সুশিক্ষা

জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে শতবর্ষী বিদ্যালয়টি

ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়

কথায় বলে, ধ্যানের চর্চা হয় গুহায়, ধর্মের চর্চা হয় মসজিদ-মন্দিরে, নীতির চর্চা হয় পরিবারে, বিদ্যার চর্চা হয় বিদ্যালয়ে অর্থাৎ জাগতিক বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষা লাভের স্তরভেদে আমরা বলি বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা যে জ্ঞান বা শিক্ষা লাভ করি, তা ফরমাল বা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। এমনই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঠাকুরগাঁওয়ের শতবর্ষী বিদ্যাপীঠ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়।
১১২ বছর ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে বিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়ের সাবেক অনেক শিক্ষার্থী এখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তারা এ বিদ্যালয়ের ছাত্র পরিচয় দিতে গৌরববোধ করেন।
ইতিহাস
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। বিদ্যালয়টি ঠাকুরগাঁও শহরের প্রাণকেন্দ্রে মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। ১৮৭৫ সালে সেনুয়া-টাঙ্গন নদীর মিলনস্থলের সন্নিকটে অবস্থিত জমিদারবাড়ির পাশে এমই (মিডিল ইংলিশ) স্কুল রূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯০৪ সালের ১ মার্চ ওই স্থানেই শিক্ষালয়টি এইচই (হায়ার ইংলিশ) স্কুলে পরিণত হয়।
এখানকার আলী মোহাম্মদ সরকার উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় রূপে প্রতিষ্ঠার সময় থেকে বহু বছর পর্যন্ত এর সহকারী সেক্রেটারি পদে সমাসীন ছিলেন। ১৯০৪ সালে স্কুলটিকে এইচই স্কুলে (উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে) রূপান্তরের ক্ষেত্রে রাজশাহী বিভাগের তদানীন্তন ইন্সপেক্টর অব স্কুলস হল ওয়ার্ড বিশেষ উৎসাহ দেন।
টাঙ্গন নদীর তীরে প্রথম প্রতিষ্ঠিত মাইনর স্কুলটিতে একটি খড়ের আটচালা ঘর ছিল। উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে রূপান্তরের পর স্কুলসংলগ্ন জমিদার কাচারির একটি বড় দালান স্কুলের কাজে অনেকদিন ব্যবহার করা হয়। এখানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় স্কুলটি স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দেয়। স্কুল স্থানান্তরের নিমিত্তে বর্ধমানের কুসুম গ্রাম জমিদারির তৎকালীন জমিদার বিবি তৈয়বা খাতুন ১০ বিঘা সাড়ে ১৫ কাঠা জমি দান করেন।
ওই জমির ওপর ১৯০৬ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে স্কুলের সুদৃশ্য ও সর্ববৃহৎ ভবন (বর্তমান প্রশাসনিক ভবন) নির্মিত হয়। ১৯০৮ সালের ডিসেম্বরে স্কুলটি বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তীকালে ওই জমিদারির সুযোগ্য উত্তরাধিকারী সৈয়দ বদরুদ্দোজা আরও ২৫ বিঘা জমি দান করেন। এরপর স্কুলের নতুন হোস্টেল নির্মাণ ও সম্প্রসারণের জন্য আরও এক একর জমি ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে হুকুমদখল সূত্রে আয়ত্ত করা হয়।
১৯০৪ সালের ১ মার্চ স্কুলটি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় (এইচই স্কুল) রূপে প্রতিষ্ঠিত হলে এর পরিচালনা পরিষদের প্রথম প্রেসিডেন্ট (সভাপতি) হয়েছিলেন দিনাজপুরের তদানীন্তন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এফজে জেফ্রিস। তিনি স্কুলটি উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার আগে এমই স্কুলেরও প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯০৮ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দিনাজপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরাই পদাধিকার বলে এ স্কুলের প্রেসিডেন্ট ও ১৯০৪ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁওয়ের এসডিওরা পদাধিকার বলে সেক্রেটারি ছিলেন।
১৯১০ থেকে ১৯১৮ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ঠাকুরগাঁওয়ের এসডিওরা পদাধিকার বলে এ স্কুলের ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোনীত হতেন। ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের এসডিওরা পদাধিকার বলে এ স্কুলের প্রেসিডেন্ট মনোনীত হতেন। মাঝে ১৯০৪ সালে এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে জনৈক মহকুমা ইন্সপেক্টর অব স্কুল আবদুল জব্বার স্কুলের সভাপতি হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এসডিওরা আবার এর সভাপতি মনোনীত হতেন।
স্কুলটির মঞ্জুরির জন্য ১৯০৪ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা হলেও ১৯১০ সালের শেষ দিকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি লাভ করেন। তখন থেকে ১৯৩৫ সালের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁওয়ের মুন্সেফরা পদাধিকার বলে এ স্কুলের সেক্রেটারি মনোনীত হতেন।
