জমি ভাড়া নিয়ে রানার গ্রুপের আবাসন প্রকল্প

পলাশ শরিফ: অভিনব কায়দায় আবাসন ব্যবসায় নেমেছে রানার গ্রুপ। জমি ভাড়া নিয়ে জোরেশোরে আবাসন ব্যবসায় নেমেছে গ্রুপটি। কৌশলী রানার গ্রুপ প্রকল্প অফিসের জমিটিও ভাড়া নিয়ে কাজ চালাচ্ছে। আর এ নিয়ে শুরুতেই বিতর্কের মুখে রানার গ্রুপের কাগুজে ‘আরিয়ান সিটি’। ‘স্লোগান-বিজ্ঞাপনে’ বেশ চটকদার হলেও বাস্তবে এখনও সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রকল্পটি।

তথ্যানুসন্ধানে মিলেছে, রাজধানীর অদূরে সাভার উপজেলার বনগাঁও উপজেলায় প্রায় ২৭২ একর জমির ওপর ‘আরিয়ান সিটি’ নামে আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ার ঘোষণা দিয়েছে রানার গ্রুপ। রানার ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড নামের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে এ প্রকল্পের পাঁচটি ব্লকে প্রায় দুই হাজার ২৩৭টি আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্লট গড়তে চায় কোম্পানিটি। এরই মধ্যে প্রকল্পের প্রচারণা বেশ জোরেশোরেই চালাচ্ছে রানার গ্রুপ। এজন্য বাহারি-চটকদার বিজ্ঞাপনও দেওয়া হচ্ছে।

তবে রানারের ‘আপনার স্বপ্নের নিরাপদ আবাসস্থল’ শিরোনামের ‘আরিয়ান সিটি’ প্রকল্পের বাস্তবতা অনুসন্ধানে ভিন্ন তথ্য মিলেছে। সাভারের বনগাঁও ইউনিয়নের গান্ধারিয়াসহ পার্শ্ববর্তী মৌজায় মাত্র ১০-১১ একর নিচু জমি কিনেছে রানার ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। সেই সঙ্গে সাবেক স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য মোক্তার হোসেনের জমি-অফিস ভাড়া নিয়েছে কোম্পানিটি। অফিসের পাশে অন্যের ফসলি জমিতে আরিয়ান সিটির সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনকালে আবাদি জমি, সাইনবোর্ড ছাড়া প্রকল্পের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

গান্ধারিয়া মৌজায় রানার আরিয়ান সিটির অফিসের ডানদিক লাগোয়া জমির মালিক রুস্তম আলী। তিনি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া প্রায় সাড়ে ২৫ শতক জমিতে শীতকালীন সবজি চাষ করেছেন। ওই জমির এক কোনায় আরিয়ান সিটির সাইনবোর্ড টানানো। জমিতে সাইনবোর্ড সম্পর্কে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘এই জমি আমার। পৈতৃক সূত্রে পেয়েছি। এখানে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করি। জমি বিক্রি করিনি। বিক্রি করার কোনো পরিকল্পনাও নেই। তবে পরিচিত একজনের অনুরোধে সাইনবোর্ড লাগিয়েছি। তাছাড়া আরও অনেক ব্যক্তি মালিকানার জমিতে সাইনবোর্ড আছে। কিন্তু তারা যে এই প্লট নিজেদের প্রকল্পের অংশ বলে দেখাচ্ছে সেটা জানি না। আমি সাইনবোর্ড তুলে ফেলব।’

অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। অন্যের জমিতে সাইনবোর্ডই নয়, খোদ প্রকল্পের অফিস বলে যে স্থানটি ব্যবহার করা হচ্ছে সেটিও ভাড়া নেওয়া। জমিটির মালিক বনগাঁও ইউনিয়নের সাবেক সদস্য মোক্তার হোসেন। তিনি জমি ও অফিস মাসিক ১০ হাজার টাকায় রানার গ্রুপকে ভাড়া দিয়েছেন।

আলাপকালে মোক্তার হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অফিসের জায়গা ও ঘর আমার। আমি রানারকে ভাড়া দিয়েছি। আমিও তাদের সঙ্গে জড়িত। যে কারণে ১০ হাজার টাকা ভাড়া নিই। এর আগেও অন্য আবাসন কোম্পানির কাছে ভাড়া দিয়েছিলাম। এরা নতুন এসেছে। তারা একপাশে কয়েক একর জমি কিনেছে। মনে হচ্ছে তারা বড় প্রকল্প করবে, সে জন্য দিয়েছি। আশপাশের জমি কোম্পানি কিনেছে কি নাÑসেটা আমি বলতে পারব না। কার জমিতে কীভাবে সাইনবোর্ড দিয়েছে আমি জানি না। হেড অফিসের লোকজন ভালো বলতে পারবেন।’

আলাপকালে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এর আগে একই এলাকায় জমি ভাড়া নিয়ে সাইনবোর্ড লাগিয়ে ওশান গ্রুপসহ বেশকিছু আবাসন কোম্পানি মানুষকে ঠকিয়েছে। একই জায়গায় রানার গ্রুপ এসেছে। তারা কিছু নিচু জমি কিনে বড় প্রকল্পের কথা বলছে। আর ওশান গ্রুপের গান্ধারিয়া সিটির কিছু জমি কেনার চেষ্টা করছে। তবে অফিসের আশপাশে প্রায় ১৫-২০ একর এলাকজুড়ে যেসব জমিতে সাইনবোর্ড লাগিয়েছে তার অধিকাংশই ব্যক্তি মালিকানা। কেউ ভাড়া দিয়েছেন। কেউবা না জেনেই সাইনবোর্ড বসাতে দিয়েছেন। এভাবে মানুষের সঙ্গে আবারও প্রতারণা হচ্ছে কি নাÑসেটা বলা কঠিন। কারণ এখানে স্থানীয় কিছু লোকজন রানারকে সাহায্য করছে। তাই কেউ কিছু জানে না।

আলাপকালে বনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘রানার গ্রুপ এখানে বেশকিছু ফসলি জমিতে সাইনবোর্ড লাগিয়েছে বলে লোকমুখে জেনেছি। প্লট কিনতে বিভিন্ন এলাকার লোকজনও আসছে। তবে রানার গ্রুপ কীভাবে কী করছে কিছুই জানি না। এ বিষয়ে জানতে নোটিস পাঠিয়েছি। কিন্তু তারা পাত্তা দেয়নি।’

আরিয়ান সিটির প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা কতটুকু জমি কিনেছি না কিনেছি সেটা কনফিডেন্সিয়াল বিষয়। এটা বলা যাবে না। আর আমরা কার জমিতে সাইনবোর্ড দিলাম না দিলাম, জমির মালিক আমরা কি না এ নিয়ে আপনাদের মাথাব্যথা কেন? আপনার জমি আছে সেখানে? না থাকলে এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না।’