জন্মদিন : শর্মিলা ঠাকুর

সত্যজিৎ রায়ের অন্যতম নায়িকা শর্মিলা ঠাকুর। প্রতিভা, সপ্রতিভতা, আধুনিকতা, সৌন্দর্য আর পারিবারিক আভিজাত্যের অনবদ্য সমন্বয়ের নাম শর্মিলা ঠাকুর। একদিকে তিনি বনেদি ঠাকুরবাড়ির মেয়ে শর্মিলা ঠাকুর, অন্যদিকে পতৌদির অভিজাত নবাব পরিবারের বেগম আয়েশা সুলতানা খান। অপুর স্ত্রী ‘অপর্ণা’ ছাড়াও তিনি সত্যজিতের ‘দেবী’তে ‘দয়াময়ী’, ‘সীমাবদ্ধ’তে ‘টুটুল’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’তে তিনি সপ্রতিভ, আধুনিক এবং একই সঙ্গে অত্যন্ত বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন তরুণী ‘অপর্ণা’, ‘নায়ক’-এ মহানায়ক উত্তম কুমারের বিপরীতে ‘অদিতি’; নায়ক অরিন্দম মুখার্জির ভাষায় মিস আধুনিকা। হ্যাঁ, যথার্থই তিনি আধুনিকা; যেমন ‘নায়ক’-এর পর্দায়, তেমনি বাস্তব জীবনে। এ হলো শর্মিলা ঠাকুরের সত্যজিৎ রায় পর্ব। এসবের বাইরেও তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। শর্মিলা ঠাকুর চলচ্চিত্র জগতে বিকল্প ও বাণিজ্যিক ধারা এবং বাংলা ও হিন্দিতে সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তিনি অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। যে ছবিটির (অপুর সংসার) মাধ্যমে অভিনয়ে শর্মিলা ঠাকুরের হাতেখড়ি, তেমন একটি ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ অনেক শিল্পী সারা জীবন অপেক্ষা করেও পান না। দ্বিতীয় ছবি ‘দেবী’। এরপর যান মুম্বাই। উপহার দেন একের পর এক সুপারহিট ছবি। আবার কলকাতায়। দুই জায়গায় দু’রকম ছবিতেই সাফল্য পেতে থাকেন। তার ভাষায়Ñ‘কলকাতায় মানিকদার (সত্যজিৎ রায়) সঙ্গে ছবি করেছি। আবার মুম্বাইতে শক্তি সামন্ত, গুলজার, বাসুদার সঙ্গে সুন্দর সব ছবি করেছি। ফের কলকাতা, মানিকদা। আবার ওখানে নাচছি-গাইছি। সুইমস্যুট পরে ওয়াটারস্কি করেছি। আবার এখানে ‘নায়ক’, ‘সীমাবদ্ধ’র মতো ছবিও করেছি। এখন ভাবলে সত্যি অবাক লাগে।’

তার শুরুর গল্পটাও খানিকটা অবাক করা। জেনে নেওয়া যাক তারই ভাষায়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘…কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন ১৩ বছরের একজন মেয়ের জন্য, যাকে অপুর স্ত্রী অপর্ণার চরিত্রে মানাবে। হঠাৎ বাড়িতে একটা ফোন এলো। বাবার সঙ্গে কথা বললেন মানিকদা। তখন তিনি রীতিমতো বিখ্যাত। ‘পথের পাঁচালী’র দৌলতে মানিকদার নাম তখন ঘরে ঘরে। ‘জলসাঘর’ ও ‘অপরাজিত’ও রিলিজ করে গেছে। সত্যজিৎ রায় তখন হাউজহোল্ড নেম। বাবা একটা কথাই বলেছিলেন মানিকদাকেÑযদি মনে করেন ও এই রোলটা ঠিকমতো করতে পারছে, তবেই ওকে নেবেন। ওরা কীভাবে আমাকে ডিসকভার করলেন জানি না।’

