জলবায়ু বিষয়ে এডিবির প্রতিবেদন: ঝুঁকিপূর্ণ দেশের শীর্ষে বাংলাদেশ

জাকারিয়া পলাশ: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ঝুঁকি বাড়ছে ক্রমাগত। এ অঞ্চলের মানবস্বাস্থ্যের ওপর এর ঝুঁকি বিগত বছরগুলোর উন্নয়নকে পিছিয়ে দেবে। আর বিভিন্ন হিসাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকার শীর্ষস্থানে থাকবে বাংলাদেশ। নানা প্রতিষেধক ও প্রতিরোধক আবিষ্কারের পরও ২০৩০ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ অঞ্চলে নানা রকম রোগের প্রাদুর্ভাব থাকবে। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগের হার বাড়বে আশঙ্কাজনক হারে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ আগাম পূর্বাভাস ও আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি পর্যালোচনা করে ‘রিজিয়ন অ্যাট রিস্ক: এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের মানবিক দিকসমূহ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করে এডিবি। পটসড্যাম ইনস্টিটিউট অব ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চ (পিআইকে) নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে এ গবেষণা করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৩০ সালে ডায়রিয়ায় প্রায় চার হাজার লোকের মৃত্যু হতে পারে বাংলাদেশে। ২০৫০ সালে এ সংখ্যা সাত হাজার অতিক্রম করবে। আর ২০৯০ সালে তা বেড়ে হতে পারে প্রায় ২২ হাজার। বিশুদ্ধ পানি না থাকায় এ সংকটে পড়বে বাংলাদেশ। ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী ভারতের চেয়ে আড়াইগুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশ। এছাড়া ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।

প্রতিবেদনে পুরো অঞ্চলটির অবস্থা তুলে ধরে বলা হয়, এ অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান হারে কার্বনডাইঅক্সাইডসহ গ্রিনহাউজ গ্যাস (জিএইচজি) নিঃসরণ বেড়ে যাচ্ছে, যদিও এ অঞ্চলের সুযোগ রয়েছে শিল্পোন্নয়নের ব্যবস্থা দ্রুত সংস্কার করে জিএইচজি নিঃসরণ কমানোর। এখানে বায়ু এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় দ্রুত কমে যাচ্ছে। ফলে নবায়নযোগ্য উৎসের জ্বালানির দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যদিও তা কবে হবে স্পষ্ট নয়।

এ অঞ্চলে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও মানব উন্নয়নের সূচকে অগ্রগতির ফলে বেশ কিছু প্রচলিত ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে এই উন্নয়নের কারণেই। উপকূলীয় এলাকাগুলো থেকে লোকেরা শহরের দিকে ছুটছে। আর ক্রমান্বয়ে দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহায়তা বাড়লেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃহত্তর ও অভিন্ন বাজারগুলোর সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হওয়ার উপক্রম হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জলবায়ু অভিযোজন ও অর্থায়ন বিশ্লেষক এম জাকির হোসাইন খান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘জনস্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের এ প্রভাবগুলো নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন। এজন্য সাময়িক (অ্যাডহক) কোনো উদ্যোগ না নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনগণ ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের সম্পৃক্তি বাড়াতে সচেতনতা বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরো অঞ্চল নিয়ে এ গবেষণাটি হয়েছে। এখন দেশের নিজস্ব পর্যায়ে বিস্তারিত গবেষণা দরকার। এর মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক ঝুঁকি নিরূপণ করে সে অনুযায়ী সুনির্দিষ্টভাবে অর্থায়নের জন্য দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা জোরদার করতে হবে। দেশের কোন এলাকা কী পরিমাণ ঝুঁকিতে পড়বে, তা নির্দিষ্ট না করলে দাতাদের সঙ্গে আলোচনা করা সহজ হবে না।’

এডিবির গবেষণা বলছে, ক্লাইমেট চেঞ্জ অপারেশনাল ফ্রেমওয়ার্ক ২০১৭-২০৩০ গ্রহণের পর থেকে ওই ফ্রেমওয়ার্কের ঘোষণা অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে পরিবর্তনের প্রভাব মানিয়ে নেওয়ার জন্য দুই বিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা। সেই ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য এডিবি উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি বিশেষ আন্তরিক রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে এ দেশগুলোর বাস্তব অবস্থা নিয়ে গবেষণাটি করা হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনের মানবস্বাস্থ্য অংশে বলা হয়, ২০১৫ নাগাদ এ অঞ্চল মানবস্বাস্থ্যে বেশ উন্নয়ন ঘটিয়েছিল, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এখন এই উন্নয়নকে বিপরীত দিকে ধাবিত করার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বরাতে গবেষণাটি বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন শিশুদের প্রবৃদ্ধি ব্যাহত করতে ও ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়াতে পারে। গরমে বৃদ্ধদের মৃত্যু ও সাধারণের জন্য ম্যালেরিয়া-ডেঙ্গুর মতো জীবাণুবাহী রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়তে পারে। হিসাব বলছে, ১৯৬১-৯১ সময়ের চেয়ে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ২০৩০ সালে এক দশমিক এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। আর ২০৫০-এর মধ্যে তা এক দশমিক সাত ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এই তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে পানির প্রাপ্যতা হ্রাস পাবে। তাছাড়া শিশুদের পানিবাহিত রোগ ও সুষম বৃদ্ধি না হওয়া (স্টান্টিং) বেড়ে যাবে। কারণ নিচু এলাকাগুলোতেই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ফসলহানি ঘটার আশঙ্কা আছে, যা এলাকাজুড়ে অপুষ্টি বাড়াবে। এডিবির ২০১৪ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ২০৩০ সাল নাগাদ বার্ষিক ৪০ লাখেরও বেশি মানুষের ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা আছে। এর মধ্যে প্রাণহানি হতে পারে চার হাজারের। ২০৫০ সালে এই সংখ্যা ৬০ লাখের কাছাকাছি হতে পারে।

এছাড়া ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো জীবাণুবাহী রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ার ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে। ২০৩০ সালে বার্ষিক পাঁচ হাজার লোক ডেঙ্গু এবং এক লাখ ৪৭ হাজার লোক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। আর ২০৫০ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা নয় হাজার এবং ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া এসব রোগে ২০৫০ নাগাদ বার্ষিক প্রায় দেড় হাজার লোকের মৃত্যু ঘটতে পারে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বৈশ্বিক ও জাতীয় উদ্যোগে অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশ ছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিপুল জনসংখ্যার কারণে বাংলাদেশ ও ভারতেই ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা বেশি হবে বলে আশঙ্কা করা হয় প্রতিবেদনে।