প্রচ্ছদ শেষ পাতা

জিডিপির অনুপাতে কমছে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ

শেখ আবু তালেব: সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিতে চমক লাগানো উন্নতি হয়েছে। গড়ে সাত শতাংশের বেশি হারে জিডিপি প্রতিবছর বাড়ছে। কিন্তু জিডিপির অনুপাতে প্রতিবছরই কমে আসছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ। গত পাঁচ বছরে এর পরিমাণ কমেছে চার দশমিক ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। বিষয়টিকে জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সহনীয় নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রা আহরণে সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। বর্তমানে দেশের আমদানির পরিমাণের ৪০ শতাংশ হচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। আর আমদানি ব্যয়ের ২৭ শতাংশের বেশি মেটাতে ভূমিকা রাখছে রেমিট্যান্স।
তবে জিডিপির অনুপাতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। এর প্রভাবে আমদানি ব্যয় পরিশোধেও কমে আসছে রেমিট্যান্সের অনুপাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের আমদানি বাণিজ্যের দায় পরিশোধে ২৭ শতাংশ অবদান রাখে রেমিট্যান্স। ২০১২-১৩ অর্থবছরেও এ অবদান ছিল ৪৩ শতাংশের বেশি।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৬৭ শতাংশ গড়ে উঠেছে রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে। রেমিট্যান্সের কারণেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সক্ষমতা বাড়ছে বাংলাদেশের। এছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও প্রবাসী বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে রেমিট্যান্স।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে এক লাখ ১৫ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির তুলনায় ৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ। পরের অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে এক লাখ ১০ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির আট দশমিক ২১ শতাংশ।
এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমায় জিডিপির তুলনায় বড় ব্যবধান বেড়েছে আগের বছরের চেয়ে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে এক লাখ ১৮ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির সাত দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ অর্থবছরটিতে আগের অর্থবছরের চেয়ে রেমিট্যান্স কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও কমেছে জিডিপির হিসাবে।
জিডিপির আকার বৃদ্ধি হওয়ার সঙ্গে আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়নি রেমিট্যান্সের প্রবাহ। এভাবে ক্রমাগত কমে আসছে জিডিপির তুলনায় রেমিট্যান্সের প্রবাহ। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে এক লাখ ২৩ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির পাঁচ দশমিক পাঁচ শতাংশ। এ হিসাবে গত পাঁচ বছরে জিডিপির তুলনায় রেমিট্যান্স কমেছে চার দশমিক ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মানসুর শেয়ার বিজকে বলেন, আমাদের অর্থনীতি এখন স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে, অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। আমাদের পরনির্ভরশীলতা কমে আসবে। এ সময়ে রেমিট্যান্স কমে আসাটা স্বাভাবিক। এটি ঠেকানো যাবে না। কিন্তু রেমিট্যান্সে প্রবাহ যে হারে কমছে, তা অস্বাভাবিক। সহনীয়ভাবে কমছে না। যদি একটু ধীরগতিতে কমত, তাহলে ভালো হতো।’
এর প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, রেমিট্যান্স কমে আসার প্রভাব নিশ্চয়ই ভালো হবে না। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বে। এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে, রিজার্ভ কমছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার সঙ্গে আমাদের বিনিয়োগ বাড়বে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এর বাইরে সরকারি-বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের হারও বৃদ্ধি পাবে। তখন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বৃদ্ধি পাবে। রিজার্ভও কমে আসবে। এর প্রভাব পড়বে টাকার মূল্যমানের ওপর। গত পাঁচ বছরে দেশের আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গত ৮ মে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৯৯ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। গত বছরের এ দিনে ছিল তিন হাজার ১৯২ কোটি ১৫ লাখ ডলার।

সর্বশেষ..