জাহাজ ভাঙায় টানা তৃতীয়বার শীর্ষস্থানে বাংলাদেশ

ইসমাইল আলী: কয়েক বছর ধরে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে সরকার। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ কয়েকটি বড় প্রকল্পের নির্মাণও শুরু হয়েছে। পাশাপাশি আবাসন খাতেও মন্দা কিছুটা কাটতে শুরু করেছে। এর প্রভাবে রডের চাহিদা বাড়ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পেও লোহার ব্যবহার বাড়ছে। এ চাহিদা পূরণে অন্যতম ভূমিকা রাখছে জাহাজ ভাঙা। ফলে জাহাজ ভাঙার পরিমাণে শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

যদিও সমুদ্রসৈকতে গড়ে তোলা ইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙায় পরিবেশদূষণের ঝুঁকি অনেক বেশি। কর্মরত অবস্থায় বিভিন্ন ইয়ার্ডে এ শিল্পের শ্রমিকমৃত্যুর হারও কম নয়। এছাড়া জাহাজ ভাঙার সময় নির্গত গ্যাসে শ্রমিকরা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যায়ও আক্রান্ত হচ্ছে। তাই জাহাজ ভাঙা নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বিভিন্ন দেশে আন্দোলন করে আসছে। বাংলাদেশে এ নিয়ে বিভিন্ন সময় মামলা হয়েছে। এছাড়া নি¤œমানের ইয়ার্ডে জাহাজ বিক্রি বন্ধে ইইউ ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নানা ধরনের চাপ রয়েছে। তবে এগুলোর কোনোটিই বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙায় প্রভাব ফেলতে পারেনি।

২০১৭ সালে জাহাজ ভাঙায় বিশ্বে টানা তৃতীয়বারের মতো শীর্ষ অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। এ সময় বিশ্বের প্রায় ৩১ দশমিক ৭৩ শতাংশ জাহাজ ভাঙা হয় চট্টগ্রামে। এর আগে ২০১৬ ও ২০১৫ সালেও জাহাজ ভাঙায় বিশ্বে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। তবে ২০১৪ সালে এ তালিকায় অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী প্রকাশিত এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এতে বলা হয়, ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাপী জাহাজ ভাঙার পরিমাণ প্রায় দুই কোটি সাত লাখ টন। এর মধ্যে বাংলাদেশেই ভাঙা হয় ৬৫ লাখ ৬৮ হাজার ২২৭ টন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাশের দেশ ভারত। দেশটিতে গত বছর জাহাজ ভাঙার পরিমাণ ছিল ৫৯ লাখ ৮০ হাজার ৫১৪ টন। আর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অপর দেশ পাকিস্তান। দেশটিতে ওই সময় জাহাজ ভাঙা হয় ৪০ লাখ ৭০ হাজার ৪৯৮ টন। তবে গত বছর সারা বিশ্বে জাহাজ ভাঙা কমেছে। ফলে শীর্ষ এ তিন দেশেও জাহাজ ভাঙার পরিমাণ কমেছে।

২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপী জাহাজ ভাঙার পরিমাণ দুই কোটি ৭৪ লাখ টন। এর মধ্যে বাংলাদেশেই ভাঙা হয় ৯৫ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩০ টন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাশের দেশ ভারত। দেশটিতে গত বছর জাহাজ ভাঙার পরিমাণ ছিল ৮২ লাখ ২০ হাজার ১৯১ টন। আর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অপর দেশ পাকিস্তান। দেশটিতে ওই সময় জাহাজ ভাঙা হয় ৬০ লাখ ৩৫ হাজার ২২৮ টন।

দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে চীনে ২০১৭ সালে জাহাজ ভাঙা হয় ২২ লাখ ৯৬ হাজার ১৯০ টন, তার আগের বছর যা ছিল ২৪ লাখ ৯৫ হাজার ৫১৬ টন। শীর্ষ চার দেশে কমলেও তুরস্কে গত বছর জাহাজ ভাঙা বেড়েছে। এ সময় ১৩ লাখ ৮০ হাজার ৯৫৫ টন জাহাজ ভাঙা হয়, ২০১৬ সালে যা ছিল ১০ লাখ চার হাজার ৩৩৫ টন। এর বাইরে বিশ্বের অন্যান্য দেশে গত বছর ভাঙা হয় চার লাখ এক হাজার ৭১৯ টন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি হেফাজুুতুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, দেশের স্টিল মিলগুলোর কাঁচামালের অধিকাংশই শিপ রিসাইকেল থেকে আসে। এ খাতে চাহিদা বাড়ায় জাহাজ ভাঙার পরিমাণ বাড়ছে। বর্তমানে দেশে বড় কয়েকটি প্রকল্প শুরু হয়েছে। আবাসন খাতেও মন্দা কিছুটা কমেছে। এতে রডের চাহিদা বেড়েছে। এছাড়া বিভিন্ন কন্টেইনার ও কাভার ভ্যানের কাঁচামাল হিসেবে জাহাজের প্লেট ব্যবহার করা হয়। এজন্য জাহাজ ভাঙা বৃদ্ধির পরিমাণ অব্যাহত রয়েছে।

তবে এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর নেতারা। তাদের মতে, তিন-চার বছর আগেও জাহাজ ভাঙায় বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে ছিল চীন। পরে এ জায়গা দখল করে ভারত। তবে জাহাজ ভাঙায় পরিবেশ ইস্যুতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ ও আইনি কাঠামো প্রণয়নের কারণে দেশ দুটিতে এর পরিমাণ কমছে। দুর্বল আইনি কাঠামোর সুযোগে বাংলাদেশে এর পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।

বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের জীবনমান নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে। প্রায়ই নানা দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের মৃত্যু হচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতির জন্যও এ খাত দায়ী। তবে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর ভূমিকা রয়েছে। তারা নানা কথা বললেও কখনোই তার বাস্তবায়ন করেনি। কারণ সেগুলো বাস্তবায়িত হলে তাদের পুরোনো জাহাজ বিক্রি বন্ধ হয়ে যাবে।

শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের তথ্যমতে, পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশ শীর্ষে থাকলেও জাহাজ ভাঙার সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে ভারত। গত বছর বিশ্বব্যাপী ৮৩৫টি জাহাজ ভাঙা হয়। এর মধ্যে ভারতে ভাঙা হয় ২৩৯টি, বাংলাদেশে ১৯৭টি, পাকিস্তানে ১০৭টি, চীনে ৯৮টি ও তুরস্কে ১৩৩টি। এর আগের বছরও জাহাজ ভাঙায় সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে ছিল ভারত। এক্ষেত্রে ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপী ভাঙা ৮৬২টি জাহাজের মধ্যে ৩০৫টি ভাঙে ভারত। আর ২২২টি ভাঙা হয় বাংলাদেশে। এছাড়া ১৪১টি পাকিস্তানে, ৯২টি তুরস্কে ও ৭৪টি ভাঙা হয় চীনে।

সংস্থাটি বলছে, ২০১৭ সালে বিশ্বে ভাঙা জাহাজের ৬৫ শতাংশই ছিল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে। দাম বেশি পাওয়ায় শিপিং কোম্পানিগুলোও দক্ষিণ এশিয়ার ইয়ার্ডগুলোয় জাহাজ বিক্রিতে বেশি আগ্রহী। এজন্য মূলত গ্রিস ও জার্মানি দায়ী। তবে সুইজারল্যান্ড ও নরওয়ে ভাঙার জন্য তুলনামূলক ভালো পরিবেশে জাহাজ বিক্রি করেছে।

উল্লেখ্য, মূলত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, কুমিরা, জোড়ামতল, মাদামবিবিরহাট, কদমরসুল, ভাটিয়ারী, ফৌজদারহাট, শীতলপুর ও বারো আউলিয়ায় সাগরপাড়ে গড়ে উঠেছে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের সিংহভাগ। বর্তমানে দেশে ১৪৫টি শিপব্রেকিং ইয়ার্ড রয়েছে। আর এ পেশায় কর্মরত রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক।