টাঙ্গাইলের নওয়াববাড়ি

সময়ের স্রোতে পৃথিবী বদলেছে, হারিয়ে গেছে জমিদারি শাসনব্যবস্থা। জমিদার নেই; কিন্তু তাদের বাড়িগুলো আজও রয়ে গেছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জমিদারবাড়ির শতবর্ষী পুরোনো দেয়ালগুলো আমাদের কালের সাক্ষী। ক্ষয়ে পড়া চুনসুরকির আস্তরণগুলোয় লুকিয়ে আছে ঐতিহ্য আর ইতিহাস।
এমনই এক ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়ির কথাই বলব আজ। ঢাকা থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-জামালপুর মহাসড়কের পাশের এই জমিদারবাড়ির অবস্থান টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে। খান বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার প্রথম প্রস্তাবকদের মধ্যে তিনিও একজন। তার অমর কীর্তি ধনবাড়ী জমিদারবাড়ি বা নওয়াব প্যালেস।
এই জমিদারবাড়ির রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। ধারণা করা হয়, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ধনপতি সিংহকে পরাজিত করে মোগল সেনাপতি ইস্পিঞ্জর খাঁ ও মনোয়ার খাঁ ধনবাড়ীতে জমিদারি নির্মাণ করেন। তাদের কয়েক পুরুষ পরের নবাব ছিলেন সৈয়দ জনাব আলী। তিনি ছিলেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর বাবা। তিনি তরুণ বয়সে মারা যান।
নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বিয়ে করেন বগুড়ার নবাব আবদুস সোবহানের মেয়ে আলতাফুন্নাহারকে। আলতাফুন্নাহার ছিলেন নিঃসন্তান। তার মৃত্যুর পর নবাব বিয়ে করেন ঈশা খাঁর শেষ বংশধর সৈয়দা আখতার খাতুনকে। নওয়াব আলী চৌধুরীর তৃতীয় স্ত্রীর নাম ছিল সকিনা খাতুন। নওয়াব আলী চৌধুরী ১৯২৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। নবাব ওয়াকফনামায় তার তৃতীয় স্ত্রীর একমাত্র ছেলে সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী ও মেয়ে উম্মে ফাতেমা হুমায়রা খাতুনের নাম উল্লেখ করে যান। সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী ১৯৮১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
অপূর্ব স্থাপত্যের জন্য জমিদারবাড়িটি পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। তাই নবাবের উত্তরাধিকারীরা জমিদারবাড়িতে গড়ে তোলেন পিকনিক স্পট, যা নবাব সৈয়দ হাসান আলী রয়্যাল রিসোর্ট হিসেবে বেশ খ্যাতি লাভ করেছে। রিসোর্টটি দেখাশোনার দায়িত্বে আছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাইট হাউস গ্রুপ। ১২০ বিঘা আয়তনের রিসোর্টটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।

নবাব মঞ্জিল
পুরো নবাব মঞ্জিল প্রাচীরে ঘেরা। এটি দক্ষিণমুখী, দীর্ঘ বারান্দাসংবলিত। এটি ছিল নওয়াব বাহাদুরের প্রধান আবাসন কক্ষ। এ ভবনটি এখন সব পর্যটকের জন্য উম্মুক্ত। নিপুণ কারুকার্যে খচিত ভবনটির ভেতরে রয়েছে নবাবি ফার্নিচার। মঞ্জিলের সামনে বাগান, উম্মুক্ত স্টেজ, খেলার মাঠ সত্যিই নয়নাভিরাম। রয়েছে আধুনিক বাথরুম, হট-কোল্ড শাওয়ার, মাল্টিচ্যানেল টিভিসহ সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা।

প্যালেস
এ বিশাল আকৃতির ভবনটি ছিল দরবার হল। বর্তমানে নবাব প্যালেসে করপোরেট অতিথিদের জন্য ৫০ আসনবিশিষ্ট একটি গোলটেবিল, কনফারেন্স রুম প্রভৃতি রয়েছে। সম্পূর্ণ আধুনিকভাবে সজ্জিত কনফারেন্স রুমে রয়েছে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্ট, সাউন্ড সিস্টেম, কম্পিউটার প্রভৃতি। পাশে রয়েছে ৩০০ আসনবিশিষ্ট কনভেনশন হল। এ কনভেনশন হলে বিভিন্ন ট্রেনিং, প্রোগ্রাম ও সেমিনার আয়োজনের ব্যবস্থা রয়েছে। প্যালেস ও মঞ্জিলের সব কক্ষে রয়েছে অতীত ঐতিহ্য বহনকারী আসবাব। বিশাল ডাইনিং হল, নওয়াব মিউজিয়াম, গ্রন্থাগার ও বেশ
কয়েকটি বেডরুম। শতাধিক বছরের পুরোনো ভবনের সব আধুনিক সুবিধা পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ার মতো।
ভিলা
দু’শতাধিক বছরের পুরোনো এ ভাবনটি ছিল নওয়াব অন্দরমহল। এখানে রয়েছে সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। রয়েছে সিঙ্গেল বেডরুম। বাইরে রয়েছে বিশাল ফুলের বাগান।

নওয়াব শাহী জামে মসজিদ
এখানে রয়েছে ৭০০ বছরের পুরোনো মসজিদ। চীনা ও মিসরীয়দের তৈরি মোগলীয় স্থাপত্যের নিদর্শন। মসজিদটি মোজাইক করা। মেঝেতে মার্বেল পাথরের নিপুণ কারুকাজ করা হয়েছে। মসজিদটির পাশে একটি কক্ষ রয়েছে, যেখানে নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর কবর রয়েছে। এখানে ২৪ ঘণ্টা কোরআন তিলাওয়াত করা হয়। শতবর্ষ ধরে এখানে কোরআন তিলওয়াত হচ্ছে।
শাহী মসজিদের পাশে সাকিনা মেমোরিয়াল উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, নওয়াব ইনস্টিটিউশন ও আসিয়া হাসান আলী মহিলা ডিগ্রি কলেজ রয়েছে।

দিঘি
৩০ বিঘা জমির ওপর বিশাল একটি দিঘি রয়েছে। সুন্দর ও মনোরম শান বাঁধানো ঘাট রয়েছে। চাইলে এখানে নৌকা ভ্রমণ ও মাছ ধরতে পারেন।
কটেজ
নওয়াব বাড়ির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এই কটেজটি। এ কটেজে রয়েছে এসি রুম। পাশে ফুলের বাগান। বড় আকৃতির গার্ডেন আমব্রেলা। রয়েছে ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ি। এখানে প্রায়ই আয়োজন করা হয় আদিবাসী গারোদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে গারোরা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক নাচ ও গান করে থাকে। আরও আয়োজন করা হয় বিলুপ্ত লাঠি খেলা। এখানের মনোরম পরিবেশে শুটিং ও পিকনিক স্পট হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

আরও দেখতে পাবেন…
রিসোর্ট থেকে ৩০ মিনিটের দূরত্বে ঐতিহ্যবাহী মধুপুর বন। মধুপুর থেকে ৩০ মিনিটের পথ পেরুলেই রয়েছে আদিবাসী গারো পল্লি। সেখানে উপলব্ধি করা যায় গারোদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনধারা, যা পর্যটকদের মনের খোরাক জোগায়। রয়েছে মনোমুগ্ধকর রাবার বাগান, আনারস বাগান, বাঁশ বাগানÑযা অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। বঙ্গবন্ধু সেতু মাত্র ৫০ মিনিট দূরত্বে অবস্থিত। রয়েল রিসোর্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপোর্ট ও গাইড দিয়ে রিসোর্টের গেস্টদের ঘুরিয়ে দেখায় আশেপাশের সব দর্শনীয় স্থান। পর্যটকদের সুবিধার্থে নিরাপত্তারক্ষী ও ওয়েটার রয়েছে এ রিসোর্টে। এছাড়া গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থাও আছে।
সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এই রয়েল রিসোর্টে। রয়েছে চার ধরনের আবাসন ব্যবস্থা, যা দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের চাহিদা পূরণ করে। এখানে থাকতে পারবেন নবাবি আয়াসেই। তবে সেটা নির্ভর করবে আপনার সামর্থ্যরে ওপর। মঞ্জিল ও প্যালেসের খাট, সোফাসহ সব আসবাব সেই প্রাচীন আমলের, যা নবাবরা ব্যবহার করতেন। কিন্তু ভিলা ও কটেজে নবাবদের আসবাব পাওয়া যাবে না। এছাড়া ধনবাড়ী নবাব প্যালেসের অদূরে মধুপুর উপজেলা সদরে অবস্থিত আদিত্য, সৈকত ও ড্রিমটাচ নামের তিনটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। এগুলোতে রয়েছে এসি ও নন-এসি রুমের সুন্দর ব্যবস্থা।

যাতায়াত
রাজধানীর মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকা-ধনবাড়ী সরাসরি বাস সার্ভিস চালু আছে। বিনিময়, মহানগর কিংবা শুভেচ্ছা পরিবহনে যেতে পারবেন। ধনবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে জমিদারবাড়িতে হেঁটে কিংবা রিকশায় পৌঁছাতে পারেন। এছাড়া আজমপুর, আবদুল্লাহপুর ও সায়েদাবাদ থেকেও বিভিন্ন পরিবহনের বাসে চড়ে যাওয়া যাবে।

শিপন আহমেদ