জ্ঞানভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র প্রয়োজন

মো. নূরুল ইসলাম: জনসংখ্যা অনুপাতে আমাদের দেশে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণকারীর সংখ্যা তেমন বাড়েনি। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আরও কম। পর্যটন খাত প্রধানত প্রকৃতি-প্রদত্ত দর্শনীয় স্থানের ওপর নির্ভরশীল। সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পাহাড় দর্শন, মাজার জিয়ারত প্রভৃতি। দুর্বল অবকাঠামো আর অব্যবস্থাপনার কারণে এসব দর্শনীয় স্থানে পর্যটকরা বারবার আসেন, তাও নয়। অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা বেড়াতে যান বিদেশে। এর বড় একটা অংশ হলো ভারতে। তাই সহজেই বলা যায় দেশের পর্যটন খাত খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বেড়াতে খুবই আগ্রহী। বহুমুখী ও মানসম্পন্ন পর্যটনকেন্দ্র দেশে না থাকায় অনেকেরই আর বেড়ানো হয়ে উঠে না। একই জায়গায় বারবার ভ্রমণ করার আগ্রহ হয়, এমন একটি পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করা এখন খুবই জরুরি। আমার জানামতো এমন একটি জায়গা আছে, যেখানে একাধিক সুযোগ-সুবিধা সংযুক্ত করে প্রকৃতি ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে বড় পরিসরে (মেগা প্রজেক্ট) একটি পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করা যাবে। জায়গাটির অবস্থান হলো সুনামগঞ্জের যুক্তরাজ্য প্রবাসী অধ্যুষিত জগন্নাথপুর উপজেলার মইয়ার হাওর। হাওরের পূর্বদিকে পৌরসভার বাজার, উত্তরে সড়ক, পশ্চিমে চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়ন এবং দক্ষিণে বর্ষাকালীন নদী ও রানীগঞ্জ ইউনিয়ন। জায়গাটি বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে থাকে। শীতকালে স্থানীয় জাতের ফসল একবারই উৎপাদিত হয়। জায়গাটির বাজারমূল্যের দুই বা আড়াই গুণ দিয়ে অধিগ্রহণ বা কিনে নেওয়া সম্ভব। অথবা জায়গাটির বর্তমানে স্বত্বাধিকারীর মালিকানা বহাল রেখে অংশীদারীর ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে ফসল, মৎস্য বা কর্মসংস্থানের কোনোটাই বাধাগ্রস্ত হবে না। বরং ফসল ও মৎস্য উৎপাদন অনেক বেড়ে যাবে। পরিবহন খাতে কাজের পরিধি অনেক বড় হবে। শতভাগ পরিবেশবান্ধব, গ্যাসবিহীন, সাধারণ বিদ্যুতে চলার মতো বিনোদনকেন্দ্রটি তৈরি হলে বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বের আগ্রহ বাড়বে। বিশ্বের পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় বাংলাদেশের নামও যোগ হবে। বেড়ে যাবে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণকারীদের সংখ্যাও। অবকাঠামোটি যথাযথভাবে নির্মিত বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতিও পেতে পারে। এ কেন্দ্রটির প্রধান আকর্ষণ হলো জ্ঞান (Acquisition of knowledge) তথা জ্ঞান অর্জন। জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে এ পর্যটনকেন্দ্র নির্মিত হইবে। পর্যটক দেখেশুনে তা উপলব্ধি করতে পারবেন। পর্যটক যা ভাববেন, উত্তর তাৎক্ষণিক পেয়ে যাবেন। টিক চিহ্ন দিয়ে লেখাপড়া করে ছেলেমেয়েরা যা শিখে বরং এখানে ঘণ্টাখানেক এই অবকাঠামোটি পর্যবেক্ষণ করলে তার চেয়ে বেশি নির্ভুল জ্ঞান অর্জন সম্ভব। পর্যটনকেন্দ্রটি হবে একের ভেতরে তিন জ্ঞানভিত্তিক মিনি বিশ্ব, আধুনিক শিশুপার্ক ও ঘোড়দৌড়।
