জাফলং ও সংগ্রামপুঞ্জিতে একদিন

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত’র ‘ঝর্ণার গান’ কবিতার মাধ্যমে ঝরনার রূপ ও চলার গতি সম্পর্কে জানার সৌভাগ্য হয় সেই ছোটবেলায়। ঝরনার চঞ্চল পা পুলকিত ও গতিময়। ঝরনা স্তব্ধ পাথরের বুকে এঁকে দেয় আনন্দের পদচিহ্ন। পাহাড় থেকে চঞ্চল ও আনন্দময় পদধ্বনিতে নেমে আসে সাদা জলরাশির ধারাময় ঝরনা। চমৎকার এর ধ্বনিমাধুর্য ও বর্ণবৈভব। এই জলধারার যে সৌন্দর্য ও অমিয় স্বা,দ তা তুলনারহিত। গিরি থেকে পতিত এই অম্বুরাশি পাথরের বুকে আঘাত হেনে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে যে অপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে, তা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। সেই সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে আমরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের সাত কলমসৈনিক গিয়েছিলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটের জাফলং আর মায়াবী ঝরনা সংগ্রামপুঞ্জি দেখতে।
আমাদের সিলেট ভ্রমণের যাত্রা শুরু হয়েছিল ট্রেনের মাধ্যমে। রাজশাহী থেকে যাত্রা করে ঢাকা হয়ে আমরা সিলেটে পৌঁছাই। যাওয়ার পথে ট্রেনের ওপর পুরোটা সময় ছিল আমাদের আনন্দ আর উল্লাসে কাটানো। বেসুরে গান, গল্প ও
হাসি-তামাশার সঙ্গে ট্রেনের কুঝিকঝিক শব্দ। হাওরের মাঝ দিয়ে ছুটে চলা ট্রেন আর হাওর পেরিয়ে ট্রেনলাইনের দু’পাশে সবুজ চা বাগানের সঙ্গে উঁচু টিলা আমাদের ভ্রমণ আনন্দে আরও বেশি মাত্রা যোগ করেছিল।
প্রথমত আমাদের যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল সারা দেশ থেকে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের আয়োজনে ক্যাম্পাস জার্নালিজম ফেস্ট-২০১৮তে যোগ দেওয়া। দু’দিনব্যাপী এ মিলনমেলা শেষ করে আমরা বেরিয়ে পড়ি সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটের উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্র জাফলংয়ে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। সেই ছোটবেলা থেকে বোনা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু হয় আমাদের ছুটে চলা। সিলেট শহর থেকে একটা লেগুনা গাড়ি ভাড়া করে আমরা ছুটে চললাম জাফলংয়ের পথে। জাফলংয়ের পথে চলতে চলতে চোখে পড়ে উঁচু পাহাড়। দূর থেকে দেখলে এই পাহাড়গুলো মনে হয় আকাশ আর পাহাড়ে মিশে গেছে। তার ওপর দিয়ে ভেসে চলেছে সাদা মেঘরাশি। রাস্তার পাশে চা বাগান, সারি সারি পাহাড় আর মেঘের খেলার দৃশ্য যে কাউকে মুগ্ধ করবে। পাহাড়ের গা বেয়ে একটু পরপরই ঝরনার মতো বেয়ে পড়া সাদা রঙের জলের ধারা বেয়ে পড়ছে। সেই জলের ধারা পাহাড়ের পাদদেশে অবিরাম ছুটে চলেছে। এ দৃশ্যপট মনে করিয়ে দেয় জীবনানন্দের রুপসি বাংলার কথা। এ দৃশ্য অবলোকন করতে করতে আমরা সিলেট শহর থেকে ভোলাগঞ্জে যাওয়ার পর পৌঁছে গেলাম বাংলাদেশ সীমানার শেষ প্রান্তে ভারতের খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ‘প্রকৃতিকন্যা’খ্যাত জাফলংয়ে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি এই জাফলং। এর অদূরেই ছিল ধলাই নদীর উজানে অবস্থিত পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিবহুল এলাকা চেরাপুঞ্জি। ওপারে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়, এপারে নদী।
পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে ঝরনা, আর নদীর বুকে স্তরে স্তরে সাজানো নানা রঙের নুড়ি পাথর। এখানেই শেষ নয়, সমতল চা-বাগান, খাসিয়া পল্লি, পানের বরজÑকী নেই জাফলংয়ে! এজন্যই হয়তো জাফলংকে বলা হয়ে থাকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে ভারতের সীমান্তঘেঁষা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এ জনপদকে।
জানা যায়, ৮০’র দশকের দিকে ব্যবসায়ীরা পাথরের সন্ধানে নৌপথে জাফলং যেতেন। কিন্তু আমাদের জাফলং যাত্রা ছিল জাফলংয়ের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের যে কথা শুনে এসেছি, সেই পিপাসা মেটাতে। এখানের পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপ জাফলংকে করেছে আরও আকর্ষণীয়। সীমান্তের ওপারে ভারতীয় পাহাড়ি টিলা, ডাউকি পাহাড় থেকে অবিরাম ধারায় প্রবহমান জলপ্রপাত। ঝুলন্ত ডাউকি ব্রিজ, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেল পানি, উঁচু পাহাড়ে গহীন অরণ্য প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছিল ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় পড়া সেই অদেখা প্রাকৃতিক লীলাভূমির বর্ণনার কথা। তবে শুধু পাহাড়, ঝরনা আর নদীতে সীমাবদ্ধ নয় জাফলংয়ের সৌন্দর্য। জাফলংয়ের সৌন্দর্যের আলাদা মাত্রা যোগ করেছে সেখানকার আদিবাসীদের জীবনধারা। নদী পার হলেই খাসিয়াপুঞ্জি। এখানে গেলে দেখা মিলবে সমতলের তিন থেকে চার ফুট উঁচুতে বিশেষভাবে তৈরি খাসিয়াদের ঘর। তাদের পানপাতা সংগ্রহ ও খাঁচা ভর্তি করার অভিনব দৃশ্য যে কারও নজর কাড়ে। এ দৃশ্য অবলোকন শেষে নয়নাভিরাম পাহাড় বেয়ে পড়া মায়াবী ঝরনা ‘সংগ্রামপুঞ্জিতে’ নিজেদের ভিজিয়ে অতৃপ্ত মনকে সুপ্ত করে আমাদের সিলেট ভ্রমণের সার্থকতা খুঁজে পাই।

আসিফ হাসান রাজু