জন্মদিন: বব ডিলান

 

বব ডিলান কেবল একজন সংগীতশিল্পীই নন, একই সঙ্গে তিনি মুক্তির প্রতীকও। অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অনুপ্রেরণা। ষাট দশকে আমেরিকায় নাগরিক অধিকার রক্ষা আন্দোলনে যে কজনের গান অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, যাদের গান ওই আন্দোলনে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল বব ডিলান (অন্য শিল্পীরা হলেন জন বায়েজ, বব মার্লে, পিট সিগার, হ্যারি বেলফন্টে প্রমুখ) তাদের অন্যতম। ওয়াশিংটন ডিসিতে দুই লাখ লোকের সমাবেশে মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ বক্তৃতার মিছিলে জন বায়েজ ও পিট সিগারের সঙ্গে গান গেয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও সংগ্রামের প্রতীক, পেয়েছিলেন মার্কিন নাগরিক অধিকার রক্ষা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা পুরুষের মর্যাদা।
১৯৪১ সালের ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় জš§ নেওয়া এই শিল্পী নিজেকে মনে করেন স্মোকি মাউন্টের বা মিসিসিপি নদীপাড়ের বনাঞ্চল থেকে ভেসে আসা শুদ্ধ চেতনার মতো একটা কিছু। সংগীতজগতের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উল্লেখযোগ্য সব পুরস্কার তার দখলে। এর মধ্যে ১০টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, একটি গোল্ডেন গ্লোব, একটি অস্কার ও একটি পুলিৎজার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পুলিৎজার পেয়েছেন তার রচিত গানের অসাধারণ কাব্যগুণের জন্য। ২০১৬ সালে একই কারণে পেলেন নোবেল।
পুরস্কার ছাড়াও তার ঝুলিতে নানা সময় জমা পড়েছে আরও বহুবিধ স্বীকৃতি। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৯৯৯ সালে বব ডিলান বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের জরিপে শতাব্দীর ১০০ গুরুত্বপূর্ণ মানুষের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন, ২০০১ সালে বব মার্লি ও জন লেননের সঙ্গে যৌথভাবে বিবিসির অনলাইন জরিপে সর্বকালের সেরা গীতিকার নির্বাচিত হন, বিশ্ববিখ্যাত ম্যাগাজিন রোলিং স্টোন কর্তৃক নির্বাচিত ‘গ্রেটেস্ট আর্টিস্ট অব অল টাইম’-এর তালিকায় বব ডিলান দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। ১৯৯০ সালে ডিলান ফরাসি মিনিস্টার অব কালচার জ্যাস লাংয়ের কমান্ডিয়োর দি আর্টস অ্যাট দ্য লেটারস হিসেবে ভূষিত হন, বিভিন্ন সময় তার বেশ কয়েকটি অ্যালবাম বিক্রির সর্বোচ্চ তালিকায় স্থান পায় এবং ইয়ার অব দ্য অ্যালবামের স্বীকৃতি লাভ করে।
প্রায় ছয় দশক ধরে বব ডিলান বিশ্ব সংগীতজগতে অন্যতম প্রধান পুরুষ হিসেবে গান করছেন। তিনি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছিলেন ষাটের দশকে। সে সময় তার বেশ কিছু গান, যেমনÑ‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’, ‘জন ব্রাউন’, ‘মিস্টার ট্যাম্বরিন ম্যান’ প্রভৃতি নাগরিক অধিকার রক্ষা বা যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের ধর্মসংগীতে পরিণত হয়েছিল। বব ডিলান বিভিন্ন সময় বিভিন্নজনের লেখা ও গান দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এর মধ্যে জ্যাস, যৌনতা ও মাদক অভিজ্ঞতা নিয়ে জ্যাক ক্যারুয়াকের লেখা বই ‘অন দ্য রোড’ (এটি বিট জেনারেশনের বাইবেলে পরিণত হয়েছিল), এলভিস প্রিসলির রক-এন-রোল ও মিসরের গায়িকা ওম কালথুমের প্রেম ও প্রার্থনার গান অন্যতম। বব ডিলান যেমন বিভিন্ন সময় বিভিন্নজন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন, তেমনি তিনি দশকের পর দশক বিভিন্নজনকে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন। তেমনি একজন পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কবীর সুমন। তিনি বব ডিলানের গান দ্বারা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত। সুমন তার এক গানের সংকলনের ভূমিকায় এ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘…১৯৭৩ সালে একবার গানবাজনার কাজে ফ্রান্সে গিয়ে বব ডিলান, জোন বায়েজ, ফিল অকসের গান শোনার সুযোগ হয়। ডিলানের গান আমাকে খুব নাড়া দিল…।’ সুমনের কয়েকটি জনপ্রিয় গান বব ডিলানের গান অবলম্বনে লেখা। এসবের মধ্যে অন্যতম প্রধান ‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’ অবলম্বনে সুমন লিখেছেন তার জনপ্রিয় ‘কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়’ গানটি।
ডিলান শুধু গায়ক নন; একই সঙ্গে তিনি গীতিকার, লেখক, কবি ও চিত্রকর। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বব ডিলান একটি পরিচিত নাম।