মিনি বিশ্ব: জ্ঞানভিত্তিক এ পর্যটনকেন্দ্রটি বাস্তবায়িত করার জন্য প্রথমেই জায়গাটির সীমানা চিহ্নিত করতে হবে। তারপর সীমানা বরাবর দেওয়াল (বেষ্টনী) দিয়ে পর্যটনকেন্দ্রটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা চাই। নির্বাচিত জায়গাটির আনুমানিক পরিমাণ হবে ২৭ বর্গকিলোমিটার, যা সিলেট সিটির করপোরেশনের আয়তনের চেয়ে বড়। পরে ওই চতুর্ভুজ আকৃতির জায়গাটির মধ্যস্থল থেকে একটি কেন্দ্র নির্ধারণ করে বৃত্ত আঁকা চাই। বৃত্তের ব্যাসার্ধ হবে দুই কিলোমিটার। বৃত্তের ভেতরে থাকা জায়গার পরিমাণ হবে ১২ দশমিক ৫৭ বর্গকিলোমিটার বা এক হাজার ২৫৭ হেক্টর। বৃত্তের ভেতরে থাকা জায়গাটি এখন একীভূত করতে হবে। জায়গাটিকে এখন একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম মোতাবেক ঢেলে সাজানো হবে। সহজভাবে বললে যা দাঁড়ায়, যে বৃত্তের মধ্যে থাকা জায়গা এমনভাবে ভাগ করতে হবে, যাতে সব অংশ সমান থাকে। সীমানা প্রাচীর বেষ্টিত বৃত্তাকার জায়গায় পৃথিবীর মানচিত্র স্থাপন করতে হবে। পৃথিবীর আয়তন ৫১ কোটি এক লাখ বর্গকিলোমিটার। মইয়ার হাওর এখন হয়ে যাবে মিনি বিশ্ব, এবার এখানে পৃথিবীর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য দিতে হবে। তারপর দৃশ্যমান করা চাই। মিনি বিশ্ব হবে ডিজিটালাইজড। প্রজেক্টরের মাধ্যমে সব দেশের পরিচিতি ও অন্যান্য তথ্য পর্দায় দেখানো হবে। বিশ্বের সবার কাছে পরিচিতি আছে এমন স্থাপনা যেমনÑতাজমহল, আইফেল টাওয়ার, পিরামিড, হারিয়ে যাওয়া ডাইনোসর, ভেঙে যাওয়া টুইন টাওয়ার প্রভৃতির প্রতিকৃতি তৈরি করে নিজ নিজ দেশে রাখতে হবে। পৃথিবীর ৭১ শতাংশ জল এবং ২৯ শতাংশ স্থল। মিনি বিশ্বে জলের পরিমাণ হবে দুই হাজার ২০৫ একর এবং স্থলভাগ হবে ৯০১ একর। নিয়ম মেনে যদি আনুপাতিক হারে পৃথিবীর মানচিত্র এখানে স্থাপন করা হয় তখন বাংলাদেশের এক লাখ ৪৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের জায়গায় এখানে তার পরিমাণ হবে ৯০ শতক। ভারতের হবে ২০ একর, মালদ্বীপের হবে পয়েন্ট ১৮, সৌদি আরবের হবে ১৩ একর, কানাডার হবে ৬১ একর এবং রাশিয়ার এক কোটি ৭১ লাখ বর্গকিলোমিটারের আয়তনের জায়গায় এখানে হবে ১০৪ একর। বাস্তবতা হলো বড় বড় নদী, ছোট ছোট দেশ, দ্বীপ, খাল যেমনÑসুয়েজ খাল বা এ-জাতীয় স্থাপনা আরও যা আছে তা দৃশ্যমান হবে না। যেহেতু আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য বিশ্বকে চর্মচক্ষে দেখে বিভিন্ন দেশ বা স্থাপনা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া, তাই এখানে একটি বড় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন। প্রয়োজনের তাগিদে প্রত্যেক দেশের আয়তন যা আছে, এখানে তা আড়াইগুণ করা হবে, যাতে বিশ্বের বেশিরভাগ জায়গা দৃশ্যমান হয়। এতে জলভাগের (সাগর, মহাসাগর) আয়তন কমে যাবে। এখন মিনি বিশ্বে জলের পরিমাণ হবে ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ (৮৫৪ একর) এবং স্থলভাগের পরিমাণ হবে ৭২ দশমিক ৫০ শতাংশ (দুই হাজার ২৫২ একর)। মিনি বিশ্বের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোকে জলচিহ্ন দিয়ে করতে হবে পায়ে হাঁটার পথ। নৌ-ভ্রমণের স্বার্থে সুয়েজ খাল বা এ-জাতীয় জলাধার ব্যবহারোপযোগী করে রাখা চাই। মিনি বিশ্ব হবে বড় পরিসরে স্বচ্ছ পানির একটি সংরক্ষিত আদর্শ জলাশয়। এখানে প্রচুর স্থানীয় জাতের মাছ চাষাবাদ করা যাবে। ভ্রমণকারীদের আনন্দ দেওয়ার জন্য বিরল