পরবর্তী প্রাদেশিকীকরণের পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা পদাধিকার বলে সেক্রেটারি মনোনীত হতেন। ১৯৮৪ সালের ১ ফ্রেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় রূপান্তরিত হলে পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসকরা সভাপতি এবং স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা সেক্রেটারি মনোনীত হয়ে আসছেন।
নামকরণ
১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ঠাকুরগাঁওয়ের এমই স্কুলটি ১৯০৪ সালে এইচই স্কুলে উন্নীত হলে স্কুলটির নাম হয় ঠাকুরগাঁও এইচই স্কুল। এরপর ১৯০৬ সাল থেকে রাজশাহী বিভাগের তদানীন্তন কমিশনার মেরিনডাইনের নামানুসারে স্কুলটির নামকরণ হয় মেরিনডাইন এইচই স্কুল। আরও পরে স্কুলটি ‘ঠাকুরগাঁও হাই স্কুল’ নামে পরিচিত হয়। ১৯৬৭ সালের ১ আগস্ট স্কুলটি প্রাদেশিকীকৃত (সরকারি) হলে ‘ঠাকুরগাঁও গভ. হাই স্কুল’ অর্থাৎ ঠাকুরগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় নামে নামকরণ করা হয়। বর্তমানে ‘ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত। ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি স্কুলটি ‘ঠাকুরগাঁও জিলা স্কুল’ নামে পরিচিতি পায়। তবে এই শেষোক্ত নামটি সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাই বর্তমানে সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচালিত হচ্ছে বিদ্যালয়টি।
ঠাকুরগাঁও ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ড. আবু মোহাম্মদ খয়রুল কবির বলেন, এ স্কুলে পড়ালেখা করে আজ আমি ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করছি। আমাদের স্কুলের ছাত্ররা অনেকে ভালো জায়গায় চাকরি করছে। এখনও আমরা গর্বের সঙ্গে বলি, আমরা ঠাকুরগাঁও বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। আশা রাখি এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যাবে। যুগ যুগ শিক্ষাদান করুক বিদ্যালয়টি।
ঠাকুরগাঁওয়ের বেসরকারি সংস্থা ইএসডিও’র নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। কারণ আমি ভালো ফল করেছিলাম ঠাকুরগাঁও জিলা স্কুলের কারণে। এ বিদ্যালয়ের অনেকে শিক্ষার্থী এখন উচ্চ পদে আসীন থেকে দেশ পরিচালনায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন।
বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সাজিদ আল রেজা বলে, জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে পড়তে পেরে আমি গর্বিত। এখান থেকে পাস করে অনেক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যলয়ে অধ্যয়ন করছেন। আমিও চাই ভালো ফল করে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী এ কে কাফী বলে, কেউ যদি জিজ্ঞেস করে ‘তুমি কোন স্কুলের ছাত্র’ তখন ‘সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র’ বললে খুবই তৃপ্তি পাই। আগামীতে ভালো ফল অর্জন করে দেশকে জানিয়ে দিতে চাই, আমি ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র।
শিক্ষক মো. তাফিম বলেন, বাংলাদেশের কয়েকটি পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় একটি। আমি এ স্কুলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে পেরে গর্ববোধ করি।
কাদিমুল ইসলাম জাদু নামের আরেক শিক্ষক বলেন, এটি আমার স্কুল। এটাই আমার পরিচয়। আমাদের সন্তানের যত্নসহ পাঠদান করাই আমার লক্ষ্য। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব দেবে বলে মনে করি।
প্রফেসর মনতোষ কুমার দে বলেন, ঠাকুরগাঁও হাই স্কুল আগে থেকেই শিক্ষার মানের দিক দিয়ে এগিয়ে ছিল। শুনেছি এ বছর বাংলাদেশের সেরা বিদ্যাপীঠের সম্মাননা পেয়েছে। আগামীতে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সোনার বাংলা গড়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আইয়ূব আলী বলেন, মানুষ গড়ার কারিগর এ বিদ্যালয়টি। শত বছর পার হলেও শিক্ষার দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়েনি। প্রতি বছর ভালো ফল করছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার মান আরও বৃদ্ধির জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মনোনিবেশ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বর্তমান প্রধান শিক্ষক আখতারুজ্জামান সাবু বলেন, আমি এ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। এখন শিক্ষক। এর চেয়ে গর্বের আর কিছু হতে পারে না। বিদ্যালয়টি মানুষ গড়ার কারখানায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সুশীল সমাজ ও দক্ষ জাতি গঠনের লক্ষ্যে সুশিক্ষাদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অন্তর্নিহিত গুণাবলির সার্বিক বিকাশসাধন, মূল্যবোধ সৃষ্টি ও মানসিক উৎকর্ষের বৃদ্ধি ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেমিক আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।

শামসুল আলম, ঠাকুরগাঁও

সর্বশেষ..



/* ]]> */