হ্যাঁ, এ ‘ডিসকভারের’ পর শর্মিলা ঠাকুর কেবল এগিয়ে গেছেন। তার সফলতার গল্প সেই পুরোনো কথাটাই মনে করিয়ে দেয়Ñএলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। এ ব্যাপারে শর্মিলা ঠাকুরের প্রাসঙ্গিক মন্তব্যটা এরকমÑ‘আমি কোনোদিনই বিশেষভাবে কিছু চাইনি। আমার কোনো চাহিদা ছিল না। সবকিছু নিজে থেকেই এসেছে। আমার তার জন্য দৌড়াতে হয়নি। কিছু না পেলে দুঃখ পাইনি। আবার কিছু পেলেও আনন্দে আটখানা হইনি। আসলে আমার জীবনে কোনোকিছু প্ল্যান করে হয়নি। হয়ে গেছে বলা যেতে পারে। এ বয়সে এসে মাঝেমধ্যে মনে হয়, কীভাবে কেটে গেল জীবনটা! অনেকটা রোলিং স্টোনের মতো। নিজের ছন্দেই গড়িয়ে গেল যেন!’

শর্মিলা ঠাকুর একজন সফল মানুষ। প্রেম, বিয়ে, দাম্পত্য, পরিবারÑসবখানে তিনি সফল। একদিকে বনেদি ঠাকুরবাড়ি, অন্যদিকে অভিজাত নবাববাড়ি। বনেদিপনা আর আভিজাত্যের মধ্যেও তিনি অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে শর্মিলা ঠাকুর বলেন, ‘আমি আমার মতো করে লাইফটা কাটিয়েছি। যেটা আমার মনে চেয়েছে করেছি। টাইগারের (স্বামী মনসুর আলী খান পতৌদি) সঙ্গে যখন আমার পরিচয়, তখন ওর বয়স ২৩, আমার ২০। ও তখন সাসেক্স কাউন্টি ক্যাপ্টেন, আর আমি মুম্বাইয়ে চুটিয়ে ছবি করছি। বিয়ে করি ১৯৬৯ সালে। ও হায়দরাবাদে খেলতে গিয়েছিল। আমরা বিয়ে করব বলে ঠিক করি, বন্ধুবান্ধব ও পরিচিত মহলে একটা অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছিল। সবাই ধরে নিয়েছিল, এ বিয়ে টিকবে না। দুই পরিবারেও খানিকটা অশান্তি হয়েছিল। আসলে দুই পরিবারই খুব বনেদি, কিছু নিয়মকানুন তো থাকবেই। তাছাড়া কারও পরিবারের কোনো সদস্যই এর আগে ধর্মের বাইরে বিয়ে করেনি। বাবা আপত্তি তোলেননি। সমস্যাটা হয়েছিল ঠাকুরমাকে নিয়ে। আস্তে আস্তে অবশ্য সবাই মেনে নিলেন। মা-বাবার একটা বড় ভূমিকা ছিল। সে সময় আমাদের বিয়েটা মানুষের কাছে রূপকথার মতো ছিল। আমি হিন্দু, প্যাট মুসলিম; আমি ফিল্মস্টার ও নবাব; সব মিলিয়ে অন্যরকম। তাই আশঙ্কা ছিল বেশি। আমি অত কিছু ভাবিনি। মানুষটাকে ভালোবেসেছিলাম, একসঙ্গে থাকতে চেয়েছিলাম, তাই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’

শর্মিলা ঠাকুর চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবেও সফল। ‘মন’, ‘ধাড়কান’, ‘শুভ মহরত’ ইত্যাদি অনেক ছবিতে পার্শ্ব-চরিত্রে তিনি অভিনয় করেন। ২০০৩ সালে গৌতম ঘোষ পরিচালিত ‘আবার অরণ্যে’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পার্শ্ব-চরিত্রে সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। ছবিটি ছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র সিকুয়াল।

শর্মিলা ঠাকুর ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদ্মভূষণ লাভ করেন। তিনি ভারতের চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি বোর্ডের সদস্যও ছিলেন। ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০১১ সালে স্বামী মনসুর আলি খান পতৌদির মৃত্যুর পর তার স্মৃতি রক্ষার্থে সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কাজ করছেন।