প্রজাতির কচ্ছপ ও ডলফিন, যার স্থানীয় নাম ‘হু’ বা শিশু এখানে রাখা যেতে পারে। প্রতি বছর একবার উৎসব করা যাবে, পলো দিয়ে মাছ ধরার। এখন মিনি বিশ্বে স্থলভাগের জায়গা অনেক বেড়ে গেছে। তাই সারা বছর একাধিকবার ফসল, তরিতরকারি, ফল ফলন করে প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। মিনি বিশ্বের জায়গা চাষাবাদের জন্য প্রতি বছর একবার জমি ইজারা দেওয়া যেতে পারে। কে কোন দেশ নিলামে পেল, তা নিয়ে মজা হবে। এখানে থাকা বড় বড় দেশের জায়গায় তৈরি করা যাবে খেলার মাঠ। তারপরে মিনি বিশ্বে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আসর বসানো যাবে। এটা হবে একটি জ্ঞানভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র। সাধারণত জ্ঞান বলতে আমরা বুঝে থাকি নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের ওপর ওই বিষয়ে স্পষ্ট সম্যক ধারণা থাকা। একটি উদাহরণ দেওয়া গেল; ভারতের দার্জিলিং শহরে একাধিক দর্শনীয় স্থান আছে। তার মধ্যে একটি হলো তেনজিং রক। এখানে বড় একটা পাথর কেটে হিমালয় পর্বতের প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, হিমালয়ের ওপর লেখা একাধিক পুস্তক পড়ে যা জানা যাবে, তার চেয়ে এখানে কয়েক মিনিট ওই পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে তা পর্যবেক্ষণ করলে হিমালয় পর্বত ও পর্বত আরোহণের ধারণা অনেক বেশি পাওয়া যাবে। একইভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের একজন সাধারণ ভ্রমণকারী এই মিনি বিশ্বে এসে বাংলাদেশের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে সে দেখতে পাবে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে কত ছোট। ভারত কীভাবে বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে। ভারত-চীন যদি যুদ্ধে জড়িয়ে যায় তখন ভারত তার চিকেন নেক নিয়ে কেন বেশি চিন্তিত হয়। অতীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কোন পথে, কীভাবে ইংল্যান্ড থেকে ভারতে এসেছিল। সুয়েজ খাল হওয়ার পর সে দূরত্ব কতটুকু কমেছে। ইসরাইল রাষ্ট্র কত বড় এবং কতটুকু জায়গা সে দখল করে রেখেছে। আশেপাশে কোন কোন দেশ আছে। লিবিয়া থেকে নৌকায় কীভাবে কোন পথে ইতালি যাওয়া যায়। আমেরিকা যেতে হলে কোন সাগর পাড়ি দিতে হয় প্রভৃতি। এখানে আনন্দ করার পাশাপাশি জ্ঞানও অর্জন করা যাবে। এ নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারব। দাবি করব এ হলো বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিনোদনকেন্দ্র।
সওয়ারি হওয়া: মিনি বিশ্বের আয়তন তিন হাজার ১০৬ একর। এখানে বিশ্বমানের একাধিক রাইড থাকবে। নৌ-ভ্রমণÑএটা অনেকটা উপজাত হিসেবে পাওয়া যাবে। এখানে নৌ-ভ্রমণ এক কথায় অনন্য, ফাটাফাটি ব্যাপার। বাঁধভাঙা আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে সবাই হারিয়ে যেতে চাইবেন। কোথায় আমার হারিয়ে যেতে নেই মানা মনে মনে… না, আর মনে মনে নয়। এখানে আপনি যেখানে খুশি হারিয়ে যেতে পারেন। একটু পরে আবার নিরাপদে নিজ অবস্থানে ফিরে আসবেন। সারা পৃথিবী নৌ-ভ্রমণ করতে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যাপার। নৌ-ভ্রমণের জন্য চাই মধ্যযোগীয় দাঁড়ে ও পালে চলা নৌকা, ছোট-বড় নানা আকারের জলযান। আর যা অবশ্যই এখানে থাকবে তাহলো অ্যাকুয়াটিক ওয়াটার পার্ক। রোলার কোস্টারÑনিরাপত্তা নিশ্চিত করে বিশ্বমানের