সুশিক্ষা

টিএসসির গোধূলি

গোধূলির মানে রক্তের রঙে রাঙানো গগন ঘন
গোধূলির মানে খুব ধীরে ধীরে সন্ধ্যার আগমন
গোধূলির মানে গোধূলির রঙে রাঙানো আমার মন
রুদ্র ক্লাস থেকে ফিরে হলে বিশ্রাম নিচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে বাইরে থেকে বেড়িয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিল সে। বিকাল বেলাটা তার সবসময়ই প্রিয়। জানালার ফাক গলে যখন সূর্যের শেষ সম্ভাষণটুকু হাতের ওপর এসে পড়ে, তখন ভালো লাগার একটা সুন্দর অনুভূতি পায় সে। একটা অজানা মিষ্টি আবেশে ছেয়ে যায় তার চারপাশ। হল থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামল। কেন যেন তার নিজেকে একটু উদাসী মনে হলো। পড়ন্ত বিকালে উদাস মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, ক্যাম্পাসের সবাই কেমন যেন যান্ত্রিক। হতাশাগ্রস্ত শিক্ষিত বেকার তরুণেরা যে যার মতো ছুটে চলেছে নিজ নিজ লক্ষ্য পানে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য অবলোকন করার মতো অবকাশ কারও নেই। এসব আনমনে ভাবতে ভাবতে হেঁটে চলেছে টিএসসির দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যাম্পাস গোধূলির আলোয় ছেয়ে যায়। গোধূলির এ সময়টা বেশ সুন্দর, যেন অপরূপ সৌন্দর্য ভিন্ন এক জগতে নিয়ে যেতে চায়। আকাশে বিভিন্ন রঙের ছটা, কোথাও গাঢ়, কোথাও হালকা, কোথাওবা একেবারে মিলিয়ে গেছে।
রুদ্রর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে গোধূলির অবস্থান অনেক উপরে। এ সময়টা নিয়ে তার আগ্রহের শেষ নেই। তাই গোধূলি সম্পর্কে জানতে গিয়ে সে যতটুকু বুঝেছে তা হলো ‘সকালে সূর্য ওঠার আগে কিছু সময় এবং সন্ধ্যায় সূর্য ডুবে যাওয়ার পর কিছু সময় ধরে যে হালকা আলোর আভা দেখা যায় তা গোধূলিলগ্ন নামে পরিচিত। ‘গোধূলি’ শব্দের সমাসবাক্য হলো ‘গো (গরু)-এর ধূলি হয় যে সময়’-বহুব্রীহি সমাস। সে সময় (অর্থাৎ সন্ধ্যার সময়) গরুর পাল ধূলি উড়িয়ে ঘরে ফেরে। আসলে ওই সময় যে আবছা আলো থাকে, সেটাই গোধূলি। সকালে সূর্য উঠার আগেও এ রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়, কিন্তু তার কাছে সকালেরটার আবেদন নেই বললে চলে।
ব্যাস জানলেই তার তৃপ্তি মেটে না। গোধূলির সৌন্দর্য সে বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্নভাবে উপভোগ করেছে। কিন্তু তার প্রিয় সবুজ ক্যাম্পাসের টিএসসিতে গোধূলির সৌন্দর্যের বিশ্লেষণে সে একটু বেশিই নস্টালজিক হয়ে যায়।
কল্পনা করুন সবুজের মাঝে লাল দালান, তার ওপরে পড়ন্ত বিকালের ডুবন্ত সূর্যের রশ্মি এক কথায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গোধূলির টিএসসি। যেখানে হতাশাগ্রস্ত কোনো শিক্ষার্থী নয়, দেখা মেলে প্রাণবন্ত, উদ্যমী ও সৌন্দর্য অবলোকনকারী অসংখ্য তরুণ-তরুণীর।
