মত-বিশ্লেষণ

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি

মাহমুদুল হক আনসারী: পৃথিবীতে জলবায়ুর অব্যাহত পরিবর্তনে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ছে। কার্বন নির্গমনে লাগাম টেনে ধরতে না পারলে ধারণার চেয়ে ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। এ পরিণতিতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় একটি উপকূলীয় অঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা পরিবেশ বিজ্ঞানীদের। ২১০০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বড় একটি অংশ সাগরে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। হুমকিতে পড়বে নিউইয়র্ক ও লন্ডনের মতো বড় শহরের নাগরিক জীবনও। গবেষণায় বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যে পরিমাণ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, তা বাস্তবতার চেয়ে অনেক কম। কারণ হিসেবে গবেষকরা বলছেন, প্রচলিত হিসেবে গ্রিনল্যান্ড, অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলার বিষয়টি এক রকম উপেক্ষা করা হয়েছে। বাস্তবে বরফ গলার হিসাবের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার নাম যোগ করলে বিশ্বের পরিণতি আরও ভয়ঙ্কর রূপে আবির্ভূত হবে।
২০১৩ সালে একটি ধারণাপত্র প্রকাশ করে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ইন্টারগভার্নমেন্টাল প্যানেল (আইপিসিসি)। রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বর্তমান হারে কার্বন নির্গমন অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক উচ্চতা ২১০০ সাল নাগাদ দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। আর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে ৫২ থেকে ৫৮ সেন্টিমিটার। কিন্তু প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত এ গবেষণার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ চিত্র। গবেষকরা বলছেন, বর্তমান হারে কার্বন নির্গমন ঘটতে থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে পারে ৬২ থেকে ২৩৮ সেন্টিমিটার।
গবেষকরা বলছেন, ২১০০ সাল নাগাদ তাপমাত্রা যদি দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না বাড়ে, তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে শুধু গ্রিনল্যান্ডই প্রভাব ফেলবে। কিন্তু দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি বাড়লেই অ্যান্টার্কটিকার বরফও ব্যাপক হারে গলতে শুরু করবে। গবেষক দলের সদস্য অধ্যাপক জনাথন ব্যাম্বার বলেন, এটি শুধু একটি অনুমান নয়। পূর্ব ও পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলার বাস্তবিক আশঙ্কা রয়েছে।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ার মানে হলো পৃথিবীর জন্য খুব খারাপ সময় অপেক্ষা করছে। কার্বন নির্গমন না কমলে বিশ্বের প্রায় ১৮ লাখ বর্গকিলোমিটার স্থলভূমি সমুদ্রে তলিয়ে যাবে, যা লিবিয়ার আয়তনের সমান। গবেষকরা আরও বলছেন, এসব জমির বেশিরভাগই আবাদি। বিশেষ করে, বাংলাদেশের বড় একটি অংশ এ ক্ষতির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা কঠিন হয়ে পড়বে। এ হুমকিতে পড়বে লন্ডন, নিউইয়র্ক ও সাংহাইয়ের মতো শহরের জনজীবনও। বিজ্ঞানীরা আরও বলেন, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের কারণে ইউরোপে ১০ লাখের অধিক শরণার্থী প্রবেশ করেছে। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দুই মিটার বেড়ে গেলে বিশ্বকে এর চেয়ে ২০০ গুণ বেশি শরণার্থীর মোকাবিলা করতে হবে।
আগামী কয়েক দশকে কার্বন নির্গমন কমাতে পারলে এ পরিণতি থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যেতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা জানান। তারা আরও আশঙ্কা করছেন, প্রতিবেদনটি সত্য হওয়ার পাঁচ শতাংশ ঝুঁকি রয়েছে। তারা বলছেন, গবেষণায় আশঙ্কার কথা যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তা বাস্তবিকভাবেই হুমকি হিসেবে বিশ্বকে গ্রহণ করা উচিত।
পৃথিবীর মানুষ যেখানে ঝুঁকি থাকে, সেখান থেকে সাবধানে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। প্রতিবেদনটি বাস্তবে পৃথিবীর মানুষের জন্য একটি সতর্কতা। এ সতর্কতাকে আশঙ্কা হিসেবে গ্রহণ করে পৃথিবী সাবধানে পরিচালিত হলে নিরাপদ হবে। আর যদি এভাবে বৈশ্বিক উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে পৃথিবীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল এলাকা তলিয়ে যাবে। এ আশঙ্কা থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বের পরিবেশবাদী নেতাদের পরিবেশ রক্ষায় সঠিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বনেতাদের জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব নিয়ন্ত্রণের সঠিক ও বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
বৈষয়িক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পাশে সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে। বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ। তার সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীর বিরাট চাপ বাংলাদেশকে সইতে হচ্ছে। পাহাড় ও উপকূলীয় এলাকাজুড়ে তাদের বসবাস। উদ্বাস্তু হিসেবে বাংলাদেশে তারা আশ্রয় পেলেও তাদের নিজ ভূমি মিয়ানমারে ফেরত নিয়ে যাওয়ার বাস্তব প্রস্তুতি দেখছি না। এসব উদ্বাস্তু ও বাংলাদেশের উপকূলে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষের জীবনের আশঙ্কা কোনো অবস্থায়ই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশ সরকারকে জলবায়ু পরিবর্তনের আশঙ্কায় এদেশের ব্যাপক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হবে। যাদের কারণে বাংলাদেশের মতো ছোট ছোট দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে, এখন থেকেই আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠনের শরণাপন্ন হতে হবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও নিজস্ব পরিবেশ রক্ষায় সঠিকভাবে কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। পরিবেশবিরোধী কোনো ধরনের কর্মকাণ্ড প্রশ্রয় ও সুযোগ দেওয়া যাবে না। উপকূলীয় জনগণকে সুরক্ষা দিতে স্থানীয় বেড়িবাঁধ রক্ষা ও সংস্কার করতে হবে।
বৈষয়িক জলবায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশে বছরে কয়েক দফা ঝড়, সাইক্লোনের আশঙ্কা ও হুমকি প্রতিনিয়ত জনগণ মোকাবিলা করছে। সুতরাং ওই প্রতিবেদন বাংলাদেশের বিশাল একটি অংশের জন্য অবশ্যই হুমকি। এটিকে কোনো অবস্থাতেই ছোট করে না দেখে দেশ ও জনগণকে নিরাপদে রাখার সঠিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

ফ্রিল্যান্স লেখক
[email protected]

 

সর্বশেষ..