একটি রোলার কোস্টার থাকবে। মিনি বিশ্বে সীমানায় যে দেয়াল (বেষ্টনী) হবে তা হবে একসঙ্গে দুটি। মাঝখানে প্রায় ১৫ ফুট জায়গা ফাঁকা থাকবে। নির্দিষ্ট উচ্চতায় ওই দুটি দেয়াল উপরে ওঠার পর সেগুলো মধ্যে সংযোজন দেওয়া হবে। পরে দুই দেয়ালের মাঝ বরাবর দেয়াল দিয়ে বৃত্তের ভেতর ও বাহির আলাদা করা হবে। বৃত্তের ভেতরের দেয়াল সংলগ্ন যে আট ফুট জায়গা থাকবে সেখানে রোলার কোস্টারের ট্র্যাক বসানো হবে। রোলার কোস্টারের রুট হবে ১২ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার প্রতিবার। এটি চলার পথে অর্ধেক যাওয়ার পর ৫০ ফুট উপরে উঠে নিচে নেমে আসবে। তারপর আবার দ্রুতগতিতে ৪০০ ফুট উপরে উঠে নিচে নেমে গন্তব্যস্থলে পৌঁছাবে। কেব্লকার বৃত্তের দেয়ালে পিলারের সঙ্গে সংযুক্ত করে এটা চালানো হবে। বৃত্তের ভেতর থেকে এটা মিনি বিশ্বকে ঘোরে দেখাবে, যার দূরত্ব হবে ১২ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার। রজ্জুপথ এটি চলবে বৃত্তের উত্তর থেকে দক্ষিণে। মিনি বিশ্বের মাঝ বরাবর, যার দূরত্ব হবে চার কিলোমিটার। রোলার কোস্টার, কেব্লকার, রজ্জুপথ, টয় ট্রেন পরিচালিত হবে দেয়ালের ওপর নির্মিত স্থাপনা থেকে। ভ্রমণকারীদের মিনি বিশ্বে প্রবেশ না করে শিশুপার্ক থেকে ওঠানামা করবেন।
শিশুপার্ক তিন হাজার ৫৬৫ একরজুড়ে হবে শিশুপার্ক। প্রথম ও দ্বিতীয় বেষ্টনীর মধ্যস্থানে থাকবে শিশুপার্ক। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চাহিদা অনুসারে যেসব রাইড থাকা দরকার, তা সবই রাখতে হবে। তাছাড়া এখানে থাকবে মিনি চিড়িয়াখানা, পৃৃথক পঙক্ষী নিবাস, বিশ্রাম নেওয়ার ভালো সুবিধা, হালকা খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা, মিনি হাসপাতাল, মোবাইল সেন্টার, বাউল জাদুঘর, নামাজের জায়গা প্রভৃতি। ছোট ছোট রাস্তা আর বনায়ন করে শিশুপার্কটি করতে হবে দৃষ্টিনন্দন। থাকবে বড় আকারের একাধিক রাইড। টয় ট্রেন মিনি বিশ্বের বাইরের দেয়াল ঘেঁষে যে সমান্তরাল সাত ফুট জায়গা থাকবে সেখানে বসবে টয় ট্রেনের ট্র্যাক। এটা মিনি বিশ্বের বাইরে চক্কর দেবে, যার রুট হবে প্রতিবার ১৩ কিলোমিটার। সুয়িং রাইড অতি উচ্চতায় বড় আকারের একটি ও ছোট আকারের একাধিক সুয়িং রাউড থাকবে। এটা শিশুপার্কের সুবিধামতো জায়গায় বসানো হবে। কৃত্রিম হ্রদ একটি কৃত্রিম জলার বন থাকবে। জলের নিচে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকে এমন বৃক্ষ যেমন জারুল, হিজল এবং করচগাছ এখানে সহজে পাওয়া যায়। জলার বনের দূরত্ব হবে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার, প্রস্থ হবে গড়ে ১৫০ ফুট। থাকবে উত্তর দিকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। শিশুপার্কে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অর্গানিক পদ্ধতিতে ফল, ফুল, তরিতরকারি চাষাবাদ করা যাবে। ফসলের জমিতে পর্যটনশিল্প তৈরি হলে দেশে খাদ্য উৎপাদনের জায়গা কমতে পারে। কৃষক ও গৃহস্থের জায়গা হাতছাড়া হতে পারে। কমতে পারে কর্মসংস্থানের সুযোগ। এ ধরনের সমালোচনা হতে পারে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে যে পরিমাণ ফসলের জমি আছে সে অনুসারে ওই জমি থেকে তেমন উপকার আসছে না। কারণ সব জমি চাষাবাদের আওতায় কখনও আসে না। এ বছর এখানে মাত্র এক হাজার ৫০০ হেক্টর জায়গায় চাষাবাদ হয়েছে। অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, পোকা-মাকড়ের