তারা গোধূলির ছায়ায় টিএসসির করিডোর ও ছাদে আবৃত্তি, বিতর্ক, অভিনয়, ভাষা শিক্ষা, লেখালেখি ও সাংবাদিকতা ছাড়াও আরও অনেক সৃজনশীল বিষয় নিয়ে চর্চা করে। তারা সবাই বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে কাজ করেন। রয়েছে বিতর্কবিষয়ক সংগঠন জুডো, আবৃত্তিবিষয়ক সংগঠন ধ্বনি, অভিনয় নিয়ে থিয়েটার, জলসিঁড়ি। এছাড়া রয়েছে চিরকুট, সাংবাদিক সমিতি, প্রেস ক্লাব। সবাই একই ছাদের নিচে তাদের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখে নিজ নিজ বিষয়ের চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। গোধূলির হালকা কিরণে যখন ক্যাম্পাসের সবাই ব্যস্ত নিজ নিজ কাজ নিয়ে, তখন টিএসসি হয়ে উঠে প্রাণবন্ত এসব সামাজিক সংগঠনের তরুণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে। তাদের প্রায় সবাই জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের কার্যক্রমে দেশের অন্যতম সেরা। শুধুই যে ছাত্রছাত্রীরাই এই সৌন্দর্য উপভোগ করে তা নয়, এখানে শিক্ষক শিক্ষার্থীর মিলনমেলাও দারুণভাবে জমে উঠে। শিক্ষকেরা আসেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটাতে কিংবা বিভিন্ন সংগঠনের উপদেষ্টা হয়ে আসেন তারা।
গোধূলির সৌন্দর্য নিয়ে কত কবি কত কবিতা লিখেছেন, কত গল্পকার কত গল্প লিখেছেন তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু টিএসসিতে এরকম প্রাণবন্ত রুদ্র টাইপের তরুণদের কবি, লেখক এক সঙ্গে দেখলে হয়ত ভাবতেন দেশ বদলাতে বেশি দিন আর নেই। যে দেশের বুকে এমন তরুণেরা ভিন্ন ভিন্ন প্রচেষ্টায় নিজেদের নিয়োজিত রাখেন তাদের ভাগ্য বদলানো শুধু সময়ের ব্যাপার। সে আশায় হয়তো উদ্যোমী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের অন্য ছাত্রছাত্রীদের মতো নয়। তারা হতাশাগ্রস্ত না হয়ে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে এক সঙ্গে গোধূলির ছায়ায় টিএসসির করিডোর ও ছাদে সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সচেষ্ট।
তাদের আড্ডার বিষয়বস্তু হয়ে উঠে ইতিবাচক ও সৃজনশীল। তারাই গড়তে পারে একটি নতুন বৈষম্যহীন সমাজ, রাষ্ট্র। তারা অন্য ১০ জনের মতো স্বাভাবিক ও আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনায় মগ্ন থাকেন না। হেমন্তের গোধূলিতে হালকা শীতের রেশ লাগতেই তারা চিন্তা করে শীতকালে উত্তরবঙ্গের শীতার্তদের কথা।
পড়ন্ত বিকাল থেকে সন্ধ্যা পুরো সময়টুকু যেন প্রাণের মেলায় ছেয়ে যায় টিএসসি। এ সময় সৌন্দর্যপিপাসু ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের হল থেকে বেরিয়ে ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রে মিলিত হয়। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চর্চা, আলাপ-আলোচনা করে নিজেদের ব্যক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি করে। এভাবেই রুদ্ররা গোধূলির সময়টুকুকে একান্তই নিজের করে নেয় প্রাণ ও জ্ঞানের সাগরে।
ভুলে গেলে চলবে না রুদ্র পড়ালেখাতেও দারুণ মনযোগী। তাই তাকে ফিরে যেতে হবে দ্রুত। কারণ পরদিন সকালে আবার শুরু হবে ক্লাস কিংবা পরীক্ষা।
ওহ, গোধূলিকে জানানো হয়নি, আমি অর্পিত হয়ে ধন্য!
আমি সব অহঙ্কার বিসর্জন দিয়ে ধন্য!
উজাড় হয়ে ধন্য! আমি গোধূলির কোলে লুটিয়ে পরে ধন্য!
এ গোধূলি আমারি শুধুই আমার! হোক সে দূর রক্তিম আকাশে একটা অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য!

বেলাল হোসেন

সর্বশেষ..