প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ঝুলে আছে বাজার উন্নয়নে ডিএসইর বিভিন্ন উদ্যোগ

শেখ আবু তালেব: দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন বৃদ্ধি, সূচকের উত্থান ও শেয়ারদর স্থিতিশীল রাখতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এক্সচেঞ্জ ট্রেড ফান্ড (ইটিএফ), অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি), স্মলক্যাপ মার্কেট, ডেরিভেটিভ পণ্য আনা, এসএমই বোর্ড, ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট কোম্পানি গঠন। মূলত বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আনতে এসব উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঝুলে থাকা এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগোচ্ছে ধীরগতিতে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে পুঁজিবাজার উপকৃত হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা এর সুফল পাবে। বর্তমান চিত্র থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারে দেশের পুঁজিবাজার। অন্যদিকে ডিএসইর কর্মকর্তাদের মতে, কিছুটা অগ্রগতি আছে এসব বাস্তবায়নে। কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরে একটি উদ্যোগ ঝুলে আছে উদ্বোধনের অপেক্ষায়।
জানা গেছে, স্মলক্যাপ মার্কেট চালু করার প্রক্রিয়া শেষ করে ডিএসই। এটি উদ্বোধন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অর্থমন্ত্রী সময় না দেওয়ায় এটি চালু করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ডিএসইর সংশ্লিষ্টরা। এটি চালু হলে স্বল্প মূলধনি কোম্পানি এ বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। প্রচলিত বাজারের মতো আইপিওর মাধ্যমে অর্থ তুলতে পারবে কোম্পানিগুলো। এ বাজারে আগ্রহী করতে করছাড়সহ বেশ কিছু সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে ডিএসই।
এছাড়া অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) চালু করার প্রক্রিয়াটিও ঝুলে রয়েছে। এটি করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। জানা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বাইরে থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেন হবে এর মাধ্যমে। মূলধন বাড়ানোর সুযোগও তারা নিতে পারবে। অপেক্ষায় রয়েছে এক্সচেঞ্জ ট্রেডিং ফান্ড (ইটিএফ) গঠনও। ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট কোম্পানি (সিসিবিএল) গঠনের আইনি ধাপ শেষ হলেও কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। এটি চালু হলে পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাজার পরিচালনায় নতুন মানদণ্ড স্থাপিত হবে, তারল্য সংকট কমবে বলেও মনে করে ডিএসই। এছাড়া এসএমই বোর্ড চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি চালু করতে ডিএসই আন্তর্জাতিক কৌশলগত বিনিয়োগকারী চীনা কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর বাইরে একটি উন্নতমানের বন্ড মার্কেট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েও কাজ করছে ডিএসই। বাজারে ডেরিভেটিভ বা বৈচিত্র্যময় পণ্য আনতে গবেষণা চলছে নিয়মিত। মিউচুয়াল ফান্ডের বিশেষ করে একটি ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজ বাজারে আনা প্রয়োজন বলে মনে করে ডিএসই।
এসব উদ্যোগ কয়েক বছর ধরেই ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছে। ডিএসইর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলাও হচ্ছে এসব উদ্যোগের অগ্রগতির খবর। কিন্তু এখনও কোনোটির পরিণতি হয়নি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের বার্ষিক কর্মতৎপরতা জানাতে বছর শেষ ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএএম মাজেদুর রহমান জানিয়েছিলেন, ২০১৮ সালে নতুন প্রডাক্ট এসএমই এবং অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড চালু করার কথা ছিল। প্রযুক্তিগত সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৯ সালের শুরুতেই ডিএসই নতুন এ বিষয়গুলো চালু করার আশা করছি। এছাড়া উন্নত ও কার্যকর বন্ড মার্কেট প্রতিষ্ঠা বিষয়েও ডিএসই কাজ করছে।
এসব বাস্তবায়নে বাজেটে প্রণোদনাও চায় ডিএসই। উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে বাজেটে সহায়তা চায় ডিএসই। যদিও এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নেও বাজার কাক্সিক্ষত মানে ঘুরে দাঁড়াবে না মনে করেন পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি গতকাল শেয়ার বিজকে বলেছেন, আমাদের বাজারের গভীরতা বেশি নয়। ইটিএফ ও স্মলক্যাপ বোর্ড চালু হলেও বাজারে সুফল আসবে না। আগে প্রয়োজন ভালো মানের কোম্পানি তালিকাভুক্তি। বিএসইসিকে উদ্যোগ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি ভালো মানের কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসতে হবে। এজন্য তাদের প্যাকেজের আওতায় ছাড় দিতে হবে। না হলে এতসব করেও কোনো লাভ হবে না। বোর্ড চালু হলো কিন্তু ভালো মানের শেয়ার নেই, তাহলে ট্রেডিংটা করবে কেÑপ্রশ্ন রাখেন তিনি।
এ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি হবে বলে যে কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মাত্র ১০ থেকে ১৫টি কোম্পানির বাইরে বিদেশিরা বিনিয়োগ করতে পারছেন না। বহুজাতিকের বাইরে হাতেগোনা কয়েকটি ভালো মানের কোম্পানি রয়েছে এ বাজারে। তাই আগে মানসম্পন্ন কোম্পানি প্রয়োজন।
ভালো কোম্পানি স্বল্পতার কথা স্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর এক পরিচালক বলেন, পুঁজিবাজারে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। দুষ্কৃতকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে দ্রুত। পৃথিবীর সব দেশের পুঁজিবাজারে কারসাজি হয়। কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাই তৎপর থাকে। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারলে বাজারে মূলধারার বিনিয়োগকারীর পদচারণা বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখাটাই মূল কাজ। আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে বাজার উত্থান-পতন স্থায়ী হয় না। আমাদের বাজারে প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা। এটি ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে আগে। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জবাবদিহিতামূলক ও স্বচালিত ভূমিকায় নামতে হবে। তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে দেশের পুঁজিবাজার।

সর্বশেষ..