আক্রমণ, গড়ে প্রতি দুই বছরে একবার বন্যায় ফসলহানি, ফসলের কম উৎপাদন, ফসলের কম মূল্য, চাষাবাদের ব্যয় বৃদ্ধি, ধান কাটার শ্রমিক ঘাটতি, ভালো যোগাযোগ না থাকা, এসব বিবেচনায় নিলে সহজেই বলা যায় এখানে চাষাবাদের প্রতি লোকজনের তেমন আগ্রহ নেই। আর কোনো কিছু করার নেই বলেই এখানে কোনো রকমে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। পর্যটনকেন্দ্রটি তৈরি হলে ফসল উৎপাদনে কোনো ঘাটতি পড়বে না। স্থায়ী কাজের সুযোগ তৈরি হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেক বেড়ে যাবে। কৃষিকাজের পরিবর্তে অনেকেই অকৃষি কাজের সুযোগ পাবেন। ঘোড়দৌড় আনুমানিক জায়গার পরিমাণ হবে ২০০ একর। প্রথম বেষ্টনীর বাইরের চারদিকে অনেক জায়গা থাকবে। প্রয়োজনীয় প্রস্থ রেখে একটি সমান্তরাল লেন (পথনির্দেশক) তৈরি করা হবে। এটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২৩ কিলোমিটার। চতুর্ভুজটির চারকোনা তখন বাঁকা করে দিতে হবে। লেনের বাইরে বেড়ার প্রয়োজন হবে। যদি ঘোড়দৌড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়, তখন পর্যটনকেন্দ্রের প্রবেশদ্বার মাটির নিচ দিয়ে নিতে হবে। বিনিয়োগ এটা বিনিয়োগের জন্য হবে উত্তম জায়গা। এখানে যত টাকা খুশি, নির্দ্বিধায় বিনিয়োগ করা যাবে। কম সময়েই মুনাফা হবে। এটি এমন এক অবকাঠামো, যেখানে লোকসানের ভয় নেই। যথাসময়ে সুফল পেয়ে যাবেন। যাদের সামর্থ্য আছে, প্রবাসী, অবসরে যাওয়া চাকরীজীবী, ব্যবসায়ী ও অন্য ধনাঢ্য ব্যক্তি, সবাই এখানে আস্থার সঙ্গে বিনিয়োগ করতে পারেন। ১০ হাজার কোটি থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা এখানে বিনিয়োগ করা যাবে। যোগাযোগ যোগাযোগব্যবস্থার ওপর পর্যটনশিল্পের সফলতা নির্ভর করে। তাই সরকারকে এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সিলেট-ঢাকা হাইওয়ে, নবীগঞ্জ উপজেলার আশারকান্দি থেকে রানীগঞ্জ বাজার, জগন্নাথপুর পৌরবাজার হয়ে যে আঞ্চলিক সড়কটি দক্ষিণ সুনামগঞ্জ গেছে, তা উন্নত করতে হবে। এ সড়ক জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, মোহনগঞ্জ, বারহাট্টা হয়ে নেত্রকোনায় পৌঁছাতে হবে। তাহলে ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগ কার্যত একে অন্যের কাছে প্রতিবেশী হয়ে যাবে। এমনকি ময়মনসিংহের সঙ্গে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সড়ক যোগাযোগ ভালো থাকায় সিলেটের সঙ্গে এসব জেলার দূরত্ব ও সময় কমে আসবে। নির্মাণ প্রক্রিয়াÑজ্ঞানভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্রটির কাজ পাওয়ার জন্য অনেক দেশ বা সংস্থা আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে। যেহেতু এই পর্যটনকেন্দ্রের আলাদা একটা মাত্রা থাকবে, যা হবে বিশ্বে প্রথম, তাই নির্মাণকাজের মান নিয়ে আপস করা চলবে না। অবশ্যই কাজটির দায়িত্ব দিতে হবে উন্নত কোনো দেশকে। এমন অবকাঠামোর প্রাথমিক কাজ শুরু করতে পারলে পর্যটন খাতে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে যাবে। পদ্মা সেতু হওয়ার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের লোকজন যেমন খুশ মেজাজে আছেন ঠিক তেমনি এই পর্যটনকেন্দ্রটি এখানে স্থাপিত হলে উত্তর বাংলা ও পূর্বাঞ্চলের লোকজন খুবই উপকৃত হবে।

অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা
ponchogramQgmail.com