুবালা দেবী। ৯ ভাইবোনের মধ্যে ঋত্বিক ও প্রতীতি সবার ছোট। বাবা ঋত্বিককে আদর করে ডাকতেন ‘টেক বাহাদুর’ ও ‘ভবা’। তার স্কুলজীবন শুরু হয় ময়মনসিংহে, এরপর রাজশাহী কলেজ থেকে তিনি আইএ পাস করেন। ১৯৪৮ সালে বহররমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিএ পাস করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এমএ কোর্সে ভর্তি হন। তবে তা তিনি শেষ করেননি।
ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা, গল্প ও কবিতা লেখা, বাঁশি বাজানোÑএসব নিয়েই মেতে থাকতেন তিনি। ১৯৪৩ সালে রাজশাহী গণগ্রন্থাগারে ‘অচলায়তন’ নাটক মঞ্চস্থ করেন। এ সময় তার লেখা গল্প দেশ, অগ্রণী ও শনিবারের চিঠিতে প্রকাশিত হতো। এরপর কলকাতায় পাড়ি দেন তিনি। সেখানে গণনাট্য আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে যান। সেখানেই মঞ্চস্থ হয় দেশভাগ ও উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে লেখা নাটক ‘দলিল’। মূলত গণনাট্য আন্দোলন থেকেই সেলুলয়েড তাকে টানতে শুরু করে।
১৯৫২ সালে নাগরিক সিনেমার কাজ শুরু করলেও সেসময় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কারণে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। সেসময় বিমল রায়ের ‘মধুমতী’ ও ঋষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের ‘মুসাফির’-এর চিত্রনাট্য লিখে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তবে নাগরিকের ক্ষত কোনোভাবেই শুকাচ্ছিল না। এরপর তিনি সুবোধ ঘোষের কাহিনি অবলম্বনে ‘অযান্ত্রিক’ সিনেমা নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেল অযান্ত্রিক সিনেমা।
এরপর তিনি নির্মাণ করলেন শিবরাম চক্রবর্তীর ছোটগল্প অবলম্বনে ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’। এরপর একে একে তৈরি করলেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কমলগান্ধার’ ও ‘সুবর্ণরেখা’। মাত্র ৫১ বছরের জীবদ্দশায় ঋত্বিক ঘটক আটটি সিনেমা নির্মাণ করেন। এছাড়া স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন ১০টি। এসব কাজের মধ্য দিয়েই তিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকারদের একজন হয়ে ওঠেন। সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের কাতারে তাকে তুলনা করা হয়। তবে সত্যজিৎ রায় একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘তখন যদি ওই ছবি (নাগরিক) দেখানো হতো, তাহলে ঋত্বিকের আগে ভারতবর্ষে আর কারও নাম উচ্চারিত হতো না।’
১৯৬৯ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী পুরস্কার দেন এবং ১৯৭৫ সালে ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনিচিত্রের পুরস্কার পান তিনি। যুক্তি তক্কো আর গপ্পো সিনেমার নির্মাণের পর তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।