জাকাত ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ

হাফেজ মাওলানা নাসির উদ্দিন: ১. নিসাব পরিমাণ পণ্যের মালিক হওয়া। অর্থাৎ সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ তোলা রুপা, কিংবা সমপরিমাণ মূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসার পণ্যের মালিক হওয়া। ২. মুসলমান হওয়া। কাফেরের ওপর জাকাত ফরজ নয়। ৩. বালেগ হওয়া। নাবালেগের ওপর জাকাত ফরজ নয়। ৪. জ্ঞানী ও বিবেকসম্পন্ন হওয়া। সর্বদা যে পাগল থাকে, তার নিসাব পরিমাণ পণ্য থাকলেও তার ওপর জাকাত ফরজ নয়। ৫. স্বাধীন বা মুক্ত হওয়া। দাস-দাসীর ওপর জাকাত ফরজ নয়। ৬. পণ্যেরং ওপর পূর্ণ মালিকানা থাকা। অসম্পূর্ণ মালিকানার ওপর জাকাত ফরজ হয় না। ৭. নিসাব পরিমাণ পণ্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সম্পদের অতিরিক্ত হওয়া। ৮. নিসাব পরিমাণ পণ্যের ওপর এক বছর অতিবাহিত হওয়া। ৯. পণ্য বর্ধনশীল হওয়া।
জাকাত না দেওয়ার পরিণতি
আল্লাহতায়ালা বান্দাকে হুশিয়ার করার জন্য ইরশাদ করেন, ‘আর যারা স্বর্ণ, রুপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের আপনি (রাসুল সা.) যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দান করুন! সেদিন জাহান্নামের অগ্নিতে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হবে (এবং বলা হবে) এটাই ওই সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য কুক্ষিগত করে রেখেছিলে। সুতরাং তোমরা যা পুঞ্জীভূত করতে, তা আস্বাদন কর।’ (সুরা তাওবা, আয়াত ৩৪-৩৫)। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে জাকাত প্রদান করে না, কিয়ামতের দিন সে জাহান্নামে যাবে।’ (তাবারানি)। তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা যাকে ধন-সম্পদ দান করেছেন, সে যদি ওই সম্পদের জাকাত আদায় না করে, তাহলে তার সম্পদকে কিয়ামতের দিন টাকপড়া বিষধর সাপের রূপ দান করা হবে। যার চোখের ওপর দুটি কালো দাগ থাকবে, যা কিয়ামতের দিন তার গলায় বেড়ির মতো পেঁচিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর সে সাপটি তার চোয়ালে দংশন করে বলতে থাকবেÑআমিই তোমার সম্পদ, আমিই তোমার কুক্ষিগত মাল।’ (বুখারি শরিফ ১/১৮৮)
বিদায়ের পথে রমজান: কী পেলাম আর হারালাম
রমজান মাস পুরোটাই কল্যাণ ও বরকতের মাস। এ মাসে আল্লাহতায়ালা স্বীয় বান্দাদের মেঘমালার মতো সুশীতল ছায়া দান করেছিলেন। এ মাসের রোজা দ্বারা তাকওয়ার অনুশীলন দান করেছিলেন। মসজিদের মেহরাবগুলোয় হাফেজ সাহেবদের সুমধুর তিলাওয়াতের ধ্বনিÑযা মূলত মুমিনদের উদ্দেশে রাহমানুর রাহিমের আহ্বান। যে ধ্বনি মস্তিষ্ককে সুশোভিত আর অন্তঃকরণকে করছিল আলোকিত। তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদ, জিকির ও দোয়া অন্তরকে আল্লাহর নৈকট্যের অনুভূতিতে সিক্ত এবং চোখ থেকে খোদাভীতির অশ্রুবৃষ্টি ঝরিয়েছিল। দেখতে দেখতেই এই ধারাবাহিকতার পরিসমাপ্তি ঘটে যাচ্ছে বা ঘটল। একজন মুমিনের ভেবে দেখা উচিত যে, রমজানে সে কী পেল; এর কী কী প্রভাব ও ক্রিয়া অন্তর এবং মস্তিষ্কে, বোধ ও বিশ্বাসে, কর্ম ও চরিত্রে অবশিষ্ট রইল। রমজানে সে কী পেল এবং রমজানের বিদায়বেলায় সে কী কী খায়ের-বরকত হারাল। এটা বাস্তব কথা যে, যে ব্যক্তি রমজানের হক যত বেশি আদায় করেছে, রমজানের আদবগুলোর প্রতি যত বেশি যতœবান থেকেছে, সে তার কর্মজীবনে রমজানের প্রভাব ও ক্রিয়া তত বেশি অনুভব করবে। আমরা যদি রোজার পুরো হক আদায় না করে থাকি, তাহলে তাকওয়ার সেই বিশেষ স্তর আমাদের অর্জিত হয়নি; তবুও নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। কেননা প্রত্যেক মুমিনের অন্তরে সামান্য পরিমাণ হলেও তাকওয়ার স্ফুলিঙ্গ অবশ্যই থাকে; আর রোজার মাধ্যমে তাতে কিছু না কিছু বৃদ্ধি অবশ্যই ঘটে থাকে। আর সে সামান্য তাকওয়াকেই যদি সযতেœ লালন করা হয় এবং সে মোতাবেক আমল করা হয়, তাহলে এই সামান্য তাকওয়াই দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর থাকবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে আমার প্রিয় বান্দা, তোমরা যারা নফসের গোলামি করে নিজেদের জীবন গুনাহে পূর্ণ করে ফেলেছ, (তারা) আমার রহমত থেকে নিরাশ হইও না। নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ ক্ষমাশীল ও অতি দয়ালু।’ (সুরা জুমা, আয়াত ৫৩)। আল্লাহতায়ালা হাদিসে কুদসিতে নিজেই এরশাদ করেছেন, ‘আমার বান্দা আমার প্রতি যেরূপ ধারণা রাখে, আমিও তার সঙ্গে সেরূপ আচরণ করি এবং বান্দা যখন আমাকে স্মরণ করে, তখন আমি তার সঙ্গী হই। যদি সে আমাকে একাকী স্মরণ করে, আমিও তাকে এককী স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, তাহলে আমি তার দিকে চার হাত অগ্রসর হই। যদি সে আমার দিকে হেঁটে আসে, তাহলে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।’ (মুসলিম শরিফ ২/৩৪১)