জ্ঞানসৃষ্টির কাজ বাস্তবায়নের পরিবেশ নিশ্চিত করাই অঙ্গীকার

অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে বিএ অনার্স ও এমএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। তিনি ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন কলেজের ফুলব্রাইট স্কলার এবং যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ ফেলো ছিলেন আখতারুজ্জামান। ১৯৯০ সালে তিনি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০০৪ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। সম্প্রতি উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক বিষয়ে কথা বলেছেন শেয়ার বিজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবদুল হাকিম আবির

শেয়ার বিজ: আপনার ব্যক্তিজীবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলুন

. মো. আখতারুজ্জামান: আমার ব্যক্তিজীবনের বড় অংশজুড়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতি। শিক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত এ বিশ্ববিদ্যালয়কেই আপন মনে করছি। স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার পর বিসিএস ক্যাডার হই। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার স্বপ্ন থাকায় এ বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এ দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে কখনোই অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা আর্থিক উপার্জনসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমি জড়িত হইনি।

শেয়ার বিজ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একসময়প্রাচ্যের অক্সফোর্ডবলা হতো বিশ্ববিদ্যালয় সে ঐতিহ্য ধরে রাখতে কতটা সক্ষম হয়েছে বলে মনে করেন?

. মো. আখতারুজ্জামান: যে অর্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয় তা নিয়ে একটা ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউটোরিয়াল, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও আবাসিক সুবিধার নিয়মনীতি অক্সফোর্ডের আদলে তৈরি করা হয়েছিল। এ কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তখন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো। উল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়া অক্সফোর্ডের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যগত কোনো মিল নেই। তবে নিজস্ব অবস্থান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ ও জাতিরাষ্ট্র গঠনসহ জাতীয় উন্নতিতে যে অবদান রাখছে, তা দিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সার্বিকভাবে সফল হিসেবে অভিহিত করা যায়।

শেয়ার বিজ: কয়েক বছর পরেই ন্মশতবার্ষিকী পালন করবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেমন দেখতে চান? প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন সম্পর্কে কিছু বলুন

. মো. আখতারুজ্জামান: মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল যে কাজ জ্ঞানসৃষ্টি, সে কাজটি বাস্তবায়নের পরিপূর্ণ পরিবেশ যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস্তবায়ন হয় এটাই আমাদের লক্ষ্য। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার্থীদের মূল সমস্যাগুলো, যেমনÑক্লাসরুম সংকট, গ্রন্থাগারের অবকাঠামো সংকট, পরিবহন সংকট, শিক্ষার্থীদের ক্যান্টিনগুলোয় পুষ্টিহীন খাবার ইত্যাদি চিহ্নিত করে তা সমাধান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোকে যুগোপযোগী করে তোলার চেষ্টা করব। আমি মনে করি এ কয়টি কাজ করতে পারলেই গুণগতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে।

পৃথিবীতে অনেক রাষ্ট্রই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জাতীয় সংকটকালে এর ভূমিকা। এছাড়া রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের জন্য যেসব সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোতেও এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। এককথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন আর বাংলাদেশের অর্জন একই সুত্রে গাঁথা।

 শেয়ার বিজ: অভিযোগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং সুযোগসুবিধা শতভাগ নিশ্চিত করতে পারছে না অভিযোগ সম্পর্কে কী বলবেন?

. মো. আখতারুজ্জামান: আমার মতে শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করতে পারার পিছনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব দায়ী। অপরিকল্পিতভাবে শিক্ষার্থী ভর্তির কারণে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীদের চাপ সব ক্ষেত্রেই সমস্যা সৃষ্টি করে। সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করার উপায় নেই। আমরা মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে চিন্তা করছি। আশা করছি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খুব দ্রুত শিক্ষার্থীদের চাহিদা বিবেচনা করে তাদের অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।

শেয়ার বিজ: ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা কি আছে আপনার?

. মো. আখতারুজ্জামান: ডাকসু নির্বাচন যে পর্যায়ে আটকে আছে তার সমাধান অসম্ভব না হলেও কিছুটা জটিল। ইতোমধ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমাদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করে এর প্রক্রিয়া এবং পদ্ধতি বের করতে হবে।

শেয়ার বিজ: দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে পূর্ণাঙ্গ সিনেট ছাড়াই চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বিষয়ে আপনার মতামত কী?

