প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

জাহাজ ভাঙা দুই প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ২৮৭ কোটি টাকা

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকে খেলাপি হলো দুই জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান মাবিয়া শিপ ব্রেকার্স ও শফিক স্টিল। এ দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকটির মতিঝিল করপোরেট শাখার পাওনা ২৮৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে মাবিয়া শিপ ব্রেকার্সের কাছে পাওনা প্রায় ১৪২ কোটি সাত লাখ টাকা ও শফিক স্টিলের কাছে পাওনা প্রায় ১৪৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। আর পাওনা আদায়ে উভয় প্রতিষ্ঠানের বন্ধকি সম্পদ নিলামে উঠছে।
রূপালী ব্যাংক লিমিটেড সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের দুই জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান মাবিয়া শিপ ব্রেকার্স ও শফিক স্টিল শুরুতে পাওনা পরিশোধে নিয়মিত থাকলেও পরে তারা অনিয়মিত হয়ে পড়ে। পাওনা আদায়ে একাধিকবার তাগাদা দিলেও প্রতিষ্ঠান দুটির কর্ণধাররা প্রত্যেকবার পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হন। ফলে সুদাসলসহ তাদের কাছে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ২৮৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
পাওনা আদায়ে উভয় প্রতিষ্ঠানের বন্ধকিতে থাকা সব সম্পত্তি আগামী ২৫ মে নিলামে বিক্রির তারিখ নির্ধারণ করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সীতাকুণ্ডের জাহানারাবাদ এলাকার জাহাঙ্গীর আলমের মালিকানাধীন মাবিয়া শিপ ব্রেকার্সের সীতাকুণ্ড মৌজায় ৩১ তফসিলে মোট এক হাজার ৮৩ শতাংশ জমিসহ সব স্থাপনা এবং চন্দনাইশের বাসিন্দা শফিকুল ইসলামের মালিকানাধীন শফিক স্টিলের চন্দনাইশ ও সীতাকুণ্ড মৌজায় ১১টি তফসিলে মোট ৯২২ শতাংশ জমিসহ সব ধরনের সম্পত্তি আছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, সীতাকুণ্ডের জাহানারাবাদ এলাকার জাহাঙ্গীর আলম, ফরিদুল আলম ও খোরশেদ আলম এ তিন সহোদর ২০০৮ সালে পর একে একে গড়ে তোলেন মেসার্স জিলানী ট্রেডার্স, মাহিম স্টিল রি-রোলিং মিল, মাবিয়া শিপ ব্রেকার্স, মাবিয়া শিপ ব্রেকার্স ইউনিট-২, এফএমএস ইস্পাত শিপ ব্রেকিং, আলী স্টিল এন্টারপ্রাইজ এবং খাজা আজমীর করপোরেশনের সমন্বয়ে গড়ে তুলে মাবিয়া গ্রুপ। সময়ের সঙ্গে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে থাকে। কিন্তু তাদের অদূরদর্শী প্রকল্প গ্রহণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক অনভিজ্ঞতার ইত্যাদি বিবেচনা না করে দ্য সিটি ব্যাংক, এবি ব্যাংক, মাকেন্টাইল ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, যা এখন গলার কাঁটা হয়ে আছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন করে সিটি ব্যাংক। ব্যাংকটির পাওনা প্রায় ১৬১ কোটি টাকা। একইভাবে এবি ব্যাংকের পাওনা আছে ১১৭ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ১২১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এছাড়া মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ১০৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এছাড়া মাবিয়া শিপ ব্রেকিংয়ের কাছে ফিনিক্স ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টেরও ৯ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে। এর বাইরে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, যমুনা ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকের অর্থও মাবিয়া গ্রুপের কাছে আটকে আছে বলে জানা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, কখনও ভুয়া সম্পত্তি বন্ধক রেখে, কখনও বন্ধকি সম্পত্তির অতি মূল্যায়ন করে চারটি শাখা থেকে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় গ্রুপটি। অর্থ হাতিয়ে নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছেÑইনডেক্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি লিমিটেড, তুরাগ এগ্রিটেক্স লিমিটেড, গাজীপুর পেপার্স বোর্ড লিমিটেড, শফিক স্টিল, মাবিয়া শিপ ব্রেকার্স, ক্রিস্টাল শিপ ব্রেকার্স, নাসিব এন্টারপ্রাইজ, জেনারেটর হাউজ ও এসআরএস শিপ ব্রেকার্স। প্রতিষ্ঠানগুলোর হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ৯ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এ বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠান দুটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাদের ব্যবহৃত নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে মন্তব্য পাওয়া যায়নি। একদিকে মাবিয়া গ্রুপের এক কর্মকর্তা বলেন, মূলত ২০১০ সালের পর এ গ্রুপের ধস নামে। এখন তেমন বাণিজ্যিক কার্যক্রম নেই। মালিকরাও তেমন আসেন না। তবে মাঝে মাঝে কয়েক ঘণ্টার জন্য আসেন। শুনেছি ব্যাংকের অনেক দেনা আছে।
রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘শাখা পর্যায়ের তথ্য আমার কাছে জানতে চাইলে তো হবে না। এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না। আপনি শাখা ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলেন।’ তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপকের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সর্বশেষ..