টাঁকশালের শীর্ষ পদ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদবির!

শেখ আবু তালেব: দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেডের (এসপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবসরে যাওয়ার কথা আগামী ১৫ নভেম্বর। কিন্তু পুনরায় তাকে একই পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে উঠেপড়ে লেগেছে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকাদারদের একটি গ্রুপ। তাদের প্রস্তাবে সমর্থন দিয়ে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের আরও দুবছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অনুমোদন করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। এতে কলকাঠি নাড়ছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের অধিকাংশ কর্মকর্তা। অভিযোগ উঠেছে অনৈতিকভাবে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা বিনিময় হওয়ার বিষয়টি।
টাঁকশাল নামেই বেশি পরিচিত দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড। এখানেই ছাপানো হয় দেশীয় কাগুজে মুদ্রা। এজন্য প্রতিষ্ঠানটি ঘিরে প্রতিবছর ছাপাখানার জন্য কালি, কেমিক্যাল, রং, কাগজ ও বিভিন্ন উপকরণের হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। আর তা সরবরাহ করে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
টাঁকশালের শীর্ষ পদ হচ্ছে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (ইডি) মর্যাদার একজনকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে টাঁকশালে এমডির দায়িত্বে আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শেখ আজিজুল হক। গত বছরের ২১ মার্চ তাকে এ পদে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সরকারের পক্ষে নিয়োগ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয় আর বাংলাদেশ ব্যাংক জনবল সরবরাহ করে। শীর্ষ এ পদটিতে অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়োগ দিলেও কাকে নিয়োগ দেওয়া হবেÑতার অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। শেখ আজিজুল হকের চাকরির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১৫ নভেম্বর। এর পরদিন থেকেই তিনি অবসরজনিত ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, তাকে পুনরায় একই পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে টাঁকশাল থেকে সুবিধাভোগী ঠিকাদারদের একটি চক্র। এজন্য মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের বিভিন্ন মহলে তদবির শুরু করেছেন তারা। দ্রুত ফাইল ছাড় করতে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখছেন বিভিন্ন টেবিলে। ফাইল কখন কোথায় আছে, তার সর্বশেষ তথ্যও সংগ্রহ করছেন। দ্রুতগতিতে কাজ করতে প্রতি টেবিলেই তদবির করছেন চক্রটির সদস্যরা।
তাদের তদবিরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। এজন্য সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে শেখ আজিজুল হককে পুনরায় টাঁকশালের এমডি করতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার জন্য ফাইল পাঠিয়েছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, শেখ আজিজুল হককে নিয়োগ দিতে ঠিকাদারদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সব কলকাঠি নাড়ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নর (ডিজি)। তিনিই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সব ধরনের লিয়াজোঁ করছেন। তার কথামতোই চলেন টাকশালের বর্তমান এমডিও। ব্যবসায়ীদের অনৈতিক সুবিধা আরও বাড়িয়ে দিতেই এ আয়োজন।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ এ পদে অবসরজনিত ছুটি বাতিল করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তির পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। জানা গেছে, শেখ আজিজুল হককে আরও দুবছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে সুপারিশ করা হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হলেও আগের প্রায় সব সুযোগ-সুবিধাই তাকে দেওয়া হবে।
এখানেই শেষ নয়। শেখ আজিজুল হককে নিয়ে ব্যবসায়ী ওই চক্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও ব্যাপক। সূত্র জানিয়েছে, বয়সগত সুবিধা বিবেচনায় শেখ আজিজুল হককে প্রথম দফায় দুবছর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টায় রয়েছে চক্রটি। এতে সফল হলে মেয়াদ শেষে আরও এক বছরের জন্য তাকে পুনর্নিয়োগের পরিকল্পনায় আছে চক্রটি। এজন্য যাদের ম্যানেজ করা লাগবে, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। এজন্য দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হয়। সরকার যদি তার এ যোগ্যতাকে আরও কাজে লাগাতে চায়, তাতে বাংলাদেশ ব্যাংক আপত্তি জানাবে না।’
এদিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নির্বাহী পরিচালক শেয়ার বিজকে বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে দক্ষ জনবল রয়েছে। অতীতে নিয়মিত যেসব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। এতে দুর্নীতি আরও বৃদ্ধি পায়। যোগ্যরা মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়। অনৈতিক সুবিধারও লেনদেন হয়। এতে গুটিকয়েক ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষা হলেও প্রতিষ্ঠান কিছুই পায় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা লুটের ঘটনার পর ফজলে কবিরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি ব্যাংকের সব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন চুক্তিভিত্তিক কোনো নিয়োগ তিনি দেবেন না। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা হচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।