. মো. আখতারুজ্জামান: বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট গঠন বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সেখান থেকে আমরা একটা দিকনির্দেশনা পাবো। সে আলোকে সিনেটের সভাপতি হিসেবে আমিও ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করবো। তবে আমি মনে করি, সিনেটে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংখ্যক সদস্যের উপস্থিতি থাকাটাই বাঞ্ছনীয়।

শেয়ার বিজ: সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মসহ আরও কিছু অনিয়ম উঠে এসেছে এসব বিষয়ে উপাচার্য হিসেবে আপনার ভূমিকা কী হবে?

অধ্যাপক . মো. আখতারুজ্জামান: কিছু অনিয়ম হয়েছে এটা সত্য। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের একটা পর্যবেক্ষণও ছিল যাতে অনিয়মের বিষয়টিকে অনাকাক্সিক্ষত বলা হয়েছে। এসব অনিয়মের দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আমাদের সবারই। এ পর্যায়ে এ বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার চেয়ে এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়ানোটাই আমাদের কাম্য। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার দরকার।

শেয়ার বিজ: উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা গবেষণা গ্রন্থাগারে অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটে দুটি খাতই অবহেলিত বিষয়ে যদি কিছু বলেন

. মো. আখতারুজ্জামান: গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাজেটের অপ্রতুলতা নেই, তবে অবকাঠামো সংকট এখানে বড় সমস্যা। এ সংকট মোকাবিলায় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

আর গবেষণার ক্ষেত্রে বাজেট কম হলেও কিছু গবেষণা কিন্তু হয়। বড় বাজেটের অভাবে আমরা হয়তো মৌলিক কোনো বড় গবেষণা করতে পারি না, তবে ছোট ছোট গবেষণাগুলো তো হচ্ছেই। আমার ধারণামতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে গবেষণাগুলো হয় সেগুলো আমাদের গণমাধ্যমে যথাযথ উপস্থাপন করা হয় না।

শেয়ার বিজ: গত কয়েক বছরে টিএসসিকেন্দ্রিক অনেকগুলো অনিবন্ধিত সংগঠন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে সংগঠনগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক অসামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে বলেও অভিযোগ রয়েছে বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

. মো. আখতারুজ্জামান: বিষয়টি সম্পর্কে আমি ইতোমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছি, তবে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য পাইনি। যদি কোনো সংগঠন কোনো ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়া যেসব সংগঠন নামসর্বস্ব, কিংবা ক্রিয়াশীল নয়, অথবা যেসব সংগঠনের কোনো ক্ষেত্রেই কোনো অবদান নেই, সেগুলোর বিষয়েও আমাদের ভাবতে হবে। কেননা স্থান সংকুলানের অভাবে অনেক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত বর্তমানে জাতীয় উন্নয়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতটুকু অবদান রাখছে বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যাপক . মো. আখতারুজ্জামান: সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখেছি, বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ বিকাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান ৭০ ভাগেরও বেশি। এছাড়া ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা বাদ দিলেও বর্তমান বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য।

শেয়ার বিজ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি আপনার কী ধরনের প্রত্যাশা থাকবে?

অধ্যাপক . মো. আখতারুজ্জামান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন নিঃসন্দেহে অনেক সম্মানের, তবে অনেক চ্যালেঞ্জও থাকে। আমি মনে করি, জাতির জনকের দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী এ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে পারলে তা সহজ হবে। আমার প্রত্যাশা থাকবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবাই আমাকে সহযোগিতা করবেন। এছাড়া আশা থাকবে জঙ্গিবাদ এবং অসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সবাই মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পর্যায়ে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধে বলীয়ান হয়ে গণতান্ত্রিক রীতি প্রতিষ্ঠিত করবে।

শেয়ার বিজ: আপনাকে ধন্যবাদ

. মো. আখতারুজ্জামান: শেয়ার বিজকেও আন্তরিক ধন্যবাদ।